সর্বশেষঃ

কাগজে ৩৮ হাজার শিক্ষার্থী, বাস্তবে তালা-শূন্য শ্রেণিকক্ষ

ভোলা প্রতিনিধি

সরকারি নথিতে ভোলায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের (ইফা) অধীনে চলছে ১ হাজার ১৫১টি মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষাকেন্দ্র। এসব কেন্দ্রে নিবন্ধিত শিক্ষার্থী ৩৮ হাজার ৪১০ জন। কাগজে-কলমে নিয়মিত পাঠদান চলছে, শিক্ষকরা প্রতি মাসে সরকারি কোষাগার থেকে সম্মানীও পাচ্ছেন। কিন্তু সরেজমিনে গিয়ে মিলেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। কোথাও শিক্ষার্থী নেই, কোথাও শ্রেণিকক্ষে তালা ঝুলছে, আবার কোনো কোনো নির্ধারিত ঠিকানায় গিয়ে কেন্দ্রের অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি।

গত ১৫ থেকে ৩১ জুলাই ভোলা সদর, দৌলতখান ও চরফ্যাশন উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে অন্তত ২০টি কেন্দ্র ঘুরে সরকারি নথির সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার এমন বিস্তর অমিল পাওয়া গেছে। হাতেগোনা কয়েকটি সহজ কোরআন শিক্ষাকেন্দ্রে পাঠদান চলতে দেখা গেলেও অধিকাংশ প্রাক-প্রাথমিক ও বয়স্ক কোরআন শিক্ষাকেন্দ্রে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল খুবই কম। কয়েকটি কেন্দ্রে শিক্ষক থাকলেও শিক্ষার্থী পাওয়া যায়নি। আবার কোথাও নির্ধারিত সময়েও শিক্ষক ছিলেন না।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ভোলা জেলা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ১ হাজার ১৫১টি কেন্দ্রের মধ্যে ৩৫১টি প্রাক-প্রাথমিক, ৭৮৮টি সহজ কোরআন শিক্ষা এবং ১২টি বয়স্ক কোরআন শিক্ষা কেন্দ্র রয়েছে। এসব কেন্দ্রে ১ হাজার ১৫১ জন শিক্ষক দায়িত্ব পালন করছেন। প্রত্যেক শিক্ষক মাসে ৬ হাজার টাকা করে সম্মানী পান। ফলে শুধু শিক্ষকদের সম্মানী বাবদ বছরে সরকারি ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৮ কোটি ২৯ লাখ টাকা। এর বাইরে জেলার ১৪টি দারুল আরকাম ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারীদের পেছনে ব্যয় হচ্ছে আরও প্রায় ৬৭ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে দুটি কার্যক্রমে বছরে সরকারি অর্থ ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৯ কোটি টাকা।

দৌলতখান উপজেলার চরপাতা দারুল আরকাম ইবতেদায়ি মাদ্রাসায় গিয়ে দেখা যায়, তিনজন শিক্ষক ও একজন কর্মচারী উপস্থিত থাকলেও কোনো শিক্ষার্থী নেই। অথচ উপস্থিতি খাতায় প্রথম শ্রেণিতে ২২ জন এবং দ্বিতীয় শ্রেণিতে ১৮ জন শিক্ষার্থীর নাম রয়েছে। স্থানীয় দোকানি আলী আহাম্মদ বলেন, শিক্ষকদের মাঝে মাঝে দেখা গেলেও শিক্ষার্থীদের তিনি দেখতে পান না। পাশের বাসিন্দা মো. মনিরের ভাষ্য, স্থানীয় মানুষের কাছে প্রতিষ্ঠানটি মাদ্রাসার চেয়ে ‘কাচারি’ হিসেবেই বেশি পরিচিত।

ভোলা সদর উপজেলার শিবপুর দারুল আরকাম ইবতেদায়ি মাদ্রাসায় প্রথম দিন গিয়ে কেন্দ্রটি তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। পরে আবার সেখানে গিয়ে একজন শিক্ষক ও মাত্র তিনজন শিশুকে পাওয়া যায়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সেখানে নিয়মিত পাঠদান হয় না। তবে প্রধান শিক্ষক ফাতেমা আক্তার মুক্তা শিক্ষার্থী কম থাকার জন্য বর্ষাকালকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

