চরফ্যাশনে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ২য় বার্ষিকীতে ১১ দলীয় জোটের গণমিছিল ও সমাবেশ
মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা ছাড়া উন্নত জাতি গঠন অসম্ভব : পর্ব-২

প্রদীপ্ত মোবারক
(গত পর্বের পর) : একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে। সেই শ্রেণিকক্ষ যদি নীরব অবহেলা, প্রশাসনিক শৈথিল্য এবং দায়িত্বহীনতার আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়, তাহলে উন্নয়নের যত বড় পরিসংখ্যানই উপস্থাপন করা হোক না কেন, জাতির ভিত ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়বে। কারণ, একটি শিশুর হাতে বই তুলে দেওয়াই শিক্ষা নয়; তাকে জ্ঞান, নৈতিকতা, যুক্তিবোধ ও মানবিকতার আলোয় আলোকিত করাই প্রকৃত শিক্ষা।বাংলাদেশের সংবিধানের ১৭ নম্বর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে একটি সর্বজনীন, গণমুখী ও অভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং শিশুদের জন্য অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই অনুচ্ছেদে শিক্ষাকে সমাজের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা এবং দক্ষ নাগরিক গঠনের উপযোগী করে তোলার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সংবিধানের এই অঙ্গীকার বাস্তবে কতটুকু প্রতিফলিত হচ্ছে!
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাস্তব চিত্র নিয়ে অভিভাবক, শিক্ষার্থী এবং সচেতন নাগরিকদের মধ্যে যে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে, তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। দেশের বহু জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের একটি অংশের বিরুদ্ধে নিয়মিত দেরিতে বিদ্যালয়ে উপস্থিত হওয়া, নির্ধারিত সময়ের আগেই চলে যাওয়া, পাঠদানে অনাগ্রহ, শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া, শিক্ষার্থীদের শেখার অগ্রগতি যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করা এবং প্রশাসনিক দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই উঠে আসছে। এসব অভিযোগের প্রতিটি সত্য নাও হতে পারে, কিন্তু অভিযোগের পুনরাবৃত্তি নিজেই একটি নীতিগত সংকটের ইঙ্গিত বহন করে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো- অনেক ক্ষেত্রেই অনিয়ম যেন ব্যতিক্রম নয়, বরং একটি সহনীয় সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। সময়মতো বিদ্যালয়ে না এলেও জবাবদিহি নেই; পাঠদানের মান নিম্নমুখী হলেও কার্যকর মূল্যায়ন নেই; শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তার জন্য কেউ দায় স্বীকার করেন না। যে ব্যবস্থায় জবাবদিহি অনুপস্থিত, সেখানে দায়িত্ববোধও ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়।
তবে এ কথাও সমানভাবে সত্য যে, বাংলাদেশের হাজারো নিবেদিতপ্রাণ প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক আজও সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও অসাধারণ নিষ্ঠার সঙ্গে শিক্ষা দিয়ে চলেছেন। তাঁদের আত্মত্যাগই প্রাথমিক শিক্ষাকে এখনো টিকিয়ে রেখেছে। তাই এই সমালোচনা কোনো ব্যক্তি বা পুরো শিক্ষকসমাজের বিরুদ্ধে নয়; বরং সেই ক্ষুদ্র কিন্তু প্রভাবশালী অনিয়মের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে, যা সৎ ও কর্মনিষ্ঠ শিক্ষকদের অর্জনকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। প্রাথমিক শিক্ষা আজ অবকাঠামোর সংকটে যতটা নয়, তার চেয়েও বেশি সংকটে নৈতিক নেতৃত্বের। বহু বিদ্যালয়ে ভবন আছে, বিদ্যুৎ আছে, দৃশ্য-শ্রাব্য শিক্ষার উপকরণ আছে, যন্ত্রনির্ভর উপস্থিতি যাচাইয়ের ব্যবস্থা আছে; কিন্তু শ্রেণিকক্ষে অনুপ্রেরণাদায়ক শিক্ষক নেই, শিক্ষার প্রতি আন্তরিকতা নেই, জবাবদিহির সংস্কৃতি নেই। প্রযুক্তি কখনো শিক্ষকের বিকল্প হতে পারে না; প্রযুক্তি কেবল একজন দায়িত্বশীল শিক্ষকের সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
সরকারের ২০২৩ সালের বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় শুমারিতেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তির সুযোগ বৃদ্ধি এবং নারী-পুরুষের সমতা অর্জনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন ও শিক্ষার্থীদের শিক্ষালাভের ফল নিশ্চিত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। অর্থাৎ, এখন আর শুধু বিদ্যালয়ে শিশুদের নিয়ে আসাই লক্ষ্য নয়; লক্ষ্য হওয়া উচিত, তারা সত্যিকার অর্থে কী শিখছে। আরেকটি বাস্তবতা হলো, শিক্ষাব্যবস্থায় অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও অনেক সময় কার্যকর তদন্ত হয় না। অনেক ক্ষেত্রে পরিদর্শন আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে এবং কর্মদক্ষতার পরিবর্তে কাগুজে প্রতিবেদনই মূল্যায়নের প্রধান ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। ফলে কর্মঠ ও দায়িত্ববান শিক্ষক যেমন যথাযথ স্বীকৃতি পান না, তেমনি অবহেলাকারীরাও অনেক সময় শাস্তির আওতার বাইরে থেকে যান। এই বৈষম্যই কর্মস্পৃহাকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করে।
