সর্বশেষঃ

সাংস্কৃতিক চর্চায় রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম কী করছে, দায় কার?: অহিদুজ্জামান রানা

একজন প্রকৃত শিল্পীকে শৈশব থেকে দীর্ঘদিন কঠোর অনুশীলন, সাধনা ও নানা পরীক্ষার মধ্য দিয়ে নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হতে হয়। সংগীত, নাটক, নৃত্য, চিত্রকলা কিংবা অন্য যেকোনো সৃজনশীল ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জন একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। অথচ রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্বপূর্ণ সৃজনশীল দায়িত্বে যখন মূলত প্রশাসনিক কাঠামো থেকে আসা কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করেন, তখন প্রশ্ন ওঠে—সৃজনশীলতার জায়গায় প্রয়োজনীয় পেশাগত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে কি?

একসময় বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনে মিউজিশিয়ান, সংগীত প্রযোজক, গীতিকার, প্রোগ্রাম প্রযোজক, নাট্যকার, নাট্যনির্মাতা, সাংস্কৃতিক সংগঠক ও সেট ডিজাইনারসহ বিভিন্ন সৃজনশীল পদে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ ও প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরা যুক্ত ছিলেন। তাঁদের দীর্ঘদিনের চর্চা ও অভিজ্ঞতা সরাসরি অনুষ্ঠান নির্মাণের মানে প্রতিফলিত হতো।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোতে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বাড়তে থাকায় সৃজনশীল নেতৃত্বের জায়গাটি অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল হয়েছে। শিল্প ও সংস্কৃতির সূক্ষ্ম বিষয়গুলো সম্পর্কে পেশাগত অভিজ্ঞতা না থাকলে একটি অনুষ্ঠান বা সাংস্কৃতিক উদ্যোগের মান, দর্শক-শ্রোতার রুচি এবং শিল্পীদের প্রয়োজন যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা কঠিন।

বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের সঙ্গে অতীতে কাজ করেছেন কাজী নজরুল ইসলাম, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, শচীন দেববর্মন, কলিম শরাফী, মুস্তাফা মনোয়ার, আবদুল্লাহ আল মামুন, নওয়াজেশ আলী খান, ড. আতিকুর রহমান, মুস্তাফা জামান আব্বাসী ও আলী ইমামের মতো বহু গুণী ব্যক্তি। তাঁদের প্রত্যেকেরই সংস্কৃতির কোনো না কোনো ক্ষেত্রে গভীর চর্চা ও অভিজ্ঞতা ছিল।

বর্তমান সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, রাষ্ট্রীয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে সৃজনশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে পেশাগত যোগ্যতা, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা ও শিল্পীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও সৃজনশীলতার পরিবর্তে প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগ বেশি প্রভাব ফেলছে। এর ফলে প্রকৃত শিল্পীরা যথাযথ সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ মনে করেন।

আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো নতুন প্রযোজনা ও অনুষ্ঠান নির্মাণের গতি। নিয়মিত নতুন অনুষ্ঠান তৈরি না হলে শিল্পীদের কাজের সুযোগ কমে যায়, নতুন প্রতিভা উঠে আসার পথ সংকুচিত হয় এবং রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ধীরে ধীরে তার সাংস্কৃতিক নেতৃত্বের ভূমিকা হারাতে পারে।

কাঠামোগত সংকট কোথায়?

প্রথমত, প্রশাসনিক কাঠামো বনাম সৃজনশীল নেতৃত্ব।
রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক দক্ষতার পাশাপাশি অনুষ্ঠান নির্মাণ, সংগীত, নাটক ও অন্যান্য সৃজনশীল বিষয়ে বিশেষায়িত জ্ঞান প্রয়োজন। সাধারণ প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া একজন কর্মকর্তার সেই পেশাগত দক্ষতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হয় না।

দ্বিতীয়ত, অনুষ্ঠান নির্মাণ ও বাজেট ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘসূত্রতা।
ফাইল, অনুমোদন ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার জটিলতা সৃজনশীল কাজের গতি কমিয়ে দিতে পারে। সময়মতো বাজেট ও অনুমোদন না পেলে অনেক ভালো উদ্যোগও বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে।

তৃতীয়ত, তৃণমূলের শিল্পীদের সঙ্গে যোগাযোগের ঘাটতি।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অসংখ্য প্রতিভাবান শিল্পী, সংগীতশিল্পী, নাট্যকর্মী ও লোকশিল্পী রয়েছেন। তাঁদের খুঁজে বের করা এবং জাতীয় পর্যায়ে তুলে আনার জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়মিত মাঠপর্যায়ের সাংস্কৃতিক নেটওয়ার্ক প্রয়োজন।

চতুর্থত, সম্প্রচারকে শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব হিসেবে দেখার প্রবণতা।
সম্প্রচার কেবল তথ্য পৌঁছে দেওয়ার কাজ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নান্দনিকতা, সৃজনশীলতা, প্রযুক্তি, দর্শক-শ্রোতার রুচি এবং সমাজের সাংস্কৃতিক বিকাশ।

পঞ্চমত, মূল্যায়ন ও পদোন্নতির কাঠামো।
সৃজনশীল প্রতিষ্ঠানে দক্ষতা, নতুন কাজের মান ও সৃজনশীল অবদানকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, সেটিও নতুন করে পর্যালোচনার দাবি রাখে।

সমাধান কী?

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ভূমিকা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন প্রকৃত শিল্পী, নির্মাতা, সংগীতজ্ঞ, নাট্যকর্মী, গবেষক ও সংস্কৃতি সংগঠকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ।

প্রযোজনা ও সৃজনশীল দায়িত্বে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে নিয়োগ, অনুষ্ঠান নির্বাচন, অনুদান ও শিল্পী মূল্যায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম যদি নতুন প্রজন্মের শিল্পী তৈরি, আঞ্চলিক সংস্কৃতিকে জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরা এবং মানুষের রুচি ও মনন গঠনের দায়িত্ব পালন করতে চায়, তাহলে তাকে আমলাতান্ত্রিক আনুষ্ঠানিকতার বাইরে গিয়ে সৃজনশীলতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

সবশেষে প্রশ্ন থেকেই যায়—রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো কি সত্যিই সংস্কৃতির মানুষের জন্য কাজ করছে, নাকি প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরেই আটকে যাচ্ছে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে প্রয়োজন খোলামেলা আলোচনা, তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন এবং প্রয়োজন হলে কাঠামোগত সংস্কার।

আমাদের গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আবারও সৃজনশীল মানুষের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার সময় এসেছে।

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।