সর্বশেষঃ

ভোলার নদীতে কমছে ইলিশ, বাড়ছে শঙ্কা ॥ জীবিকা, নদী ও সংস্কৃতির সংকটে উপকূলের মানুষ

মো. সামিরুজ্জামান ॥
মেঘনা ও তেঁতুলিয়ার ঢেউ ঘিরেই ভোলার মানুষের জীবন-জীবিকা। একসময় ভোরের আলো ফোটার আগেই নদীঘাট মুখর থাকত জেলেদের কোলাহলে। কিন্তু এখন সেই ঘাটজুড়ে বাড়ছে হতাশা। দিনের পর দিন নদীতে জাল ফেলেও কাঙ্খিত ইলিশ না পাওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে জেলে সম্প্রদায়ের মধ্যে। প্রশ্ন উঠছে-ভোলার নদীতে কি সত্যিই কমে যাচ্ছে ইলিশ?
চরফ্যাশন, দৌলতখান, তজুমদ্দিন ও মনপুরার বিভিন্ন ঘাট ঘুরে জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগের তুলনায় ইলিশের উপস্থিতি অনেক কমে গেছে। তুলাতলী ঘাটের জেলে সাদ্দাম মাঝি বলেন, আগে এই সময়ে জাল তুললেই ইলিশ পাওয়া যেত। এখন দুই-তিন দিন নদীতে থেকেও খালি হাতে ফিরতে হয়। তেলের খরচই ওঠে না। একই ধরনের হতাশা প্রকাশ করেন জাকির হোসেন। তিনি বলেন, নিষেধাজ্ঞা মানতে চাই, কিন্তু সংসার চলবে কীভাবে? আবার নিষেধাজ্ঞা মেনেও তেমন লাভ চোখে পড়ে না।
জেলেদের অভিযোগ, নদীতে মাছ কমে যাওয়ার পাশাপাশি তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় বেড়েছে ব্যয়। ফলে অনেক পরিবার এখন চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে। ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন বলেন, অতিরিক্ত আহরণ ও জাটকা নিধন পুরোপুরি বন্ধ করা এখনও সম্ভব হয়নি।জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে আইন বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। নিষেধাজ্ঞার সুফল পাওয়া গেছে, তবে তা ধরে রাখতে শতভাগ বাস্তবায়ন জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অতিরিক্ত আহরণই নয়, নদীর পরিবেশগত পরিবর্তনও ইলিশের সংকটকে বাড়িয়ে তুলছে। মেঘনা ও তেঁতুলিয়ার বিভিন্ন অংশে নাব্য সংকট, দখল ও দূষণের কারণে ইলিশের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
ইলিশ সম্পদ রক্ষায় কাজ করা উন্নয়ন সংস্থা জিজেইউএসের মৎস্য কর্মকর্তা আরিফুজ্জামান বলেন, ইলিশ ভোলার সংস্কৃতি ও অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি মানবসৃষ্ট কারণেও সংকট বাড়ছে। মা ইলিশ ও জাটকা রক্ষা করতে পারলে ইলিশ নিজেই দ্রুত বংশবৃদ্ধি করতে সক্ষম। তিনি বলেন, অভয়াশ্রম বৃদ্ধি, নদীদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি ইকো-সাউন্ডার প্রযুক্তি, কৃত্রিম প্রজনন গবেষণা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার মতো উদ্যোগ ভবিষ্যতে ইলিশ উৎপাদন বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।
এদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। সমুদ্রের তাপমাত্রা ও লবণাক্ততার পরিবর্তনের কারণে ইলিশের ডিম ছাড়ার সময় ও চলাচলের পথ বদলে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এ পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারলে ভবিষ্যতে ইলিশের মজুদ আরও কমে যেতে পারে। সংকটের প্রভাব পড়েছে বাজারেও। ভোলা মাছ বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গত কয়েক বছরে ইলিশের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ক্রেতা নাসিমা বেগম বলেন, ইলিশ এখন মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। দাম বাড়লেও সেই লাভ জেলেদের হাতে পৌঁছায় না।
ইলিশা ঘাটের জেলে হেজু মাঝির ভাষ্য, আমরা কম দামে মাছ বিক্রি করি, কিন্তু শহরে গিয়ে দাম কয়েক গুণ বেড়ে যায়। লাভটা মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে যায়। তবে সংকটের মধ্যেও আশার কথা শুনিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন বলেন, কয়েক বছর আগে কঠোর নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের ফলে ভোলার নদীতে ইলিশের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, কার্যকর ব্যবস্থাপনা থাকলে ইলিশ দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, ইলিশ রক্ষায় অবৈধ ছোট ফাঁসের জাল—যেমন বেহুন্দি, চরঘেরা ও মশারি জাল সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি অভয়াশ্রম রক্ষা, পরিকল্পিত ড্রেজিং, সব জেলেকে প্রণোদনার আওতায় আনা এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি জরুরি। তিনি আরও বলেন, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে শুধু ইলিশ নয়, নদীতে দেশীয় মাছের প্রাচুর্যও বাড়বে।
উপকূলীয় জনপদের মানুষের কাছে ইলিশ শুধু একটি মাছ নয়, এটি তাদের পরিচয়, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির অংশ। তাই ইলিশের সংকটকে কেবল মাছের সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। নদী, পরিবেশ ও মানুষের জীবিকা রক্ষায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে মেঘনার ঢেউয়ের সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে ভোলার রুপালি স্বপ্ন।

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।