গত আট মাসে ৩৬ শিশুর লাশ উদ্ধার, এখনো নিখোঁজ দুই হাজার

দেশে শিশু নিখোঁজ ও হত্যার ঘটনায় উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে নিখোঁজ হওয়ার পর ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন ঘটনায় হত্যা, ধর্ষণের পর হত্যা ও নির্যাতনসহ নানা কারণে ১৫৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।
অন্যদিকে, পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বছরের প্রথম সাত মাসে সারা দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে বা তারা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে। এখনো সন্ধান মেলেনি ২ হাজার ৩৮ শিশুর।
আসকের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত নিখোঁজ হওয়ার পর ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজের পর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাগুলোর পাশাপাশি এ সময়ে শিশুদের ধর্ষণের পর হত্যা, শারীরিক নির্যাতনে মৃত্যু এবং স্বজনদের সঙ্গে হত্যার ঘটনাও ঘটেছে।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের তথ্যের ভিত্তিতে আসক তাদের পরিসংখ্যান তৈরি করেছে। সংগঠনটির হিসাবে, জানুয়ারি-আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনায় মোট ১৫৫ শিশু নিহত হয়েছে। এর মধ্যে শারীরিক নির্যাতনে ৬৮, পারিবারিক পরিসরে নির্যাতনে ৪৯ এবং ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে ২৬ শিশু। এ ছাড়া ধর্ষণচেষ্টার পর চার, গুলিতে তিন, গৃহকর্মী হিসেবে শারীরিক নির্যাতনে দুই, উত্ত্যক্তকারীর হাতে দুই এবং অপহরণের পর একজন শিশু নিহত হয়েছে।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনাও পরিস্থিতির ভয়াবহতা সামনে এনেছে। কুমিল্লায় ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর আগে জামালপুরের মাদারগঞ্জে সাত বছরের এক শিশু বিদ্যালয়ে যাওয়ার পর নিখোঁজ হয়। দুই দিন পর সহপাঠীর বাড়ির মেঝেতে মাটিচাপা অবস্থায় তার মরদেহ পাওয়া যায়। পুলিশের ভাষ্য, শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পাবনা সদরেও ১০ বছরের এক শিশু নিখোঁজ হওয়ার সাত দিন পর একটি ডোবা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের ভাষ্য, শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায়ও দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
শিশু নিখোঁজের সংখ্যাও উদ্বেগজনক। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় জিডি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে অথবা তারা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে। অর্থাৎ নিখোঁজ শিশুদের ৮৭ শতাংশের বেশি উদ্ধার হয়েছে। তবে এখনো নিখোঁজ রয়েছে ২ হাজার ৩৮ জন, যা মোট নিখোঁজের প্রায় ১৩ শতাংশ।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ শিশুদের মধ্যে শূন্য থেকে নয় বছর বয়সী ৪৭৪ জনের বিষয়ে জিডি হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪০৬ জনকে উদ্ধার করা গেলেও ৬৮ জন এখনো উদ্ধার হয়নি।
অন্যদিকে, ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু নিখোঁজের ঘটনায় জিডি হয়েছে ১৫ হাজার ২৪৩টি। এর মধ্যে ১৩ হাজার ২৭৩ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো উদ্ধার হয়নি ১ হাজার ৯৭০ জন।
পুলিশ বলছে, ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অপরিচিত স্থানে গিয়ে পথ হারানো, নিজের নাম-ঠিকানা বলতে না পারা কিংবা একা বাড়ি ফেরার সময় অন্যত্র চলে যাওয়ার মতো কারণে নিখোঁজের ঘটনা ঘটে।
আর ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে অভিমান, পড়াশোনার চাপ, পারিবারিক কলহ ও অশান্তি, বন্ধু বা সহপাঠীদের প্রভাব, স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা এবং বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার মতো বিষয়কে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে পুলিশ।
পুলিশ সদর দপ্তর আরও জানিয়েছে, অনলাইন জিডি সুবিধা চালুর ফলে নিখোঁজ সংক্রান্ত জিডির সংখ্যা বেড়েছে। ২০২৩ সালে শিশু নিখোঁজের ঘটনায় ১৭ হাজার ৮০৮টি জিডি হয়েছিল। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ৪১৪ এবং ২০২৫ সালে ২২ হাজার ৫৫০।
নিখোঁজের পর শিশুদের মরদেহ উদ্ধার, ধর্ষণের পর হত্যা ও নির্যাতনের মতো ঘটনায় শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফাতেমা রেজিনা ইকবাল এসব ঘটনাকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে প্রশ্ন তুলেছেন—শিশুদের নিরাপদ জায়গা আসলে কোথায়।
তার মতে, দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ার পাশাপাশি এ ধরনের অপরাধ কমানোর ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতে পারে।
এর আগে শিশুদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছিল ইউনিসেফ। সংস্থাটি শিশুদের সুরক্ষায় অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা, শিশুবান্ধব পুলিশ ও বিচারপ্রক্রিয়া, স্থানীয় সুরক্ষা সেবা এবং মানসিক-সামাজিক সহায়তা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেয়। একই সঙ্গে স্কুল, মাদ্রাসা, কর্মক্ষেত্রসহ শিশুদের সংশ্লিষ্ট সব জায়গায় জবাবদিহি বাড়ানোর আহ্বান জানায়।
সব মিলিয়ে, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে নিখোঁজ হওয়ার পর ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধার এবং প্রথম সাত মাসে নিখোঁজ হওয়া ২ হাজার ৩৮ শিশুর এখনো সন্ধান না পাওয়ার তথ্য শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। নিখোঁজ প্রতিটি শিশুর দ্রুত সন্ধান, কার্যকর তদন্ত এবং শিশুদের সুরক্ষায় পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সমন্বিত উদ্যোগ এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