বাপ্তা ইউনিয়নের হাজি ইয়াছিন মাতাব্বর বাড়ির প্রাক-প্রাথমিক কেন্দ্রের নির্ধারিত ঠিকানায় গিয়ে কোনো শিক্ষাকেন্দ্রের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। বাড়ির প্রবীণ বাসিন্দা নাসির উদ্দিন জানান, সেখানে কখনো এমন কোনো শিক্ষাকেন্দ্র পরিচালিত হয়নি। পরে অনুসন্ধানে জানা যায়, অডিটের সময় অন্য একটি জরাজীর্ণ ঘর দেখিয়ে কেন্দ্র পরিচালনার দাবি করা হয়। শিবপুর গুচ্ছগ্রামের একটি কেন্দ্রেও স্থায়ী শ্রেণিকক্ষের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের দাবি, শিক্ষক মাঝেমধ্যে খোলা জায়গায় পলিথিন বিছিয়ে কয়েকজন শিশুকে নিয়ে পাঠদান করেন।

শুধু শিক্ষার্থী উপস্থিতির ঘাটতিই নয়, কেন্দ্র বরাদ্দ নিয়েও উঠেছে নানা অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর স্ত্রী ও স্বজনদের নামে একাধিক কেন্দ্র বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো কেন্দ্রে ব্যক্তিগত মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সরকারি প্রকল্পের শিক্ষার্থী হিসেবে দেখানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। আবার কোথাও নিজস্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে রিসোর্স সেন্টার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কারণে সরকারি অর্থে পরিচালিত প্রকল্পটির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

সরকারি হিসাবে যেখানে ৩৮ হাজার ৪১০ শিক্ষার্থী থাকার কথা, সেখানে সরেজমিনে অধিকাংশ প্রাক-প্রাথমিক, বয়স্ক কোরআন শিক্ষাকেন্দ্র এবং দারুল আরকাম ইবতেদায়ি মাদ্রাসায় সেই অনুপাতে শিক্ষার্থী পাওয়া যায়নি। বিশেষ করে জেলার ১৪টি দারুল আরকাম মাদ্রাসার বেশ কয়েকটিতে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত কম কিংবা প্রায় শূন্য। ফলে কাগজে থাকা শিক্ষার্থী সংখ্যা এবং বাস্তবে উপস্থিত শিক্ষার্থীর মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধানের বিষয়টি সামনে এসেছে।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ভোলা জেলা উপপরিচালক এম মাকসুদুর রহমান বলেন, প্রাক-প্রাথমিক কেন্দ্রগুলোতে শিক্ষার্থী সংকট নিয়ে তাঁরাও বিব্রত। অনিয়মিত কেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করে সচল করার চেষ্টা করা হবে। প্রয়োজন হলে নীতিমালা অনুযায়ী দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শিশু ও বয়স্কদের ধর্মীয় ও মৌলিক শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে পরিচালিত এই কার্যক্রমে বছরে প্রায় ৯ কোটি টাকা সরকারি অর্থ ব্যয় হচ্ছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে যদি তালাবদ্ধ কেন্দ্র, শিক্ষার্থীহীন শ্রেণিকক্ষ কিংবা অস্তিত্বহীন শিক্ষাকেন্দ্রের চিত্রই পাওয়া যায়, তাহলে প্রকল্পের কার্যকারিতা ও সরকারি অর্থ ব্যয়ের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এখন প্রয়োজন কেন্দ্রভিত্তিক শিক্ষার্থী তালিকা, উপস্থিতির খাতা, শিক্ষক নিয়োগ ও কেন্দ্র বরাদ্দের প্রক্রিয়া এবং সরকারি অর্থ ব্যয়ের কার্যকারিতা নিয়ে নিরপেক্ষ যাচাই।

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।