সর্বশেষঃ

মাছ শিকারে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা ভোলায় আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত মৎস্য বিভাগ মাছ ধরা থেকে বিরত থাকা জেলেদেরকে জনপ্রতি ২৫ কেজি করে চাল দেয়া হবে

মোকাম্মেল মিশু, ভোলা। ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতি বছরের মতো এবারও ২২ দিনের জন্য সারা দেশের নদ-নদীতে ইলিশসহ সকল প্রকার মাছ শিকার নিষিদ্ধ করেছে সরকার। নিষেধাজ্ঞা চলবে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত।

দেশব্যাপী ইলিশের মজুদ, ক্রয়-বিক্রয় ও পরিবহনও নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকবে। জেলেদেরকে ইলিশ শিকার থেকে বিরত রাখতে প্রণোদনার চাল বিতরণের পাশাপাশি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করবে মৎস্য বিভাগ। তবে জেলেদের দাবি এখনও ইলিশের পেটে ডিম না আসায় সরকারের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে।
বছরের পুরোটা সময় মা ইলিশ ডিম ছাড়লেও সাধারণত এই সময়টিকে ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম হিসেবে ধরা হয়।
এসময় মা ইলিশ সাগরের লোনা পানি থেকে উঠে এসে নদীর মিষ্টি পানিতে অধিক পরিমাণে ডিম ছাড়ে।
মা ইলিশের ডিম ছাড়া নির্বিঘ্ন করতে প্রতি বছর এ সময়টাতে ইলিশ শিকার নিষিদ্ধ থাকে। এর অংশ হিসেবে এবছরও সারাদেশে ২২ দিনের জন্য ইলিশ শিকারে নদীতে নামতে পারবে না জেলেরা।
ভোলার জেলেরা জানিয়েছে, সরকারের এই নিষেধাজ্ঞা মানতে তারা প্রস্তুত কিন্তু সরকারের দেয়া প্রণোদনা যাতে সব জেলেরা ঠিকমতো যথা সময়ে পায় এবং প্রণোদনার পাশাপাশি নগদ অর্থসহ আরও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিসহ এনজিও’র ঋণের কিস্তি বন্ধ রাখার দাবি তাদের।

