বর্ষার হিসাব

॥ শিকদার বাসির ॥

চল্লিশ বছর ধরে নদীর ধারে বাস করছেন কালাচাঁদ মাঝি। তিনি প্রায়ই বলতেন, নদীরও নাকি নিজস্ব একটা হিসাব আছে। কে তাকে যত্ন করেছে, কে অবহেলা করেছে-সবই সে মনে রাখে। আষাঢ়ের প্রথম দিনে নদী ফুলে ওঠে পুরনো হিসাব মেটাতে, আর শ্রাবণের শেষে যখন জল নামতে শুরু করে, তখন বোঝা যায় কে কতটা পেল আর কে কতটা দিল। সে বছরের আষাঢ়টা যেন অন্য রকম ছিল। নদী বাড়ল না যেমন বাড়ার কথা। কালাচাঁদের নাতি বরুণ, যে শহরে পড়ে আর ছুটিতে বাড়ি এসেছে, সে দাদুর কথা শুনে হাসত। সেদিন বরুণ নৌকার রশি খুলতে খুলতে বলল, দাদু, তুমি প্রতিদিন একই জায়গায় নৌকা নিয়ে যাও কেন?
কালাচাঁদ মাঝি মুচকি হেসে বললেন, সব জায়গা চোখে দেখা যায় না রে। নদীরও কিছু কথা আছে, সেগুলো শুনতে হলে বারবার আসতে হয়। কালাচাঁদ রোজ ভোরে নৌকা নিয়ে বের হতেন। কিন্তু হঠাৎ একদিন তিনি লক্ষ্য করলেন, পানির রঙ বদলে গেছে-ঘোলা নয়, বরং কেমন স্বচ্ছ, যেন নদীর তলা দেখা যাচ্ছে। কালাচাঁদের মনে হলো, নদীর তলায় যেন পুরোনো দিনের কিছু ছবি ভেসে উঠছে। পুরনো বাড়িঘর, মাঠ, এমনকি মানুষের ছায়া হাঁটাচলা করছে।
একদিন দুপুরে প্রবল বৃষ্টির মধ্যে নৌকা বেয়ে যখন কালাচাঁদ মাঝনদীতে, তখন বরুণ জিজ্ঞেস করল, দাদু, যদি নদী সত্যিই হিসাব রাখে, তাহলে তোমার নামে কী লিখে রেখেছে? কালাচাঁদ বৈঠা থামিয়ে নদীর দিকে তাকালেন। সেটাই তো জানার বাকি। হয়তো এবারই উত্তর দেবে। একটু সামনে গিয়ে কালাচাঁদ মাঝি পানির নিচে তাকাতেই দেখলেন তার নিজের ছোটবেলার বাড়ি, যেটা পঁয়তাল্লিশ বছর আগে নদীভাঙনে তলিয়ে গিয়েছিল। বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে আছেন তার মা, হাত নাড়ছেন, ডাকছেন।
কালাচাঁদ নৌকা থামিয়ে স্থির হয়ে গেলেন। বুকটা ধড়ফড় করছিল। মুহূর্তের জন্য তাঁর মনে হলো, মা যেন সত্যিই তাঁকে ডাকছেন। পা দুটো যেন নৌকা থেকে জলে নেমে, মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য আকুল হয়ে উঠল। ঠিক তখনই বরুণ তাঁর কাঁধে হাত রেখে বলল দাদু! ফিরে আসো! সেই ডাকে কালাচাঁদের ঘোর কাটল। তিনি নৌকা ঘুরিয়ে তীরের দিকে বাইতে লাগলেন, আর পানির তলার দৃশ্যটা আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল, যেন কেউ আয়না থেকে কুয়াশা মুছে দিল।
বাড়ি ফিরে কালাচাঁদ বরুণকে বললেন, নদী আজ আমাকে ডেকেছিল, সবচেয়ে পুরনো হিসাবটা মেটাতে। আমার মা চলে যাওয়ার পর আমি কোনোদিন ঠিকমতো কাঁদিনি। সংসার চালাতে হবে বলে বুকের ভেতর কান্নাটা চেপে রেখেছিলাম। আজ মনে হলো, নদী যেন সেটাই ফিরিয়ে দিতে চাইছিল। বরুণ কিছু বলল না। দাদুর চোখের জলই যেন তার সব প্রশ্নের উত্তর হয়ে রইল।
শ্রাবণের শেষে যখন বৃষ্টি ধীরে ধীরে কমে এল, নদীর পানি নামতে শুরু করল স্বাভাবিক নিয়মে। কালাচাঁদ সেদিন প্রথমবার নাতির সামনে কাঁদলেন, চল্লিশ বছরের চাপা কান্না। বরুণ চুপচাপ তাঁর পাশে বসে ছিল।
সেই রাতে নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে কালাচাঁদের মনে হলো, নদীর শব্দটাও যেন আজ অনেক শান্ত। আগের মতো ভারী, রহস্যময় গর্জন নেই। কালাচাঁদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে আস্তে করে বললেন, মানুষের কিছু কথা সময়মতো বলে ফেলা ভালো। না হলে সেগুলো বুকেই জমে থাকে। বরুণ কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু নদীর দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো, সব হিসাব সংখ্যায় মাপা যায় না। কিছু হিসাব শুধু নদী আর মানুষের নীরবতাই জানে।
গল্পকার, ছড়াকার, গীতিকবি ও সুরকার
গ্রাম+থানা: বাঞ্ছারামপুর
জেলা: ব্রাহ্মণবাড়িয়া
মেইল: shikderb95@gmail.com
হোয়াটসঅ্যাপ: ০০৯৬৬-০৫৭০২২৬৭৪৬
