সর্বশেষঃ

১২ ঘণ্টায় ৯ বার লোডশেডিং, বিদ্যুৎ এলেও থাকছে না ২০ মিনিট

বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় তীব্র লোডশেডিংয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন খুলনা অঞ্চলে সাধারণ মানুষ। দিনের পাশাপাশি রাতেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে বাসাবাড়ির স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। একই সঙ্গে মিল-কারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষার্থী ও অনলাইনভিত্তিক পেশাজীবীদের কাজও ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও কোথাও লোডশেডিংয়ের কারণে দেখা দিয়েছে পানির সংকট।

গ্রাহকদের অভিযোগ, কখন বিদ্যুৎ যাবে আর কখন আসবে, তার কোনো নির্দিষ্ট হিসাব নেই। অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ আসার ২০ মিনিটের মধ্যেই আবার চলে যাচ্ছে। ভ্যাপসা গরমে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি।

ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ আগস্ট সকাল ১০টায় খুলনা জোনে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৫২২ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ৪০৬ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি ছিল ১১৬ মেগাওয়াট।

ওজোপাডিকোর উপসহকারী প্রকৌশলী মো. রাকিব জানান, একই সময়ে বরিশাল জোনে ১৫৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১২৫ মেগাওয়াট। অর্থাৎ দুই জোনে মোট ৬৭৭ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যায় ৫৩১ মেগাওয়াট। মোট ঘাটতি ছিল ১৪৬ মেগাওয়াট।

ওজোপাডিকোর তথ্যমতে, ওই সময় খুলনায় ৪২ মেগাওয়াট, বাগেরহাটে ৪, নড়াইলে ২, মাগুরায় ৮, কুষ্টিয়ায় ১০, ঝিনাইদহে ১৩, চুয়াডাঙ্গায় ১, ফরিদপুরে ৮, রাজবাড়ীতে ১৪, মাদারীপুরে ৬, শরীয়তপুরে ২ এবং গোপালগঞ্জে ৬ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল। বরিশাল বিভাগের মধ্যে বরিশালে ১৯, ঝালকাঠিতে ৩, পিরোজপুরে ৩, বরগুনায় ২ এবং ভোলায় ৩ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল।

দুপুর ১টার দিকে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। ওই সময় দুই জোনে মোট লোডশেডিং দাঁড়ায় ২৩৯ মেগাওয়াটে। ৮০৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৫৬৭ মেগাওয়াট। পিক আওয়ারে খুলনা অঞ্চলে ৬২৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৪৫৬ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ঘাটতি ছিল ১৬৯ মেগাওয়াট। একই সময়ে বরিশাল অঞ্চলে ১৮১ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১১১ মেগাওয়াট; ঘাটতি ছিল ৭০ মেগাওয়াট।

পরদিন ৩১ আগস্ট দুপুর ১টার তথ্যেও ঘাটতির চিত্র স্পষ্ট হয়। দুই জোনে মোট ১৭৯ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল। ৭৫৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যায় ৫৭৬ মেগাওয়াট। শুধু খুলনা অঞ্চলে ৫৭৩ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৪৫০ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় ১২৩ মেগাওয়াটে। বরিশাল অঞ্চলে ১৮২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১২৬ মেগাওয়াট; ঘাটতি ছিল ৫৬ মেগাওয়াট।

খুলনা মহানগরীর লবণচরা এলাকার বাসিন্দা মো. শাহরিয়ার রাব্বি বলেন, শনিবার বেলা আড়াইটা থেকে রাত ৩টা পর্যন্ত অন্তত নয়বার লোডশেডিং হয়েছে। প্রতিবার এক থেকে দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ ছিল না। বিদ্যুৎ এলেও সর্বোচ্চ ২০ মিনিটের মতো থাকছে।

তিনি বলেন, ‘ভয়াবহ একটা অবস্থা তৈরি হয়েছে। অসুস্থ হয়ে পড়ছি।’

ফ্রিল্যান্সিংয়ের সঙ্গে যুক্ত শাহরিয়ার আরও বলেন, অনলাইনে কাজ করতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন। লোডশেডিংয়ের কারণে সময়মতো ক্লায়েন্টদের কাজ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এতে কাজের ক্ষতির পাশাপাশি ক্লায়েন্ট হারানোর আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়েছে শিল্প-কারখানাতেও। নিয়মিত বিদ্যুৎ না থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানকে বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং লোকসানের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) খুলনা জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট কুদরত-ই-খুদা বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে মানুষের ভোগান্তির পাশাপাশি মিল-কারখানার উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রভাব অর্থনীতিতেও পড়ছে।

তিনি বলেন, ‘বিশ্ব এখন সৌরবিদ্যুতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশকেও দ্রুত বিকল্প বিদ্যুতের দিকে যেতে হবে। যারা সৌরবিদ্যুৎ আমদানি করবে, তাদের প্রণোদনা দিয়ে এ উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।’

জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমাতে ছয়তলার বেশি নতুন ভবনে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করার দাবি জানান কুদরত-ই-খুদা। পাশাপাশি ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের বিদ্যুৎ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণেরও দাবি করেন তিনি।

কুদরত-ই-খুদার দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, একটি ইজিবাইক চার্জ দিতে ১৩ থেকে ১৪ ইউনিট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। খুলনায় প্রায় ৩০ হাজার ইজিবাইক ও ১৫ হাজার অটোরিকশা রয়েছে। এসব যানবাহনের চার্জিংয়ে প্রতিদিন প্রায় ৫ লাখ ৮৫ হাজার ইউনিট বা ৫৮ দশমিক ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয় বলে তিনি দাবি করেন।

বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি দ্রুত কমিয়ে আনার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন ভোক্তা অধিকারকর্মীরা। তাদের মতে, বিদ্যুৎ সংকট দীর্ঘায়িত হলে জনদুর্ভোগের পাশাপাশি শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনীতিতেও এর চাপ আরও বাড়তে পারে।

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।