এছাড়া এ সময় ভারতীয় জেলেরা সাগরের বাংলাদেশ সীমায় প্রবেশ করে ইলিশ শিকার করে নিয়ে যায় বলেও দাবি জেলে ও জেলে সমিতির নেতাদের।
বিভিন্ন মাছ ঘাটে জেলেদের সাথে কথা হলে তারা জানান, সরকারের নিষেধাজ্ঞা মেনে নদীতে যাওয়া বন্ধ রাখতে প্রস্তুত তারা। কিন্তু সরকারের দেয়া মাত্র ২৫ কেজি চাল দিয়ে তাদের সংসার চলবে না। তাই চালের পাশাপাশি অন্যান্য খাদ্য সামগ্রী এবং নগদ অর্থ দেয়ার দাবি করেছেন তারা। এছাড়া নিষেধাজ্ঞার ২২ দিনে এনজিওর কিস্তি বন্ধ না থাকলে তাদের জন্য মেনে চলা খুব কঠিন বা অসম্ভব হয়ে পড়বে। চাল ও আর্থিক সহায়তা ঠিকমতো দেয়া হলে কোনো জেলেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নদীতে মাছ শিকারে যাবে না।
ভোলার ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী সমিতির নেতা মো: এরশাদ বলেন, আমরা সরকারি সিদ্ধান্তকে সম্মান জানাই, তবে ২২ দিনের জন্য বরাদ্দকৃত ২৫ কেজি চাল একটি পরিবারের জন্য একেবারেই অপ্রতুল। এছাড়া ভোলার নিবন্ধিত ১ লাখ ৭৮ হাজার জেলেদের মধ্যে প্রায় ৩০ হাজার জেলে এখনো এই সহায়তার বাইরে রয়েছে। আমাদের দাবি—চালের পরিমাণ বাড়িয়ে কমপক্ষে ৫০ কেজি করা হোক এবং চালের পাশাপাশি তেল, ডাল ও অন্যান্য নিত্যপণ্যের জন্য অন্তত ৫ হাজার টাকা নগদ সহায়তা দেওয়া হোক। পাশাপাশি সাগরে ভারতীয় জেলেদের অনুপ্রবেশ ও ট্রলিং ট্রলারের অবৈধ মাছ ধরা বন্ধ করতে হবে।
জেলা মৎস্য বিভাগ বলছে, নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের জন্য ইতোমধ্যে বিভিন্ন মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র, আড়ৎ ও ঘাটে জেলে ও ব্যবসায়ীদের নিয়ে সচেতনতামূলক সভা করেছে জেলা মৎস্য বিভাগ। এ ছাড়া নিবন্ধিত জেলেদের ভিজিএফ-এর ২৫ কেজি করে চাল বিতরণের প্রক্রিয়ার পাশাপাশি আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সর্বাত্মক প্রস্তুতি রয়েছে।
ভোলার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসাইন বলেন, “২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে আমরা সার্বিক প্রস্তুতি নিয়েছি। মাইকিং, লিফলেট ও পোস্টার বিতরণের মাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে। আগামী দু-একদিনের মধ্যেই নিবন্ধিত জেলেদের হাতে ভিজিএফ-এর ২৫ কেজি করে চাল পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। এছাড়া কেউ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নদীতে নামলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পাশাপাশি এ সময়ে এনজিও বা ক্ষুদ্র ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে কিস্তি আদায় স্থগিত রাখে, সে বিষয়েও চিঠি দেওয়া হয়েছে।”
মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই নিষেধাজ্ঞা মেনে চলা খুবই জরুরি মনে করছেন মৎস্য গবেষকরাও।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিশারিজ, অ্যাকুয়াকালচার অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স এর সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, মা ইলিশের যে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, এটি অত্যন্ত জরুরি এবং সব জেলে ভাইদের এই নিষেধাজ্ঞা মেনে চলা উচিত। কারণ, আমাদের এই ইলিশ মাছ ডিম ছাড়ার জন্য সাগর থেকে নদীতে আসবে। আমরা জানি, একটি মা ইলিশ ৩ লক্ষ থেকে ২৩ লক্ষ পর্যন্ত ডিম দিয়ে থাকে। সুতরাং, নদীগুলোতে যদি তারা নিরাপদে ডিম ছাড়ার সুযোগ পায়, তবে সেগুলো জাটকায় রূপান্তরিত হবে এবং পরবর্তীতে বড় হয়ে আবার আমাদের নদীতেই ফিরে আসবে। কিন্তু আমরা যদি মা ইলিশকে ডিম দেওয়ার সুযোগ না দিই এবং জাটকা রক্ষা করতে না পারি, তবে ভবিষ্যতে আর বড় ইলিশ পাওয়া যাবে না। বর্তমানে যেহেতু ইলিশের উৎপাদন কমে যাচ্ছে, তাই এটিকে টিকিয়ে রাখা এবং উৎপাদন বাড়ানোর জন্য এখন থেকেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীসহ আমাদের সবার দায়িত্ব হলো নদীকে অবৈধ জাল, দখল ও দূষণ থেকে মুক্ত রাখা, যাতে ইলিশ নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়তে পারে এবং জাটকা বড় হওয়ার সুযোগ পায়। সঠিকভাবে এই কঠোরতা বজায় রাখতে পারলে আগামী দিনে ইলিশের উৎপাদন বহুগুণ বেড়ে যাবে বলে আমরা মনে করি।”
ভোলা জেলার ৭ উপজেলায় ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩ শত ৭০ জন নিবন্ধিত জেলে রয়েছে। এদের মধ্য থেকে ১ লাখ ৪৩ হাজার ৬ শত ৫৬ জেলেকে জনপ্রতি ২৫ কেজি করে প্রণোদনা হিসেবে চাল দেয়া হবে। সরকারের নিবন্ধনের বাইরেও রয়েছে আরও অন্তত দেড় লাখ জেলে, তারা সরকারের এই প্রণোদনা থেকে বঞ্চিত হবে।

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।