তেঁতুলিয়া নদীতে একটি সেতু বদলে দিতে পারে দক্ষিণাঞ্চলের ভাগ্য

ভোলা ও পটুয়াখালীর বাউফলের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া তেঁতুলিয়া নদীর ওপর মাত্র সাড়ে ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সেতু বদলে দিতে পারে পুরো দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক ও যোগাযোগের দৃশ্যপট। ভোলার ভেলুমিয়া থেকে বাউফলের ধূলিয়া পর্যন্ত প্রস্তাবিত এই সেতু নির্মিত হলে ভোলা-বরিশাল সরাসরি যোগাযোগের পাশাপাশি পটুয়াখালীসহ দক্ষিণাঞ্চলের অন্যান্য জেলার সঙ্গে একটি অভূতপূর্ব সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে ভোলা-বরিশাল সরাসরি সড়ক যোগাযোগের দাবি থাকলেও ভোলা-ভেদুরিয়া-লাহারহাট রুটে ১০ দশমিক ৮৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণে ১৭ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকার বিপুল ব্যয় প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ভোলার বাংলাবাজার জিরো পয়েন্ট থেকে ভেলুমিয়া, তেঁতুলিয়া নদীর ওপর সাড়ে ৩ কিলোমিটার সেতু এবং বাউফলের ধূলিয়া-নেহালগঞ্জ হয়ে বরিশালে যুক্ত হওয়ার বিকল্প রুটটি এখন নতুন সম্ভাবনা হিসেবে সামনে এসেছে।
প্রস্তাবিত রুটের শুরু ভোলার বাংলাবাজার জিরো পয়েন্ট থেকে। বাগমারা ব্রিজ হয়ে ভেলুমিয়া চর পর্যন্ত প্রায় ৭ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। এরপর ভেলুমিয়া থেকে বাউফলের ধূলিয়া পর্যন্ত তেঁতুলিয়া নদীর ওপর প্রায় ৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার সেতু নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। সেতুটি নির্মিত হলে ধূলিয়া থেকে হোসনাবাদ রিভারসাইড, গোবিন্দপুর, জিরাইল পাটকাঠী, কারখানা, মাতুব্বর বাজার, নেহালগঞ্জ হয়ে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের সুযোগ তৈরি হবে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে সেতু অংশের দৈর্ঘ্য প্রায় ১০ দশমিক ৮৭ কিলোমিটার এবং সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ১৭ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা। অন্যদিকে, ভেলুমিয়া-ধূলিয়া রুটে প্রায় সাড়ে ৩ কিলোমিটার সেতু নির্মাণের প্রস্তাব সামনে এসেছে। ফলে দীর্ঘ সেতুর পরিবর্তে তুলনামূলক ছোট সেতু এবং বিদ্যমান সড়ক অবকাঠামো ব্যবহার করে বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
ভেলুমিয়া-ধূলিয়া সেতু নির্মিত হলে শুধু ভোলা ও বাউফলের মানুষের যোগাযোগ সহজ হবে না, এর প্রভাব পড়তে পারে বৃহত্তর দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি ও বাণিজ্যেও। ভোলার কৃষি ও মৎস্যসম্পদ, বিশেষ করে ইলিশ, তরমুজ ও অন্যান্য কৃষিপণ্য দ্রুত পটুয়াখালী ও বরিশালের বাজারে পৌঁছানোর সুযোগ পাবে। পাশাপাশি ভোলার প্রাকৃতিক গ্যাসকে কেন্দ্র করে শিল্পকারখানা গড়ে উঠলে উৎপাদিত পণ্য দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন বাজারে পরিবহনও সহজ হবে।
বাউফল হয়ে পটুয়াখালীর সঙ্গে ভোলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হলে ভবিষ্যতে ভোলার পণ্য পায়রা বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে দক্ষিণাঞ্চলের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য সম্প্রসারণের পাশাপাশি ভোলা ও পটুয়াখালীর মধ্যে নতুন অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও তৈরি হবে। একই সঙ্গে ভোলা, বরিশাল ও পটুয়াখালীর পর্যটনকেন্দ্রগুলোর মধ্যে যাতায়াত সহজ হবে। বিশেষ করে কুয়াকাটাসহ দক্ষিণাঞ্চলের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে ভোলা ও বরিশাল থেকে সড়কপথে যাতায়াতের সুযোগ বাড়বে। ফলে পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসা, পরিবহন ও স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি আসতে পারে।
