সর্বশেষঃ

৩৩ বছরেও আধুনিক ভবন পায়নি চরসামাইয়া বন্ধুজন মাধ্যমিক বিদ্যালয়

আমির হামজা, ভোলা

তিন দশকের বেশি সময় ধরে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে ভোলা সদর উপজেলার চরসামাইয়া ইউনিয়নের বন্ধুজন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। কিন্তু ৩৩ বছর পেরিয়ে গেলেও বিদ্যালয়টি পায়নি আধুনিক কোনো একাডেমিক ভবন। পুরোনো দোতলা ভবন ও একটি টিনশেড ঘরে গাদাগাদি করে চলছে প্রায় ৫৮৮ শিক্ষার্থীর পাঠদান।

বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত সংকট দিন দিন প্রকট হচ্ছে। ২০০৫ সালে নির্মিত দোতলা ভবনের বিভিন্ন স্থানে পলেস্তারা খসে রড বেরিয়ে পড়েছে। ছাদে দেখা দিয়েছে ফাটল। দরজা-জানালার অবস্থাও নাজুক। অন্যদিকে টিনশেড শ্রেণিকক্ষের চাল ফুটো হয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে ভিজে যায় শিক্ষার্থীদের বই-খাতা ও বেঞ্চ।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৩ সালের ২৫ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৯৪ সালের ১ জানুয়ারি শ্রেণি কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী রয়েছে প্রায় ৫৮৮ জন। তাদের মধ্যে ছাত্রীর সংখ্যা বেশি।

শিক্ষার্থীর তুলনায় শ্রেণিকক্ষ ও বেঞ্চের সংকটও তীব্র। ৫৮৮ শিক্ষার্থীর জন্য বিদ্যালয়ে বেঞ্চ রয়েছে মাত্র ১১০টি। ফলে একটি বেঞ্চে যেখানে দুই থেকে তিনজন বসার কথা, সেখানে পাঁচ থেকে ছয়জনকে গাদাগাদি করে বসতে হচ্ছে। শ্রেণিকক্ষের সংকটের কারণে কোনো কোনো বিষয়ের ক্লাস প্রধান শিক্ষকের কক্ষ, লাইব্রেরি, বারান্দা কিংবা অস্থায়ী জায়গায় নিতে হয়।

বিদ্যালয়ে নেই বিজ্ঞানাগার, ডিজিটাল কম্পিউটার ল্যাব, মানসম্মত লাইব্রেরি ও ছাত্রীদের কমনরুম। প্রয়োজনীয় সংখ্যক স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগারও নেই। প্রধান শিক্ষক, শিক্ষক মিলনায়তন ও অফিস কক্ষের জন্যও পৃথক শৌচাগারের ব্যবস্থা নেই।

বর্তমানে বিদ্যালয়ে মাত্র একটি শৌচাগার রয়েছে। সেটি ব্যবহার করতে হয় ৩২৯ জন ছাত্রী ও নারী শিক্ষককে। পুরুষ শিক্ষক ও ছাত্রদের শৌচাগারের জন্য আশপাশের বাড়ির ওপর নির্ভর করতে হয়। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, শিক্ষকদের জন্য পৃথক শৌচাগার নির্মাণে গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুই লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও পরে সেই বরাদ্দ বাতিল হয়ে যায়।

দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহবুবা আক্তার ফাতেমা বলে, ‘মেয়েদের জন্য মাত্র একটি টয়লেট। সেখানে ঢুকতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। সাবান বা হাত ধোয়ার আধুনিক ব্যবস্থাও নেই। কমনরুম না থাকায় ছাত্রীদের নানা সমস্যায় পড়তে হয়।’

অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মুহাম্মদ আবি আব্দুল্লাহ আহাদ বলে, শ্রেণিকক্ষে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ফ্যান নেই। প্রচণ্ড গরমে টিনের চালের নিচে দমবন্ধ পরিবেশে ক্লাস করতে হয়। বেঞ্চের সংকটের কারণে গাদাগাদি করে বসতে হয়।

বর্ষা মৌসুমে বিদ্যালয়ের ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়। জলাবদ্ধতায় মাঠ ও প্রবেশপথ পানিতে ডুবে যায়। এতে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াতে সমস্যা হয়। সীমানাপ্রাচীর না থাকায় বিদ্যালয়ের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে শিক্ষক ও অভিভাবকদের। তাঁদের অভিযোগ, বহিরাগতদের অবাধ যাতায়াত ও আড্ডার কারণে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়।

বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন ১৯ জন। এর মধ্যে রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান, চারুকলা ও সহকারী প্রধান শিক্ষকসহ চারটি পদ বর্তমানে শূন্য রয়েছে।

ঘূর্ণিঝড় আম্পানের সময় বিদ্যালয়ের দুটি ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ভেঙে পড়ে। পরে সেগুলো পুনর্নির্মাণ করে সেমিপাকা ঘর করা হয়। তবে মূল একাডেমিক ভবনের সংকট এখনো কাটেনি।

স্থানীয় অভিভাবকেরা বলেন, ভোলা সদর উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকার অনেক বিদ্যালয়ে এরই মধ্যে বহুতল ভবন নির্মাণ হয়েছে। কোথাও কোথাও যুক্ত হয়েছে আধুনিক শিক্ষা উপকরণ ও ডিজিটাল কম্পিউটার ল্যাব। কিন্তু তিন দশকের বেশি পুরোনো বন্ধুজন মাধ্যমিক বিদ্যালয় এখনো পুরোনো ভবন ও টিনশেডের ওপর নির্ভরশীল। এতে বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে তাঁরা হতাশ।

তবে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বিদ্যালয়ের ফলাফল সন্তোষজনক বলে দাবি করেছে কর্তৃপক্ষ। চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় বিদ্যালয়টির পাসের হার ৫৭ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে একজন শিক্ষার্থী। আগামী বছর এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেবে প্রায় ৯০ জন শিক্ষার্থী।

শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি জাতীয় দিবস পালন, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, সামাজিক সমাবেশ, ক্ষুদে ডাক্তার দল, মাদকবিরোধী কার্যক্রম ও ইভটিজিং প্রতিরোধসহ বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমেও বিদ্যালয়টি সক্রিয়।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আ. সহিদ তালুকদার বলেন, ‘গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বহুতল ভবনের জন্য চারবার আবেদন করেও কোনো বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। অথচ আশপাশের অনেক বিদ্যালয়ে একাধিক ভবন নির্মাণ হয়েছে। ভবনসংকটের কারণে এখন টিনের ঘরেও ক্লাস নিতে হচ্ছে। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফলের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন।’

তিনি বলেন, একটি আধুনিক বহুতল একাডেমিক ভবন নির্মাণ হলে শিক্ষার্থীদের পাঠদানের পরিবেশ অনেকটাই উন্নত হবে। বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে নিয়মিত যোগাযোগ করা হচ্ছে।

বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি আবদুল কাদের সেলিম বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের পিছিয়ে পড়া ঠেকাতে এখন আর দেরি করার সুযোগ নেই। জরুরি ভিত্তিতে একটি আধুনিক একাডেমিক ভবন, স্বাস্থ্যসম্মত ওয়াশ ব্লক, বিজ্ঞানাগার, ডিজিটাল কম্পিউটার ল্যাব, পর্যাপ্ত বেঞ্চ ও সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।’

তিনি আরও দাবি করেন, ১৯৯৫ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকারের আমলে ধর্ম ও পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী আলহাজ মোশারফ হোসেন শাহজাহান বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন। তবে বিদ্যালয় সূত্রে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠার তারিখ ১৯৯৩ সালের ২৫ ডিসেম্বর এবং শ্রেণি কার্যক্রম শুরুর তারিখ ১৯৯৪ সালের ১ জানুয়ারি উল্লেখ করা হয়েছে।

ভোলা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মফিকুল ইসলাম বলেন, বিদ্যালয়টি সরেজমিনে পরিদর্শন করে ভবনের নাজুক অবস্থা দেখা গেছে। বহুতল ভবনের জন্য বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে আবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় ছবি ও প্রতিবেদনসহ বিষয়টি প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরে উপস্থাপনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হলে ভবিষ্যতে বিদ্যালয়টির উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

স্থানীয় শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের দাবি, দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সংকট কাটাতে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া হোক। তাঁদের প্রত্যাশা, বন্ধুজন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে একটি আধুনিক বহুতল একাডেমিক ভবনের পাশাপাশি বিজ্ঞানাগার, কম্পিউটার ল্যাব, পর্যাপ্ত বেঞ্চ, স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার ও সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা হবে। একই সঙ্গে বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা নিরসনে নেওয়া হবে কার্যকর ব্যবস্থা। এতে বিদ্যালয়ের পরিবেশ উন্নত হওয়ার পাশাপাশি প্রত্যন্ত এলাকার শত শত শিক্ষার্থীর মানসম্মত শিক্ষার সুযোগও বাড়বে।

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।