প্রশ্ন হলো- এই অবস্থার পরিবর্তন কীভাবে সম্ভব? প্রথমত, শুধু শিক্ষক উপস্থিতি নয়, পাঠদানের কার্যকারিতা মূল্যায়নের ব্যবস্থা চালু করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি বিদ্যালয়ে নিরপেক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, বিদ্যালয় পরিচালনায় অভিভাবকদের কার্যকর অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। চতুর্থত, কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে পুরস্কার এবং প্রমাণিত অবহেলার ক্ষেত্রে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পঞ্চমত, প্রধান শিক্ষককে কেবল প্রশাসনিক কর্মকর্তা নয়, শিক্ষাগত নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এর পাশাপাশি বিদ্যালয় পরিদর্শন ব্যবস্থাকে লোকদেখানো আনুষ্ঠানিকতা থেকে বের করে আনতে হবে। পরিদর্শকের কাজ শুধু উপস্থিতির খাতা দেখা বা নথিপত্রে স্বাক্ষর করা নয়; শ্রেণিকক্ষে প্রকৃত পাঠদান হচ্ছে কি না, শিক্ষার্থীরা পাঠ বুঝছে কি না এবং দুর্বল শিক্ষার্থীরা অতিরিক্ত সহায়তা পাচ্ছে কি না, এসব বিষয়ও যাচাই করতে হবে। তদারকির নামে যদি শুধু কাগজে-কলমে সন্তোষজনক প্রতিবেদন লেখা হয়, তাহলে অনিয়ম আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করবে।স্থানীয় প্রভাব, দলীয় আনুগত্য, ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা প্রশাসনিক প্রশ্রয় যেন কোনো অনিয়মকারীকে সুরক্ষা দিতে না পারে। বিদ্যালয় জনগণের অর্থে পরিচালিত হয়। শিক্ষক ও কর্মকর্তারা রাষ্ট্রের বেতনভুক্ত কর্মচারী। অতএব, তাঁদের কাজের হিসাব জনগণের কাছে দিতে হবে। সরকারি চাকরি কোনো ব্যক্তিগত বিশেষাধিকার নয়; এটি একটি জনদায়িত্ব। অভিভাবকদেরও নীরব দর্শকের ভূমিকায় থাকলে চলবে না। সন্তান বিদ্যালয়ে গেলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। সন্তান কী শিখছে, শিক্ষক নিয়মিত পাঠদান করছেন কি না, বিদ্যালয়ের পরিবেশ কেমন এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে কি না, এসব বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। তবে অভিযোগ অবশ্যই তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে করতে হবে, যাতে কোনো সৎ শিক্ষক অন্যায়ভাবে হয়রানির শিকার না হন।
একটি উন্নত জাতি নির্মাণের স্বপ্ন কেবল বৃহৎ প্রকল্প, উঁচু সেতু কিংবা সুউচ্চ ভবনের ওপর নির্ভর করে না। সেই স্বপ্নের প্রকৃত ভিত্তি নির্মিত হয় গ্রামের একটি ছোট্ট প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে, যেখানে একজন শিক্ষক একজন শিশুর হাতে শুধু একটি বই নয়, একটি জাতির ভবিষ্যৎ তুলে দেন। আমরা যদি সত্যিই জ্ঞানভিত্তিক সমাজ, দক্ষ মানবসম্পদ এবং উন্নত রাষ্ট্র নির্মাণের কথা বলতে চাই, তাহলে প্রথমে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দরজায় দাঁড়াতে হবে। সেখানে যদি অনিয়ম, অবহেলা ও দায়িত্বহীনতা বিরাজ করে, তবে উন্নয়নের সব দাবিই একসময় ফাঁপা স্লোগানে পরিণত হবে।
আজ সময় এসেছে একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়ার, প্রাথমিক শিক্ষায় অনিয়ম কোনো সাধারণ প্রশাসনিক ত্রুটি নয়; এটি জাতীয় উন্নয়নের বিরুদ্ধে এক নীরব অন্তর্ঘাত। সংবিধান রাষ্ট্রকে যে দায়িত্ব দিয়েছে, তা বাস্তবায়নের জন্য শুধু অর্থ বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না; প্রয়োজন সততা, জবাবদিহি, পেশাগত নৈতিকতা এবং আপসহীন প্রশাসনিক দৃঢ়তা। শিক্ষকের সম্মান অবশ্যই রক্ষা করতে হবে; কিন্তু সম্মানের নামে অনিয়মকে আড়াল করা যাবে না। একইভাবে, বিচ্ছিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে পুরো শিক্ষকসমাজকেও দোষারোপ করা সমীচীন নয়। প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, সত্য উদ্ঘাটন এবং দোষী ও নির্দোষের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য নির্ধারণ। কারণ, একটি শিশুর হারিয়ে যাওয়া শৈশব হয়তো আর ফিরে আসে না; কিন্তু সেই হারিয়ে যাওয়া শিক্ষা একদিন পুরো জাতিকেই তার মূল্য দিতে বাধ্য করে। আজকের শ্রেণিকক্ষের অবহেলাই আগামী দিনের অদক্ষতা, বৈষম্য, বেকারত্ব ও সামাজিক অবক্ষয়ের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
অতএব, প্রাথমিক শিক্ষার অনিয়মের বিরুদ্ধে এখনই সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। রাষ্ট্রকে কঠোর হতে হবে, প্রশাসনকে নিরপেক্ষ হতে হবে, শিক্ষককে দায়িত্বশীল হতে হবে এবং অভিভাবককে সচেতন হতে হবে। অন্যথায় উন্নত জাতি গঠনের স্বপ্ন শুধু বক্তৃতা, ঘোষণা এবং কাগুজে পরিকল্পনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।
লেখক: কলামিস্ট ও জনসংযোগ প্রধান, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ।
