সম্মান ও গৌরবের মনে করছেন ভোলার মানুষ

সাত বারের এমপি মেজর হাফিজ স্পিকার

নাসির উদ্দিন লিটন
বাংলাদেশের ইতিহাসে দ্বীপজেলা ভোলায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে মন্ত্রী হলেও এবার প্রথমবার আইন প্রনেতাদের নেতা স্পিকার হয়েছেন ভোলার কৃতি সন্তান, বীরমুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম। তিনি ১১৭ ভোলা-৩ ( লালমোহন-তজুমদ্দিন) সংসদীয় আসন থেকে সাতবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এদিকে হাফিজ উদ্দিন আহমদকে স্পিকার নির্বাচিত করার বিষয়টি সম্মান ও গৌরবের বলছেন ভোলার সর্বস্তরের মানুষ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ। বয়োজেষ্ঠ ও প্রবীণ এই পার্লামেন্টেরিয়ানের মাধ্যমে সংসদের হারানো সুনাম পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে, ফিরে আসবে গণতান্ত্রিক পরিবেশ এমনটাই মনে করছেন ভোলার সাধারণ মানুষ। রাজনীতিক বাবার পথ অনুসরণ করে রাজনীতিতে এসে মানুষের যেমন মন জয় করেছেন সেই সাথে অলংকিত করেছেন রাষ্ট্রের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ স্পিকারের পদ।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর ১৭ ফেব্রুয়ারি তৃতীয়বারের মতো মন্ত্রী হন হাফিজ উদ্দিন আহমদ। দায়িত্ব পান মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের। এর আগে তিনি দুই বার বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী, পাট ও পানিসম্পদ মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। দেশ প্রেমি হাফিজ উদ্দিন আহমদ তরুণ বয়স থেকেই ছিলেন স্বাধীনচেতা। অন্যায়, দুঃশাসন-শোষণের বিরুদ্ধে স্বোচ্ছার ছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের অনবদ্য সাহসিহকার জন্য রাষ্ট্রের তৃতীয়সর্বোচ্চ বীরত্ব পদবী বীর বিক্রমে ভুষিত হন মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। ছিলেন তৎকালিন পাকিস্তান ফুটবল দলের খেলোয়াড় ও অধিনায়ক। ১৯৬৪ সাল থেকে পর পর তিনবার পূর্ব পাকিস্তানের দ্রুততম মানব ছিলেন। তার বাবা ডাক্তার আজহার উদ্দিন ১৯৬৩ ও ১৯৬৫ সালে দুই বার পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিদের সদস্য নির্বাচিত হন। সেনাবাহিনী থেকে অবসরে এসে বাবার পথ অনুসরণ করে রাজনীতিতে এসেও তিনি মানুষের মন কেড়েছেন।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ভোলা-৩ আসন থেকে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হয়ে ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালে পর পর দুইবার ভোলা-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরশাদ পতনের পর ১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে পান প্রতীকে ভোলা-৩ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে নির্বাচিত হন। তার সাথে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থীরা। বিজয়ের পর ১৯৯২ সালে বিএনপিতে যোগদেন তিনি। ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ ও সপ্তম সংসদ নির্বাচনেও বিএনপির হয়ে বিজয়ী হন তিনি। খালেদা জিয়ার মন্ত্রী পরিষদে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদে তিনি ১৯ মার্চ ১৯৯৬ থেকে ২৯ মার্চ ১৯৯৬ পর্যন্ত বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অষ্টম জাতীয় সংসদে খালেদা জিয়ার তৃতীয় মন্ত্রী সভায় তিনি ১১ অক্টোবর ২০০১ থেকে ২২ মে ২০০৩ সাল পর্যন্ত পাটমন্ত্রী, ২২ মে ২০০৩ থেকে ২৯ অক্টোবর ২০০৬ পর্যন্ত পানিসম্পদ মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। বর্ষিয়ান এ রাজনীতিবিদ বিভিন্ন সময়ে কেন্দ্রীয় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। ২৪ এর গণঅভুত্থানের পর লালমোহন-তজুমদ্দিনের বিএনপিকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করেন। রাজনীতিতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সপ্তমবারের মতো সংসদে যান। ৮১ বছর বয়সী হাফিজ উদ্দিন আহমদ মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রী হন।
হাফিজ উদ্দিন আহমদ ১৯৪৪ সালের ২৯ অক্টোবর ভোলার লালমোহনের পৈতৃক বাড়িতে জন্ম গ্রহণ করেন। মা করিমুন্নেছা। চার ভাই বোনের মধ্যে হাফিজ সবার বড়। তিনি ১৯৫৯ সালে ম্যাট্রিক ও ১৯৬১ সালে আইএ পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে ১৯৬৪ সালে বিএ (অনার্স) এবং ১৯৬৫ সালে এমএ ডিগ্রি অজন করেন। তার স্ত্রী দিলারা হাফিজ সরকারি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের দায়িত্ব পালন করেছেন। দুই ছেলে শাহরুখ হাফিজ ও তাহারাত হাফিজ, এক মেয়ে শামামা শাহরীন।
ভোলা জেলা বিএনপির সদস্য সচিব মো. রাইসুল আলম বলেন, হাফিজ উদ্দিন আহমদ দীর্ঘদিন ধরে ভোলার মানুষের অভিভাক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিএনপির সর্বোচ্চ জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। তৃণমুল থেকে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সততা ও কৃতিত্বে সাথে পালন করেছেন। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর বিভিন্ন দল থেকে মন্ত্রী নির্বাচিত হলেও এই প্রথম ভোলার কৃতি সন্তান হাফিজ উদ্দিন আহমদ স্পিকার নির্বাচিত হয়েছেন এটি ভোলার মানুষের জন্য গৌরব ও সম্মানের। এ জন্য তিনি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও জাতীয় সংসদ সদস্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান রাইসুল আলম।
হাফিজ উদ্দিন আহমদের নির্বাচনি এলাকা তজুমদ্দিন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ওমর আসাদ রিন্টু জানান, ভোলা-০৩ লালমোহন ও তজুমদ্দিন আসন থেকে ৭ বার সংসদ নির্বাচিত হয়েছেন। সপ্তমবার সংসদে যাওয়ার পর একজন অভিজ্ঞ ও বয়োজৈষ্ঠ্য সংসদ সদস্য হিসাবে বিএনপির চেয়ারম্যান তাকে স্পিকার নির্বাচিত করেছেন। স্বাধীনতার পর এই প্রথম অবহেলিত ভোলায় একজন স্পিকার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নেতৃত্বে ভোলাসহ বাংলাদেশের আরও উন্নয়ন হবে আশা তার।
হাফিজ উদ্দিন আহমদের স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টিকে ভোলার ২০ লাখ মানুষের গৌরব হিসাবে দেখছেন জামায়াতে ইসলামীর ভোলা জেলা সেক্রেটারী মাওলানা মো. হারুন অর রশিদ। অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, তার প্রত্যাশা তিনি জাতীয় সংসদে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবেন। তার ভূমিকা যেন নিরপেক্ষ ও দায়িত্বশীল এবং সুন্দর সংসদ হয় সেটাই চান তিনি।
ভোলার সন্তান হাফিজ উদ্দিন আহমদ স্পিকার নির্বাচিত হওয়ায় খুশি বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি)। বিজেপি নেতৃবৃন্দ মনে করছেন এটি ভোলার মানুষের গর্ববোধ করার মতো। এ জন্য সংসদ সদস্যদের প্রতি তিনি কৃতজ্ঞতা জানান।

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।