সর্বশেষঃ

মধ্যরাত : পর্ব-২২৭

ড. তাইবুন নাহার রশীদ (কবিরত্ন), 

(গত পর্বের পর) : আমিও আবার উঠে পরলাম, আমার অনেক কাজ ছিল। ঘরে খাওয়া-দাওয়ার জিনিস মোটেই ছিলনা, গাড়ীটাও রেখে আসছি। বাসায় ফিরে আসাই মনস্থির করে ফেললাম। বাড়ী এসে দরজায় বেল টিপলাম, দেখি হেমন্ত এসে দরজা খুলে দিল। বললাম, কখন এল হেমন্ত। বলল অনেকক্ষণ হল একাই বসে আছি। উমাদি’র আজ একাদশি; ঘরে বসে কি পূজো-আহ্নিক করছে। বাবাঃ ডাকতেও ভয় করে।
আমি বললাম, থাক যা যা করে, ও শান্তি পায় করুক। তোমরা বাঁধা দেবে না। মেয়েরা বিধবা হলে স্বামীর স্মৃতির মলা আকরে ধরে শান্তিপায়। আমি কাপড়-চোপড় ছেড়ে নিজেই খাওয়া-দাওয়া বের করে খেতে বসলাম। হেমন্তকে ডাকলাম, হেমন্ত আস না। বলল, না দাদা; আমি খেয়ে আসছি। আমি মুখ বুজে নিঃশব্দে খেয়ে উঠলাম। খেয়ে উঠে দেখলাম লেটার বক্সে কোন চিঠি এসেছে কি না। দেখি ডোরা ও দোলার চিঠি এসেছে। দোলার চিঠি খলে দেখলাম, খালি দাদুর জন্য মন খারাপ লাগে। দাদু তুমি কেমন আছ, এখানে একদম আমার মন ভাল লাগছে না। মার কথা মনে পরে। স্বপ্ন ও ইন্দ্রার দুষ্টুমি হাতছানি দিয়ে আমাকে কাছে ডাকে। তোমার আদর-যতেœর কথা বার বার আমার চোখে সামনে সিনেমার ছবির মত হাতছানি দিয়ে ডাকে। তুমি কেমন আছ দাদু ? উমাদিকে নিয়ে এখানে আস না ? তোমার সমুদ্র দেখলে খুব ভাল লাগবে। সমুদ্র, সমুদ্রের কাছে গিয়েই আমার জীবনে যত অকল্যাণ ভেসে এল; আবার সেই সমুদ্র ? না না, আমি আর সমুদ্র দেখতে চাই না। দুই বন্ধু আমরা ছিলাম, যেন মায়ের পেটের ভাই। মায়ের পেটের ভাইও এত অভিন্ন হৃদ্দতা থাকে না। এত দরদ, এত ভালবাসা, উদারতা-উজারতা নিয়ে এগিয়ে আসে না। আচ্ছা, সমুদ্রে ডুবে গেল সুশান্ত ক্যামেলিয়াকে তোলা হলো বেঁচেও গেল। যে যার জায়গায় ফিরে গেল, ক্যামেলিয়া বেঁচে স্বামী নিয়ে সংসার করছে আর সুশান্ত আস্তে আস্তে কেমন ঝিমিয়ে পরল। জ্বর হল, লাঞ্চে জল জমে হার্টফেল করল; একে বলে নিয়তি। সুশান্ত আর ফিরে আসবার না। ওঃ ভাবতে গেলে আমার মনে হয় দুঃস্বপ্ন কোনদিন আমি ভাবিনি উমা আমার কাছে আশ্রয় নিয়ে থাকবে। উমার কি সুন্দর সংসার ছিল, সুশান্ত-উমা দু’টো কপোত-কপোতি।
আমি ? আমি-ত চির জীবনই ছন্নছাড়া হয়ে ঘুরে বেড়ালাম। সুশান্ত কত বলত, কত বকত; প্রশান্ত আর কদিন এমনি বিয়ে-শাদী না করে ছন্নছাড়ার মত ঘুরে বেড়াবি ? আজি আর আমাকে গালি দেওয়ার মতও কেউ নেই। যখন আমরা টরেন্টো থেকে ফ্লোরিডার পথে পাড়ি জমালাম, সুশান্ত ড্রাইভ করেছিল। আমি পাশের সিটে বসা। উমা-ডোরা পিছনে বসেছিল। সুশান্ত নির্দেশে উমার কাছে ছিল আমার ঔষধ-টিফিন। বার বার বলেছে উমা লক্ষ রেখ, পথে যেন প্রশান্তর খাওয়া-দাওয়া, ঔষধ-পত্র সেবনের কোন ত্রুটি না হয়। আমি যেন চোখের সামনে সুশান্তকে দেখতে পাচ্ছি। কত হাসি-খুশী-উচ্ছল-উদার-উজার। সামান্য মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে হয়েও তার হৃদয়টা ছিল বড় দিল দরিয়া। মানুষকে বড় ভালবাসত। ক্যামেলিয়াকে ভাল বাসত, বাবার অমতে বিয়ে করতে সাহস পায়নি, কিন্তু সুদীর্ঘ দিন পর ক্যামেলিয়া তার স্বামীকে সহ ডিজনী ওয়ালর্ড দেখতে এসে ভবিতব্যের কি লিখন আমরা দু’বন্ধু এখানে এসে তার সাথে দেখা হয়ে গেল। গেলাম মায়ামি সমুদ্রের কুলে, সমুদ্রকে নিবিড় করে উপভোগ করার জন্য। আমরা সমুদ্রের পাড়ে দুই বন্ধু ও ক্যামেলিয়ার স্বামীকে পেয়ে গল্পের আসর জাঁকিয়ে বসেছি। তখন ক্যামেলিয়া স্নান করতে সমুদ্রে নেমে সমুদ্রের ঢেউয়ে অনেক দূরে ভেসে গেল। সুশান্ত এক মূহুর্ত দেরী না করে জলে লাফিয়ে পরল। ওঃ আমার গা শিউরে উঠে। স্পীডবোট না হলে ওদের দু’জনকে বাঁচানো যেত না। বাঁচিয়ে বা কি হল, সুশান্ত প্রমাণ করে গেল ক্যামেলিয়াকে সে ভালবাসত এবং তাকে বাঁচাতে গিয়ে জলে ডুবে জল খেয়ে লাঞ্চে জল জমে সে আস্তে আস্তে বিছানায় আশ্রয় নিয়ে আর এক হত ভাগাকে যে ভালবাসত তার কাছে এসে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল।

(চলবে—————)

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।