সর্বশেষঃ

মধ্যরাত : পর্ব-২২৫

ড. তাইবুন নাহার রশীদ (কবিরত্ন),

(গত পর্বের পর) : আমি বললাম, উমা আমার ছোট বোন। বোন যদি ভাইয়ের কাছে থাকতে চায়, ভাইকি তাকে তাড়িয়ে দিতে পারে ? এমন সময় রাহাত খান এসে কমন রুমে ঢুকে পরল, বলল- কে কাকে তাড়াচ্ছে ? আমি বললাম, ওরা বলছে উমা আমার কাছে থাকে কেন ? রাহাত খান বললেন, ভদ্রমহিলা যখন বড় ভাইয়ের মত শ্রদ্ধা করে আপন ভেবে থাকছেন, তাতে-ত আমাদের আনন্দ পাওয়া উচিত। এই বিংশ শতাব্দিতে খুব কম একজন বন্ধুপতœী স্বামীকে হারানোর পর স্বামীর বন্ধুর কাছে ভাই, দেবর সকলকে পরিত্যাগ করে তার কাছে থাকতে চায়। নিশ্চয় প্রশান্ত বাবুর সে রকম কোন বৈশিষ্ট আছে। যা বলতে হবে সে রকম কোন আপন জনের মত ব্যবহার পেয়েছে। প্রশান্ত বাবুর অসুখে সুশান্ত বাবুকে যে রকম উৎকণ্ঠিত হতে দেখেছি, ওর অসুখের সময় ভদ্রলোক দেখেছি এই স্ত্রীকেসহ এখানে এসে থেকে সংসারের সব ঝামেলা কাঁধে নিয়েছিল। কেন আপনারা কি দেখেননি ? নাতনী দোলার বিয়ের হাঙ্গামাত টরেন্টোয় এই সুশান্ত বাবুর বাসা থেকে চলল। কতটুকু আপন হলে, কতটুকু হৃদয়তা থাকলে, মানুষ এত বড় ঝাপটা কাঁধে নেয়। শেষ পর্যন্ত অসুখ অবস্থায় টরেন্টো থেকে এই মন্ট্রিলে বন্ধুর বাসায় এসে হাসপাতালে দেহত্যাগ করে।
আমি বিস্মিত স্তম্ভিত অবাক হয়ে রাহাত খানের মুখের দিকে অপলক নেত্রে তাকিয়ে থাকলাম। আশরাফু, মুখ লুকাত, সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ হিন্দু, মুসলিম, বুদ্ধ, খৃষ্টান, ব্রহ্মণ, কোন জাত নয়; শুধু পরিচয় আমি একজন ভগবানের সৃষ্টি রক্ত মাংসে গড়া মানুষ। আমার সমগোত্র ভাইরা কি বলছেন ? আর একজন অন্য গোত্রের মানুষের মুখে কি ন্যায়ের বাণী, সত্যের বাণী ধ্বনিত হচ্ছে। বিজন, অলক, দেবতোষ, সব মাথা নীচু করে পায়ের আঙ্গুল দিয়ে মাটি খুড়তে লাগল। কারও মুখে কোন কথা নেই, আমিও সেখানে থেকে উঠে কাজের নাম করে সরে পরলাম। সন্ধ্যা হয় হয়, শাল ভাদর আমার বাসায় এসে পরলাম। দেখি উমা রাধা বারা করে ডাইনিং টেবিলে আমার খাওয়া সাজিয়ে রেখেছে। উমা বলল দাদা দোলা ফোন করেছে, ওরা কাল বিকেলের প্লেনে লস এঞ্জেল যাবে। আপনাকে আশির্বাদ করতে বলেছে।
আমি আর কিছু বললাম না। মাথা নীচু করে খাবার টেবিলে বসে খাবার খেতে লাগলাম। আমার কানের মধ্যে বিজন, অলক, দেবতোষের ইঙ্গিতগুলি অহরহ ধ্বনিত হচ্ছিল। মানুষ কত নীচে নেমে আসতে পারে সেটাই সেটাই ভাবছিলাম আর খাচ্ছিলাম। তবুও ওরা আমার সাথে একই ইউনিভার্সিটিতে কাজ করে, এক সাথে গল্প-গুজব করি, ক্ষমার চোখে দেখা ছাড়া আর উপায় কি ? খেয়ে দেয়ে শুয়ে শুয়ে কার্লমার্কসের বইটা হাতে নিয়ে পাতা উল্টিয়ে যাচ্ছিলাম। অনেক দিন বইগুলু বুক শেল্ফ থেকে ধুলো জমে গেছে। দোলা এগুলো নাড়া-চাড়া করত। পড়াশুনা করত। আজ দোলাও নেই, বইগুলোকে কেউ আদরও করেনা। যে এই বইয়ের মূল্য বোঝে, ভাষার অর্থ বোঝে সে একে সমাদর করে, সন্মান করে। কার্লমার্কস মহামানব, মানুষের মুক্তির সন্ধান দিয়ে গেছেন। আজ মানুষ তার কথা প্রতি মুহুর্তে স্মরণ করে। বইগুলোতে অনেক ধুলা জমে আছে। বসে বসে একটা নেকড়া দিয়ে কার্লমার্কস এর বইটা ও অন্যান্য বইগুলি মুছে পরিস্কার করে রাখলাম। উমাকে এসব ব্যাপারে আমি কিছু বলিনা, ওর আবার এসব বই এর নেশা নেই।

(চলবে——)

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।