সর্বশেষঃ

৩০–৪৫ বছরেই কেন বাড়ছে হৃদরোগ, চিকিৎসকের কণ্ঠে সতর্কবার্তা

অনলাইন ডেক্স

একটা সময় হৃদরোগের কথা উঠলেই চোখের সামনে ভেসে উঠত বয়সের ভারে নুয়ে পড়া কোনো মানুষের মুখ। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন কর্মব্যস্ত জীবনের মাঝপথে থাকা ৩০ থেকে ৪৫ বছরের মানুষও হঠাৎ বুকের ব্যথা, শ্বাসকষ্ট কিংবা ধমনিতে ব্লকেজ নিয়ে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ছুটছেন। যে হৃদয় এতদিন নীরবে শরীরকে সচল রেখেছে, কখনো কখনো সেই হৃদয়ই তরুণ বয়সে আচমকা জানান দিচ্ছে বিপদের।

চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ ও হাসপাতালভিত্তিক পরিসংখ্যান বলছে, জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া হৃদরোগীদের একটি বড় অংশের বয়স এখন ৩০ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে। এই বয়সসীমার রোগীদের মধ্যে গুরুতর হার্ট অ্যাটাকের STEMI ও NSTEMI—দুই ধরনের ঘটনাই দেখা যাচ্ছে। ফলে হৃদরোগকে শুধু বয়স্ক মানুষের অসুখ হিসেবে দেখার পুরোনো ধারণা ক্রমেই বদলে যাচ্ছে।

আজ ২৯ সেপ্টেম্বর বিশ্ব হৃদরোগ দিবস। হৃদযন্ত্রের সুস্থতা নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো এবং হৃদরোগ প্রতিরোধে আগাম পদক্ষেপ নেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরতেই বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। এবারের বাস্তবতায় তরুণদের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বিশেষভাবে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কলকাতার অ্যাপোলো মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতালের ইন্টারভেনশনাল কার্ডিয়োলজিস্ট ডা. উদয়শঙ্কর দাস বলেন, জরুরি বিভাগে এখন এমন অনেক রোগী আসছেন, যাদের বয়স ৩০ থেকে ৪০ বছরের শুরুর দিকে। তাঁদের কারও ধমনিতে গুরুতর ব্লকেজ, আবার কারও ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক। তাঁর মতে, রোগীদের বয়সের এই পরিবর্তন জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।

তরুণ বয়সে হৃদরোগ বাড়ার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। চিকিৎসকদের মতে, বংশগত ঝুঁকির সঙ্গে আধুনিক জীবনযাত্রার নানা অভ্যাস একসঙ্গে কাজ করছে। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে হৃদরোগের ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে হৃদরোগের বংশগত প্রবণতা তুলনামূলকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হয়।

এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে দীর্ঘ সময় বসে থাকা, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং তামাকের ব্যবহার। অনেকের ক্ষেত্রে ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার সমস্যা বা অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়াও শনাক্ত না হয়েই থেকে যাচ্ছে। এর ফলে অল্প বয়সেই উচ্চ রক্তচাপসহ হৃদরোগের বিভিন্ন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

শরীরের ভেতরে এসব ঝুঁকি ধীরে ধীরে ধমনিতে প্রদাহ ও ক্ষতির সৃষ্টি করতে পারে। সময়ের সঙ্গে ধমনি শক্ত হয়ে যায় এবং সেখানে চর্বি ও অন্যান্য পদার্থ জমে সংকোচন তৈরি হতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেই সংকোচিত ধমনিতে হঠাৎ রক্ত জমাট বেঁধে হৃদপেশিতে রক্ত চলাচল বন্ধ করে দিতে পারে। তখনই ঘটতে পারে আকস্মিক হার্ট অ্যাটাক।

তবে হৃদরোগের এই ঝুঁকি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এজন্য অসুস্থ হওয়ার অপেক্ষা না করে তরুণ বয়স থেকেই নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হওয়া জরুরি। রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরলের মাত্রা সম্পর্কে নিয়মিত ধারণা রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

শুধু পরীক্ষা করালেই হবে না, বদলাতে হবে দৈনন্দিন জীবনযাপনও। নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং তামাক থেকে দূরে থাকা হৃদযন্ত্রকে সুস্থ রাখার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন ৩০ মিনিট মাঝারি মাত্রার অ্যারোবিক ব্যায়ামও হৃদস্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক একটি গবেষণাও হৃদরোগীদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা নিয়ে উদ্বেগের চিত্র তুলে ধরেছে। বিশ্ব হৃদরোগ দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে হার্ট অ্যাটাক বা বাইপাস সার্জারির পরও ৭৭ শতাংশ রোগী স্ট্যাটিন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ সেবন করছেন না। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষণাটি Global Heart সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।

হার্ট অ্যাটাকের পর পুনরায় হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে স্ট্যাটিনসহ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ওষুধ নিয়মিত সেবন গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ওষুধ না খাওয়ার প্রবণতা দেখিয়ে দিচ্ছে, হৃদরোগের চিকিৎসা শুধু হাসপাতালের জরুরি বিভাগে শেষ হয়ে যায় না; সুস্থ থাকার জন্য পরবর্তী দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও জীবনযাপনও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

হৃদয় মানুষের শরীরের সবচেয়ে নিরবচ্ছিন্ন কর্মী। ঘুমের মধ্যেও সে থামে না, বিশ্রাম নেয় না। অথচ তার ওপরই সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি করি আমরা—অনিয়মিত জীবনযাপন, ধূমপান, অস্বাস্থ্যকর খাবার, মানসিক চাপ আর শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার মধ্য দিয়ে। তাই হৃদরোগের সতর্কবার্তা বয়স বাড়ার অপেক্ষা করে আসে না। ৩০ বা ৪০ বছরেই যদি হৃদয় সংকেত দিতে শুরু করে, তবে সেই সংকেত বোঝার দায়িত্বও শুরু করতে হবে তরুণ বয়স থেকেই।

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।