চর মোজাম্মেলে স্পিকারের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগ, ব্যবসায়ীকে মারধর করে টাকা ছিনতাই

ভোলার তজুমদ্দিনের বিচ্ছিন্ন চর মোজাম্মেলে জাতীয় সংসদের স্পিকারের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে যুবদল নেতা শাহজাহানের বিরুদ্ধে। দাবিকৃত পাঁচ লাখ টাকা না দেওয়ায় মাছ ও জেনারেটর ব্যবসায়ী মো. মনজুর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর এবং ক্যাশ বাক্স থেকে ১০ হাজার টাকা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেছেন তিনি।
এ ঘটনায় শাহজাহানসহ ১০ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও চার থেকে পাঁচজনকে আসামি করে তজুমদ্দিন সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেছেন মনজু। গত ১৯ সেপ্টেম্বর বিকেলে উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা বাজারের উত্তর পাশে হারুন গাজীর দোকানের সামনে এ হামলার ঘটনা ঘটে বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার এজাহার ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তজুমদ্দিন উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নের বিচ্ছিন্ন জনপদ চর মোজাম্মেল। মেঘনার বুকে গড়ে ওঠা এ চরাঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ কৃষি ও মৎস্য ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদের নাম ব্যবহার করে চরাঞ্চলে চাঁদাবাজি, দখল ও ভয়ভীতি দেখানোর চেষ্টা করছেন শাহজাহান।
স্থানীয়দের ভাষ্য, শাহজাহানের নেতৃত্বে একটি দল গড়ে উঠেছে। ওই দলের সদস্যদের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীর কাছ থেকে টাকা আদায়, জমি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দখলের চেষ্টা এবং ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
অভিযোগকারী ব্যবসায়ী মনজু বলেন, শাহজাহান নিজেকে স্পিকারের লোক পরিচয় দিয়ে দাবি করতেন, স্পিকার তাঁকে চর মোজাম্মেলের দায়িত্ব দিয়েছেন এবং তাঁর কথামতোই সেখানে কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এই পরিচয় ব্যবহার করে জমি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দখলের চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ তাঁর।
মনজুর ভাষ্য, চর মোজাম্মেলের মুক্তিযোদ্ধা বাজারে তাঁর মাছের আড়ৎ ও জেনারেটরের ব্যবসা রয়েছে। ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁর কাছে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ১৯ সেপ্টেম্বর বিকেলে ১০ থেকে ১৫ জনের একটি দল দেশীয় অস্ত্র, লোহার রড ও লাঠিসোঁটা নিয়ে তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ঢুকে হামলা চালায়।
তিনি অভিযোগ করেন, হামলায় তাঁর ডান হাত ভেঙে যায়। পরে ক্যাশ বাক্স থেকে মাছ বিক্রির ১০ হাজার টাকা নিয়ে দোকানের বাইরে ফেলে দেওয়া হয়। এ সময় দোকানে ভাঙচুর চালিয়ে প্রায় ২০ হাজার টাকার ক্ষতি করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
হামলার পর স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেন। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ভোলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এ ঘটনায় করা মামলায় দণ্ডবিধির ১৪৩, ৩২৩, ৩০৭, ৩২৫, ৩৮৫, ৩৮৬ ও ১১৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলায় শাহজাহান, আলমগীর, আব্বাস, আলমগীর, সুমন, সোহাগ, বিটু, জাকির, শেখ ফরিদ ও পারভেজের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অজ্ঞাতনামা আরও চার থেকে পাঁচজনকেও আসামি করা হয়েছে।
মনজু বলেন, ‘যারা স্পিকারের নাম ভাঙিয়ে চরের নিরীহ মানুষকে হয়রানি ও ভয়ভীতি দেখাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মাননীয় স্পিকারের কাছে চরবাসীর পক্ষ থেকে দাবি জানাই।’
তবে তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন যুবদল নেতা শাহজাহান। তিনি বলেন, অভিযোগগুলো ‘মিথ্যা ও ভিত্তিহীন’। একটি চক্র তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তুলে ‘ঘোলা পানিতে মাছ শিকার’ করতে চাইছে। তাঁর দাবি, চরের মানুষের শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্পিকারের নির্দেশনা অনুযায়ী তাঁরা কাজ করছেন।
ভোলা জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাদের সেলিম ভিপি বলেন, তজুমদ্দিন উপজেলায় যুবদলের কোনো পূর্ণাঙ্গ ঘোষিত কমিটি নেই। এরপরও কেউ যুবদলের নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজি বা কোনো অপকর্মে জড়িত থাকলে এবং তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, ‘যুবদলে কোনো চাঁদাবাজের ঠাঁই হবে না। দলের নাম ব্যবহার করে কেউ ব্যক্তিস্বার্থে অপকর্ম করলে তার দায় দল নেবে না।’
তজুমদ্দিন উপজেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম মোস্তফা মিন্টু বলেন, বিএনপির নাম ব্যবহার করে চরাঞ্চলসহ কোথাও চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব বা অন্য কোনো অপকর্মের বিরুদ্ধে দলের কঠোর অবস্থান রয়েছে। কেউ এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত হলে তাকে ছাড় দেওয়া হবে না।
তজুমদ্দিন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিজানুর রহমান বলেন, চর মোজাম্মেলে ব্যবসায়ী মনজুর ওপর হামলার বিষয়টি তিনি অবগত হয়েছেন। এ ঘটনায় মনজু আদালতে মামলা করেছেন।
ওসি বলেন, মামলাটি থানায় তদন্তের জন্য আসার পর তদন্ত করে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে।
