জনবল সংকটে ধুঁকছে চরফ্যাশন হাসপাতাল, ৬৬ চিকিৎসকের বিপরীতে কর্মরত ২১ জন

উপকূলীয় উপজেলা চরফ্যাশনে প্রায় ৭ লাখ মানুষের চিকিৎসা সেবার প্রধান ভরসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, বিশেষজ্ঞ টিম, বিভিন্ন পদে জনবল, রেডিওগ্রাফার ও আধুনিক ল্যাব সুবিধার সংকটে ব্যাহত হচ্ছে হাসপাতালটির চিকিৎসা সেবা। ৬৬ জন চিকিৎসকের পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ২১ জন। ফলে বিপুলসংখ্যক রোগীর চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, অবকাঠামোগতভাবে হাসপাতালটি ১০০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও প্রয়োজনীয় জনবল ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন না থাকায় এখনো পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চালু হয়নি। চিকিৎসকসহ বিভিন্ন পদে জনবল সংকট থাকায় প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
হাসপাতালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৬৬ জন চিকিৎসক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ২১ জন। এর মধ্যে ১০ জন কনসালট্যান্টের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ২ জন। ৫২ জন মেডিকেল অফিসারের বিপরীতে আছেন ১৭ জন। ৩০ জন নার্সের পদের বিপরীতে কর্মরত ২৮ জন। এছাড়াও ১৬টি স্যাকমো পদের বিপরীতে রয়েছেন মাত্র ২ জন।
এছাড়াও ৫ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ২ জন এবং ৩ জন ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্টের বিপরীতে আছেন ২ জন। তিনটি ফার্মাসিস্ট পদ থাকলেও বর্তমানে কোনো ফার্মাসিস্ট কর্মরত নেই।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট
চরফ্যাশন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শিশু, গাইনি ও হৃদরোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট রয়েছে। ফলে এসব রোগে আক্রান্তদের নিয়মিত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র যেতে হচ্ছে। বিশেষ করে নারী ও শিশু রোগীদের ভোগান্তি বেশি।
হৃদরোগে আক্রান্ত মো. রতন বলেন, “আমি দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগে আক্রান্ত। হঠাৎ অসুস্থ হলে এই হাসপাতালে আসতে হয়। কিন্তু নিয়মিত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় সপ্তাহে শুক্রবার যে ডাক্তার আসেন, তার ওপরই নির্ভর করতে হয়। জরুরি সময়ে এভাবে চিকিৎসা পাওয়া খুবই কঠিন।”
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী আইয়ুব বলেন, “আমাদের এই হাসপাতালে বিশেষ করে একজন শিশু বিশেষজ্ঞ ও একজন গাইনি চিকিৎসক অত্যন্ত প্রয়োজন। চরফ্যাশন একটি বড় উপজেলা। পাশের উপজেলার লোকজনও এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। অথচ এক্স-রে থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা হাসপাতালের বাইরে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে করতে হয়। এতে আমাদের বাড়তি টাকা খরচ হয়।”
এক্স-রে মেশিন আছে, নেই রেডিওগ্রাফার
হাসপাতালে এক্স-রে মেশিন থাকলেও সেটি পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় রেডিওগ্রাফার নেই। ফলে দুর্ঘটনায় আহতসহ বিভিন্ন রোগীর এক্স-রে করাতে অনেক সময় হাসপাতালের বাইরে যেতে হচ্ছে। এতে রোগীদের যেমন বাড়তি অর্থ ব্যয় হচ্ছে অন্যদিকে নষ্ট হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ সময়ও। তাই জরুরি রোগীদের দ্রুত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা সম্ভব না হওয়ায় চিকিৎসা ব্যবস্থাপনাতেও তৈরি হয়েছে জটিলতা।
নেই আধুনিক ল্যাব, সিবিসি মেশিনও
হাসপাতালটিতে আধুনিক মানের পূর্ণাঙ্গ ল্যাব সুবিধা নেই। প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। এমনকি রক্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা সিবিসি করার জন্যও প্রয়োজনীয় মেশিন নেই। ফলে রোগীদের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে হচ্ছে।
রোগীর চাপ ও ভোগান্তি
রোগী ও তাদের স্বজনরা জানান, সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ না থাকায় বাধ্য হয়ে বাইরের ডায়াগনস্টিকে যেতে হয়। চরফ্যাশন বড় উপজেলা হওয়ায় এখানকার বাসিন্দাদের পাশাপাশি আশপাশের এলাকার মানুষও এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন। ফলে চিকিৎসক ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার সংকটে রোগীদের দুর্ভোগ বেড়েছে কয়েকগুন।
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মাকলুকুর রহমান বলেন, “হাসপাতালে এক্স-রে মেশিন রয়েছে, কিন্তু রেডিওগ্রাফার না থাকায় পূর্ণাঙ্গ সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আধুনিক ল্যাব ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতিরও ঘাটতি রয়েছে। সিবিসি করার মেশিনও নেই। এসব বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।”
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আশরাফুল ইসলাম সুমন বলেন, “হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা উন্নত করতে প্রয়োজনীয় জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জামের চাহিদা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। চিকিৎসক, নার্সসহ বিভিন্ন পদে জনবল সংকট রয়েছে। পাশাপাশি এক্স-রে সেবা চালু রাখতে রেডিওগ্রাফার এবং আধুনিক ল্যাব পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির প্রয়োজন রয়েছে। এসব সংকট সমাধান হলে রোগীদের চিকিৎসা সেবার মান আরও উন্নত হবে।”