ভেলুমিয়া-ধূলিয়া সেতুর দাবিতে বাউফলের ধূলিয়া এলাকায় ইতোমধ্যে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্থানীয় যুবক, প্রবীণসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে অংশ নেন। স্থানীয় পর্যায়ে শুরু হওয়া এই দাবি এখন ভোলা-বাউফল-বরিশালসহ বৃহত্তর দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগের সম্ভাব্য বিকল্প রুট হিসেবে আলোচনায় এসেছে।
পটুয়াখালী ও ভোলা (ভেলুমিয়া-ধুলিয়া) সেতু বাস্তবায়ন কমিটির যুগ্ম সদস্য সচিব সৈয়দ নিজামুল হক রিপন বলেন, ‘ভোলা-বরিশাল সরাসরি সড়ক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা এই অঞ্চলের কোটি মানুষের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি হলেও এই প্রকল্প বাস্তবায়ন অত্যন্ত ব্যয়বহুল। কিন্তু বাংলাবাজার-ভেলুমিয়া-ধূলিয়া তেঁতুলিয়া নদীতে মাত্র ৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার সেতু নির্মাণ করা হলে ভোলাকে মূল ভূখণ্ডের সড়ক নেটওয়ার্কে যুক্ত করা সম্ভব হবে। এতে একদিকে সরকারি অর্থ সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে বরিশাল, পটুয়াখালীসহ দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে ভোলার নতুন সংযোগ সৃষ্টি হবে।
বাউফল উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব আপেল মাহমুদ ফিরোজ বলেন, ভোলা ও পটুয়াখালীর মানুষের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক মুক্তি এবং সহজ যোগাযোগের জন্য বাউফলের ধূলিয়া-ভেলুমিয়া রুটটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাজার হাজার কোটি টাকা অপচয় না করে তেঁতুলিয়া নদীর ওপর মাত্র ৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার সেতু নির্মাণ করা গেলে পটুয়াখালী, বাউফল ও ভোলাবাসীর মধ্যে সরাসরি সড়ক যোগাযোগের ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সূচনা হবে। এটি বাস্তবায়িত হলে অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি ও সার্বিক যোগাযোগব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটবে।
বাউফল উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা রফিকুল ইসলাম বলেন, ভোলা-বরিশাল সরাসরি সড়ক যোগাযোগের মাধ্যমে সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলের ভাগ্য পরিবর্তনের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে। বিশাল ব্যয়ের দীর্ঘ সেতুর বদলে বাউফলের ধূলিয়া ও ভোলার ভেলুমিয়া পয়েন্টে সেতু নির্মাণ করা হলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ লাঘবের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সম্পদের বড় সাশ্রয় হবে। এই বিকল্প রুট বাস্তবায়িত হলে ভোলা, পটুয়াখালী ও বরিশালের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বন্ধন আরও মজবুত হবে।
পটুয়াখালী সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জামিল আক্তার লিমন বলেন, সেতু নির্মাণের মতো বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারক কর্মকর্তারা যুক্ত থাকেন। বাউফলের ধূলিয়া ও ভোলার ভেলুমিয়া পয়েন্টে তেঁতুলিয়া নদীতে সেতু নির্মাণের বিষয়ে স্থানীয় জনগণের যে দাবি রয়েছে, সে সম্পর্কে আমি অবগত। তবে সেই দাবি অনুযায়ী সেতু বাস্তবায়নের বিষয়ে আমি নির্দিষ্ট কিছু জানি না। তবে ভোলা-বরিশাল সংযোগের জন্য প্রচলিত ভেদুরিয়া-লাহারহাট রুটে সেতু নির্মাণ নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
