সর্বশেষঃ

বোরহানউদ্দিনে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করে ভাঙ্গা কাঁচে দুই উদ্যোক্তার চুড়ি তৈরির কারখানা

বোরহানউদ্দিন প্রতিনিধি: পরিত্যক্ত ভাঙা কাঁচ আর মাটির নিচ থেকে ওঠা প্রাকৃতিক গ্যাস এই দুইয়ের মেলবন্ধনে ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলায় গড়ে উঠেছে এক অভাবনীয় ও পরিবেশবান্ধব ক্ষুদ্র শিল্প। দুই তরুণ উদ্যোক্তার এই সাহসী উদ্যোগে যেমন তৈরি হচ্ছে ঝলমলে রঙিন চুড়ি, তেমনি পরিবেশও রক্ষা পাচ্ছে দূষণ থেকে।

বোরহানউদ্দিন উপজেলার টবগী ইউনিয়নের নতুন হাকিমুদ্দিন বাজার এলাকায় এই চুড়ি তৈরির কারখানা স্থাপন করেছেন স্থানীয় তরুণ উদ্যোক্তা আফজাল হোসেন ও বাদল মিয়া। তাদের এই কারখানার বিশেষত্ব হলো, চুড়ি তৈরির কাঁচামাল হিসেবে তারা ব্যবহার করছেন রাস্তাঘাট, বাড়িঘর ও ভোলা সহ দেশের বিভিন্ন জেলার নির্মাণ সাইট থেকে সংগৃহীত পরিত্যক্ত ও ভাঙা কাঁচের টুকরা। আর এই কাঁচ গলিয়ে চুড়ি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করছেন গভীর নলকূপ থেকে ওঠা প্রাকৃতিক গ্যাস।

সরেজমিনে কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, শ্রমিকরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। একপাশে স্তূপ করে রাখা ভাঙা কাঁচের টুকরা। অন্যপাশে জ্বলন্ত চুল্লি, যা থেকে অবিরাম প্রাকৃতিক গ্যাস নির্গত হচ্ছে। এই গ্যাসের আগুনেই গলানো হচ্ছে কাঁচ। গলিত কাঁচের সাথে বিভিন্ন রং ও উপকরণ মিশিয়ে দক্ষ কারিগররা তৈরি করছেন নানা আকার ও ডিজাইনের রঙিন চুড়ি। চুড়ি তৈরির প্রতিটি পর্যায়ই খুব নিখুঁত ও সতর্কতার সাথে সম্পন্ন হচ্ছে।

এ বিষয়ে উদ্যোক্তা আফজাল হোসেন বলেন, আমরা লক্ষ্য করেছি যে, ভোলার বিভিন্ন জায়গায় নলকূপ খননের সময় প্রচুর প্রাকৃতিক গ্যাস পাওয়া যায় এবং পানির সাথে ২৪ ঘন্টা গ্যাস উঠে অপচয় হয়, যা কোনো কাজেই লাগে না। আবার চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে ভাঙা কাঁচের টুকরা, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। আমরা ভাবলাম, এই দুটোকে কাজে লাগিয়ে কিছু একটা করা যায় কি না। দীর্ঘ গবেষণা ও পরীক্ষার পর আমরা এই চুড়ি তৈরির কারখানা গড়ে তুলেছি। আমাদের তৈরি চুড়ি এখন স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতেও সরবরাহ করা হচ্ছে
তিনি আরো জানান, বর্তমানে তাদের ৫টি কারখানা রয়েছে। দক্ষ কারিগরদের পাশাপাশি স্থানীয় ১০০ থেকে ১৫০ জন নারী-পুরুষ নিয়মিত কাজের সুযোগ পেয়েছেন। শিফ্ট আকারে কাজের ধরন অনুযায়ী শ্রমিকরা দৈনিক ৩০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত মজুজিতে ও অনেক নারী শ্রমিক চুক্তিভিত্তিক ভাবে মাসিক বেতনে বা পিস প্রতি কমিশনে কাজ করেন। তাদের তথ্য অনুযায়ী, ৫টি কারখানায় নিয়মিত শিফটে প্রতিদিন প্রায় ১,২৫০ থেকে ১,৫০০ ব্রুজ চুড়ি উৎপাদিত হয়। প্রতি ব্রুজ চুড়ির পাইকারি মূল্য ২০০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। সাধারণ সময়ের পাশাপাশি বিশেষ করে ঈদ কিংবা বিভিন্ন উৎসবের মৌসুমে এর চাহিদা বহুগুণ বেড়ে যায়। ফলে তখন উৎপাদন ও লাভের পরিমাণও দ্বিগুণ হয়।
এদিকে উপজেলার টবগী, কাচিয়া ও পক্ষিয়া ইউনিয়নের ভিবিন্ন গ্রামে মাটিতে টিউবয়েল/গভীর নলকূপ বসালেই মাটির নিচ থেকে পানির সাথে অটোমেটিকভাবে গ্যাস ওঠায় জ্বালানী খরচ না থাকায় ব্যবসাটি স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য অত্যন্ত লাভজনক হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং সহজ শর্তে ঋণ সহ বিভিন্ন প্রকার সুবিধা পেলে এই চুড়ি শিল্প আরও প্রসার লাভ করবে এবং বেকার সমস্যা দূরীকরনে অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনোরঞ্জন বর্মনের বলেন, ফেলে দেওয়া বা ভাঙা কাঁচ যত্রতত্র ফেলে পরিবেশ নষ্ট না করে, তা দিয়ে চুড়ি তৈরির এই উদ্যোগ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অত্যন্ত কার্যকরী। একই সাথে এটি প্রমাণ করে যে, সঠিক সদিচ্ছা ও পরিকল্পনা থাকলে প্রান্তিক অঞ্চলেও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জন করতে পারেন। আমরা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই দুই তরুণ উদ্যোক্তাকে সব ধরণের সহযোগিতা প্রদান করব।

ছবি সংযুক্ত:

জেএম. মমিন
বোরহানউদ্দিন (ভোলা) প্রতিনিধি
মোবাঃ ০১৯২৯৯৪৫৬৬৯
তাং- ৩০/১০/২৬ইং

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।