সর্বশেষঃ

জাল নথিতে খাসজমি দখলের অভিযোগ, হাইকোর্টে পক্ষভুক্ত তিন ভূমিহীন

ভোলার চরফ্যাশনে সরকারি খাসজমি দখলের চেষ্টায় জাল নথি ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি রেকর্ডে অস্তিত্ব না থাকা পুরোনো ‘বন্দোবস্ত’ ও ‘মিস মামলা’র কাগজকে ভিত্তি করে ওমরাবাজ মৌজার সাড়ে চার একরের বেশি খাসজমি দখলের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন সরকারি বন্দোবস্ত পাওয়া তিন ভূমিহীন। তাঁদের দাবি, জমি থেকে উচ্ছেদের উদ্দেশ্যে একের পর এক মামলা দিয়ে তাঁদের আর্থিক ও সামাজিকভাবে হয়রানি করা হচ্ছে।

এ ঘটনায় দায়ের হওয়া দেওয়ানি মামলার ধারাবাহিকতায় নতুন মোড় এসেছে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে। এত দিন প্রকৃত বন্দোবস্তগ্রহীতাদের বাদ রেখে দুই পক্ষের মধ্যে আইনি লড়াই চললেও হাইকোর্ট তিন ভূমিহীনকে দেওয়ানি রিভিশন মামলায় ৩০ থেকে ৩২ নম্বর বিবাদী পক্ষ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার আদেশ দিয়েছেন।

পক্ষভুক্ত তিন ভূমিহীন হলেন চরফ্যাশনের উত্তর মাদ্রাজ এলাকার মো. সাইফুল ইসলাম, তাঁর স্ত্রী ফারজানা বেগম এবং স্বামীহারা ফাতেমা বেগম।

মামলার নথি ও সংশ্লিষ্ট ভূমি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চরফ্যাশনের ওমরাবাজ মৌজার ৯৭ নম্বর জে.এলভুক্ত এসএ ১৬৯১ নম্বর প্লটের দিয়ারা ৫৬৪৭ দাগে মোট ৪ একর ৯০ শতাংশ খাসজমি রয়েছে। এর মধ্যে ২০২১-২২ অর্থবছরে সরকারি নিয়মে সাইফুল ইসলাম ও ফারজানা বেগমকে যৌথভাবে ১.৫০ একর এবং ফাতেমা বেগমকে ১.৫০ একর জমি বন্দোবস্ত দেওয়া হয়।

বন্দোবস্ত পাওয়ার পর তাঁরা রেজিস্ট্রিকৃত কবুলিয়ত, খতিয়ান ও ডিসিআর গ্রহণ করেন। ২০২৩ সালের ৫ জানুয়ারি সার্ভেয়ারের মাধ্যমে জমির ভৌত দখলও বুঝে নেন। এরপর থেকে তাঁরা নিয়মিত খাজনা পরিশোধ করে আসছেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

বিরোধের সূত্রপাত কথিত একটি পুরোনো বন্দোবস্তকে কেন্দ্র করে। ফাতেমা বেগমের অভিযোগ, দক্ষিণ ফ্যাশনের মৃত আলী আহাম্মদের নামে ১৯৫০-৫১ সালের একটি বন্দোবস্তের কাগজ দেখিয়ে ৪ একর ৮৮ শতাংশ জমির মালিকানা দাবি করা হচ্ছে। ওই বন্দোবস্তের কেস নম্বর হিসেবে ১২৬ এফ/১৯৫০-৫১ উল্লেখ করা হলেও চরফ্যাশন ও লালমোহন উপজেলা ভূমি কার্যালয়ের ১২ নম্বর রেজিস্টারে এ ধরনের কোনো বন্দোবস্তের তথ্য পাওয়া যায়নি বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

