ভোলার চরাঞ্চলে সুপেয় পানির সংকট, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

চারদিকে নদী। মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন ছোট-বড় চর। কোথাও গভীর নলকূপ আছে, কিন্তু সেটি নষ্ট। কোথাও নলকূপে পানি উঠলেও তা লবণাক্ত। বাধ্য হয়ে পুকুর, খাল কিংবা অন্য অনিরাপদ উৎসের পানি ব্যবহার করছেন চরবাসী।
ভোলার বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলে সুপেয় পানির সংকট দীর্ঘদিনের। চলতি শুষ্ক মৌসুমে এ সংকট আরও তীব্র হয়েছে। লবণাক্ততা, নিরাপদ পানির উৎসের স্বল্পতা এবং স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতার কারণে এসব এলাকার মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন নারী ও শিশুরা।
জেলার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন অন্তত ২০টি চরে দুই লক্ষাধিক মানুষের বসবাস বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে। ভোলা সদর, দৌলতখান, তজুমদ্দিন, মনপুরা, চরফ্যাশন ও লালমোহন উপজেলার বিভিন্ন চর এর মধ্যে রয়েছে।
একটি চরে আটটি নলকূপ, নষ্ট দুটি
দৌলতখান উপজেলার মদনপুর ইউনিয়নের চর বৈরাগীতে প্রায় দুই হাজার মানুষের বসবাস। স্থানীয় বাসিন্দাদের তথ্য অনুযায়ী, তাঁদের সুপেয় পানির জন্য রয়েছে আটটি গভীর নলকূপ। এর মধ্যে দুটি এক বছরের বেশি সময় ধরে নষ্ট। বাকি নলকূপগুলোর কয়েকটিতেও ঠিকমতো পানি ওঠে না।
চরের বাসিন্দারা জানান, নলকূপে পানি না পাওয়া গেলে তাঁদের পুকুর বা খাল থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়। এসব জলাশয়ের পানি রান্না, ধোয়া-মোছা ও অন্যান্য গৃহস্থালি কাজে ব্যবহার করা হয়। একই জলাশয়ে গবাদিপশুকেও গোসল করানো হয়।
চর বৈরাগীর বাসিন্দা রাবেয়া বেগম তিন সন্তান নিয়ে থাকেন। তাঁর স্বামী ও দুই ছেলে মেঘনায় মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। পুকুর থেকে কলস ভরে পানি নেওয়ার সময় তিনি বলেন, ‘কল অনেক দূরে। আবার সব সময় পানি ওঠে না। তাই পুকুরের পানি নিয়ে যাচ্ছি। ঘরে ফিটকিরি আছে, পানি পরিষ্কার করে ব্যবহার করব। কিন্তু ফিটকিরি দিলেও পানির লবণাক্ততা কমে না।’
রাবেয়া বেগম জানান, তাঁর ছোট ছেলের শরীরে চর্মরোগ দেখা দিয়েছে। স্থানীয় এক কবিরাজের কাছ থেকে ওষুধ নেওয়ার পর শিশুটির শরীরে আরও ফোসকা হয়েছে। অর্থের অভাবে তাঁরা শিশুটিকে চিকিৎসকের কাছে নিতে পারেননি।
নোনা পানিতে মাছ ধরা, শরীরে চর্মরোগ
চর বৈরাগীর বাসিন্দা মো. মালেক মেঘনায় মাছ ধরে সংসার চালান। তিনি বলেন, ‘গাঙে জোয়ার-ভাটার সময় নোনা পানিতে নেমে জাল টানি। নোনা পানিতে থাকতে থাকতে শরীরে চর্মরোগ দেখা দিয়েছে।’
মালেকের ভাষ্য, চরে খাবার পানির সংকট রয়েছে। নলকূপ নষ্ট থাকলে যেখানে পানি পাওয়া যায়, সেখান থেকেই পানি পান করতে হয়।
আরেক বাসিন্দা মো. আলাউদ্দিন বলেন, ‘পানির চেয়েও বড় সমস্যা চিকিৎসার। অসুস্থ হলে বুঝতে পারি না কী রোগ হয়েছে। গুরুতর অসুস্থ কাউকে নদীর ওপারে হাসপাতালে নেওয়াও সহজ নয়।’
পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি
চরাঞ্চলে অনিরাপদ পানি ব্যবহারের কারণে ডায়রিয়া, পেটের বিভিন্ন রোগ ও চর্মরোগের ঝুঁকি বাড়ছে বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন। স্থানীয়ভাবে চিকিৎসার সুযোগ সীমিত হওয়ায় অনেক বাসিন্দা প্রথমে কবিরাজ বা হাতুড়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন।
ভোলার চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সাইদুর রহমান শামিম বলেন, চরাঞ্চল থেকে অনেক রোগী তাঁর কাছে আসেন, যাঁদের মধ্যে পানিবাহিত রোগের পর ত্বকের বিভিন্ন জটিলতা দেখা গেছে। চিকিৎসকের কাছে আসার আগে অনেকেই স্থানীয় কবিরাজের কাছ থেকে চিকিৎসা নেন। রোগ নির্ণয়ের যথাযথ দক্ষতা না থাকায় ভুল চিকিৎসায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
তিনি বলেন, নিরাপদ পানি পান ও ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই। অনিরাপদ পানি সরাসরি পান না করে যথাযথভাবে বিশুদ্ধ করে পান করতে হবে। চর্মরোগ বা অন্য কোনো অসুস্থতা দেখা দিলে দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নেওয়া উচিত।
চরাঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়
ভোলার সিভিল সার্জন মনিরুল ইসলাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে চরাঞ্চলে সুপেয় পানির উৎস কমে যাচ্ছে। জনসংখ্যার তুলনায় নিরাপদ পানির উৎস, বিশেষ করে নলকূপের সংখ্যা কম। ফলে অনেক মানুষ নদী-খাল ও অন্যান্য উৎসের পানি ব্যবহার করছেন।
তিনি বলেন, এতে ডায়রিয়া, পেটের পীড়াসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। নিরাপদ পানি ব্যবহার ও বিশুদ্ধ পানি পান বিষয়ে চরবাসীকে সচেতন করার পাশাপাশি চরাঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কাজ চলছে। তবে বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলে এখনো পুরোপুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
গভীর নলকূপ স্থাপনের উদ্যোগ
ভোলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম মাহামুদুর রহমান বলেন, চরাঞ্চলের সুপেয় পানির সংকট কমাতে প্রতিবছর গভীর নলকূপ স্থাপন করা হচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একটি প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি ইউনিয়নে ১২টি করে গভীর নলকূপ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে চরাঞ্চলের নিরাপদ পানির সংকট অনেকটা কমবে।
তবে চরবাসীর বক্তব্য, নতুন নলকূপ স্থাপনের পাশাপাশি পুরোনো নলকূপগুলো দ্রুত মেরামত ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়া চরাঞ্চলে বিকল্প নিরাপদ পানির উৎস তৈরি করা জরুরি।
নদী ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভোলার চরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা এমনিতেই নানা ঝুঁকিতে। এর সঙ্গে নিরাপদ পানির সংকট যুক্ত হওয়ায় নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়ছে। তাই চরাঞ্চলে শুধু নতুন পানির উৎস তৈরি নয়, বিদ্যমান উৎসগুলো সচল রাখা এবং দুর্গম মানুষের জন্য নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাও জরুরি।
