সর্বশেষঃ

নদীতে মাছ ধরার সুযোগ, পুঁজি নেই তজুমদ্দিনের জেলেদের

মা ইলিশ সংরক্ষণে সরকারের ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষ হচ্ছে ২৯ অক্টোবর মধ্যরাতে। নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে আবারও মেঘনা নদীতে মাছ ধরতে নামবেন জেলেরা। কিন্তু নদীতে ফেরার আগেই তাদের সামনে দেখা দিয়েছে নতুন সংকট-দপুঁজির অভাব’। নৌকা মেরামত, জাল প্রস্তুত ও জ্বালানি কেনার টাকা না থাকায় অনেক জেলেই নদীতে নামার প্রস্তুতি নিতে পারছেন না। নিষেধাজ্ঞার সময় সরকারি সহায়তার চাল পেলেও সংসারের খরচ ও ঋণের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।
স্থানীয় জেলেদের ভাষ্য, মাছ ধরা বন্ধ থাকলেও সংসারের খরচ কিংবা ঋণের কিস্তি বন্ধ থাকেনি। নিষেধাজ্ঞা শেষে নদীতে ফিরতে প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান দিতে গিয়ে অনেকে মহাজন ও আড়তদারদের কাছ থেকে দাদন নিতে বাধ্য হচ্ছেন। স্থানীয় সূত্রের দাবি, কোনো কোনো জেলের ঋণের পরিমাণ এক থেকে তিন লাখ টাকা। দাদন নেওয়ার শর্তে নির্দিষ্ট আড়তে মাছ বিক্রি করতে হয় তাদের। এতে মাছ বিক্রির টাকা থেকে ঋণ ও কমিশন পরিশোধের পর হাতে থাকে সামান্য অর্থ।
তজুমদ্দিনের মেঘনা তীরের শশীগঞ্জ এলাকার জেলে মো. রহিম মাঝি বলেন, নিষেধাজ্ঞার সময় সরকার যে চাল দেয়, তা দিয়ে তো আর সংসার চলে না। বাধ্য হয়ে মহাজনের কাছ থেকে টাকা ধার বা দাদন নিতে হয়। নদীতে নামার আগে জাল ও নৌকার পেছনে হাজার হাজার টাকা খরচ করতে হবে। কিন্তু পকেটে এক টাকাও পুঁজি নেই। মাছ বিক্রি করে মহাজনের কমিশন ও ঋণের সুদ দিতে দিতে আমাদের নাভিশ্বাস উঠে যায়। কোনো লাভই থাকে না।
জেলে তালিকায় অনিয়মের অভিযোগ: পুঁজি সংকটের পাশাপাশি জেলে নিবন্ধন তালিকা নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে প্রকৃত মৎস্যজীবীদের মধ্যে। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তজুমদ্দিনে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ১৮ হাজার ৭১২ জন। তাদের মধ্যে ১৭ হাজার ৩০০ জনের জন্য পরিবারপ্রতি ২৫ কেজি করে মোট ৪৩২ দশমিক ৫ মেট্রিক টন ভিজিএফের চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
তবে তালিকায় প্রকৃত জেলেদের পাশাপাশি অন্য পেশার লোকজনও রয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন মৎস্যজীবীরা। তাদের দাবি, তালিকা হালনাগাদ না হওয়ায় অনেক প্রকৃত জেলে সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে সংকটের সময়েও প্রাপ্য সহায়তা পাওয়া নিয়ে তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।
চৌমুহনী মাছঘাটের জেলে শফিক মাঝি বলেন, আমরা বছরের পর বছর নদীতে জাল টানি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাছ ধরি। অথচ তালিকায় এমন অনেকের নাম রয়েছে, যারা কখনো নদীতে মাছ ধরেননি কিংবা অন্য পেশার সঙ্গে জড়িত। তাদের নামে জেলে কার্ড থাকায় প্রকৃত অনেক গরিব জেলে সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন। প্রশাসন তালিকাটি ঠিক করে দিলে আমাদের মতো প্রকৃত জেলেরা কিছুটা স্বস্তিতে বাঁচতে পারতেন।
নিষেধাজ্ঞায় ৪৩ জেলে আটক, জাল পুড়িয়ে ধ্বংস: উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞার সময়ে মেঘনা নদীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অভিযান চালিয়ে ইলিশ শিকারের অভিযোগে ৪৩ জেলেকে আটক করে মৎস্য বিভাগ। তাদের মধ্যে চারজনকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং বাকি ৩৯ জনকে কারাগারে পাঠানো হয়। এ সময় মাছ ধরার কাজে ব্যবহৃত ইঞ্জিনচালিত আটটি ও দাঁড়টানা একটি নৌকা জব্দ করা হয়। জব্দ করা নৌকাগুলোতে ব্যবহৃত এক লাখ ৩৬ হাজার মিটার জাল উপজেলার স্লুইসগেট এলাকায় জনসম্মুখে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়।
তালিকা সংশোধনে উদ্যোগ, বলছে মৎস্য বিভাগ: তজুমদ্দিন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আমির হোসেন বলেন, জেলে নন কিংবা অন্য পেশায় যুক্ত- এমন অনেকের নামও নিবন্ধিত জেলের তালিকায় রয়েছে। তালিকা হালনাগাদ করার বিষয়ে সরকারি নির্দেশনা রয়েছে। এ নিয়ে গত ৬ অক্টোবর উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয় সভায় সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, মৃত, বিদেশে অবস্থানরত কিংবা পেশা পরিবর্তন করেছেন- এমন ব্যক্তিদের জেলে কার্ড বাতিলের জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের তালিকা পাঠানোর কথা থাকলেও তারা কালক্ষেপণ করছেন। এ কারণে তালিকা সংশোধনের কাজ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। তবে দ্রুত প্রকৃত জেলেদের রেখে অন্যদের নিবন্ধন বাতিল করা হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।