আরেকটি অভিযোগ উঠেছে ১৯৯৪-৯৫ অর্থবছরের কথিত ৪২৫ এফ/১৯৯৪-৯৫ নম্বর ‘মিস মামলা’ নিয়ে। এই মামলার ভিত্তিতে নামজারি খতিয়ান দাবি করা হলেও ভূমি কার্যালয়ের রেকর্ড অনুযায়ী ওই অর্থবছরে চরফ্যাশনে সর্বোচ্চ মিস মামলা ছিল ১৭৬টি। ফলে ৪২৫ নম্বর মিস মামলার প্রশাসনিক ভিত্তি বা রেজিস্টারে অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে ভূমি কার্যালয়।

বিষয়টি গড়িয়েছে ফৌজদারি মামলাতেও। দণ্ডবিধির ৪২০, ৪৬৭ ও ৪৬৮ ধারায় দায়ের করা সিআর মামলা নম্বর ৩৮/২০২৫ তদন্ত করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তদন্ত প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট দাগের নামজারি ও বন্দোবস্তসংক্রান্ত দাবিকৃত কাগজপত্রকে মিথ্যা, ভুয়া ও যোগসাজশমূলক বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

চরফ্যাশন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এমাদুল হোসেন বলেন, সিআর ৩৮/২০২৫ মামলার পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ১৪ অক্টোবর ৮৩১ নম্বর স্মারকে সিআইডি ভোলা ওই মিস মামলার তথ্য চেয়েছিল। পরে ভলিউম যাচাই করে দেখা যায়, ১৯৯৪-৯৫ অর্থবছরে চরফ্যাশনে সর্বশেষ মিস মামলা ছিল ১৭৬ এফ/১৯৯৪-৯৫। ফলে ৪২৫ এফ/১৯৯৪-৯৫ নম্বর মিস মামলার কোনো প্রশাসনিক ভিত্তি বা রেজিস্টারে অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

ফাতেমা বেগম বলেন, সরকার জমি দেওয়ার পর থেকেই শফিক ও ইসমাইল নামের দুই ব্যক্তি কথিত জাল কাগজপত্র তৈরি করে তাঁদের জমি দখলের চেষ্টা করছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, একটি চক্র ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে জমি নিয়ে মামলা-মোকদ্দমাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অভিযোগ অস্বীকার করে মূল দাবিদার আবুল বাসার বলেন, বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন। তাঁরা নিয়মতান্ত্রিকভাবেই আইনি লড়াই করছেন এবং কাউকে হয়রানি করা হচ্ছে না।

অভিযুক্ত শফিকও জমি দখল বা হয়রানির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তাঁরা আইনি কাগজপত্রের ভিত্তিতেই দাবি উপস্থাপন করছেন।

অন্য অভিযুক্ত ইসমাইল অবশ্য বলেন, আবুল বাসার গং তাঁকে টাকা দেন এবং সে কারণে তিনি তাঁদের পক্ষে কাজ করেন।

তিন ভূমিহীনের আইনজীবী মোহাম্মদ শামসুল আলম বলেন, চরফ্যাশনের টাইটেল স্যুট ৯/২০১৫ ও টাইটেল আপিল ১২/২০১৯-এর ধারাবাহিকতায় হাইকোর্টে দেওয়ানি রিভিশন মামলাটি চলছিল। প্রকৃত বন্দোবস্তগ্রহীতাদের আড়ালে রেখে নথিপত্রের জালিয়াতি আড়াল করার যে চেষ্টা হয়েছিল, তাঁদের পক্ষভুক্ত করার আদেশের মধ্য দিয়ে তার অবসান হয়েছে।

এখন হাইকোর্টে মামলার পরবর্তী শুনানিতে সরকারি বন্দোবস্তের নথি, কথিত পুরোনো দলিল এবং মিস মামলার অস্তিত্ব—সবকিছুই বিচারিকভাবে পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি রেকর্ডে অস্তিত্বহীন নথি ব্যবহার করে খাসজমি দখলের অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রশাসন ও আদালত কী ব্যবস্থা নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

 

তথ্য সূত্র- মো. সাইফুল ইসলাম, সময়ের কণ্ঠস্বর

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।