৭ ট্রিপেই অচল বিআইডব্লিউটিসির ফেরি ‘সন্ধ্যামালতী’

আড়াই বছর মেরামতের পর যাত্রীসেবায় ফিরেছিল বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) ফেরি সন্ধ্যামালতী। কিন্তু বরিশাল-ভোলা নৌপথে মাত্র সাতটি ট্রিপ সম্পন্ন করার পরই ফেরিটি আবার অচল হয়ে পড়ে। মেরামতে ১০ লাখ টাকার বেশি ব্যয়ের হিসাব দেখানো হলেও এখন আবার নতুন করে অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে নতুন যন্ত্রাংশের পরিবর্তে পুরোনো ও নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে ফেরিটি লাহারহাট ফেরিঘাটে অচল অবস্থায় পড়ে রয়েছে। শুধু তাই নয়, এর বিভিন্ন যন্ত্রাংশ খুলে অন্য ফেরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে সন্ধ্যামালতীকে পুনরায় যাত্রীসেবায় ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
বিআইডব্লিউটিসির দায়িত্বশীল একাধিক সূত্রের দাবি, নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ডে দীর্ঘদিন ধরে ফেরিটি মেরামতের কাজ চলে। ২০২৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি বছরের ২১ মে পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জের ইস্পাহানি ২ নম্বর ডকইয়ার্ডে রাখা হয় সন্ধ্যামালতীকে। সেখানে হাইড্রোলিক পাম্প, মোটর, মূল ইঞ্জিন, সুকানের থ্রাস্টার, টিপ কন্ট্রোল সিস্টেম, ইঞ্জিন ওভারহল, টিলার সুইচ, গিয়ার সুইচসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ মেরামতের কাজ করা হয়।
মেরামত শেষে গত ২৬ মে ফেরিটি বরিশালের লাহারহাট ফেরিঘাটে পাঠানো হয়। ঈদুল আজহার আগে যাত্রীসেবায় যুক্ত হলেও মাত্র সাতটি ট্রিপ পরিচালনার পরই এটি আবার বিকল হয়ে পড়ে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সন্ধ্যামালতীর মতো বিভিন্ন ফেরি মেরামতের ক্ষেত্রে নতুন যন্ত্রাংশের পরিবর্তে পুরোনো ও নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে বিপুল অর্থ আত্মসাতের একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। অভিযোগের তীর নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ডের একজন কর্মকর্তা এবং বরিশাল কার্যালয়ের প্রকৌশল শাখার মেকানিক্যাল টেকনিশিয়ান সিহাব উদ্দিনের দিকে।
ফেরিটির সেকেন্ড মাস্টার রিয়াজ হোসেন বলেন, মেরামত শেষে ফেরি বুঝে নেওয়ার সময়ই তারা ডকইয়ার্ড কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলেন যে চাহিদা অনুযায়ী মানসম্মত যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা হয়নি। কিন্তু সেই আপত্তি উপেক্ষা করে ফেরিটি বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার না করে দায়িত্ব একে অপরের ওপর চাপিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ডে দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী প্রকৌশলী মো. এনামুল বলেন, ফেরির যন্ত্রপাতি ক্রয় ও মেরামতের বিষয়গুলো দেখভাল করেছেন মেকানিক্যাল টেকনিশিয়ান সিহাব উদ্দিন। যন্ত্রাংশের মান সম্পর্কে তিনিই ভালো বলতে পারবেন।
অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ ডকের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ হাই আল হাদী বলেন, ডকে প্রয়োজনীয় মেরামত শেষে ট্রায়াল সম্পন্ন করে ফেরিটি বরিশালে পাঠানো হয়েছিল। লাহারহাটে কয়েকটি ট্রিপও দিয়েছে। এরপর কেন ফেরিটি আবার অচল হয়ে পড়েছে, সে বিষয়ে বরিশাল কার্যালয়ই ভালো বলতে পারবে।
তিনি আরও দাবি করেন, প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সংগ্রহে জটিলতার কারণে মেরামতকাজ দীর্ঘায়িত হয়েছে এবং যেসব যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলো বিআইডব্লিউটিসির প্রধান কার্যালয়ের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়েছিল।
এদিকে বিআইডব্লিউটিসির বরিশাল প্রকৌশল শাখার তথ্য অনুযায়ী, ফেরিটি পুনরায় বিকল হওয়ার প্রধান কারণ র্যামের হাইড্রোলিক পাম্প ও সুকানের হাইড্রোলিক পাম্প অকার্যকর হয়ে পড়া। ফলে র্যাম ওঠানামা করছে না এবং সুকানও নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।
তবে বিস্ময়ের বিষয় হলো, অচল ফেরিটি দ্রুত সচল করার উদ্যোগ না নিয়ে এর নোঙরের কন্ট্রোলার ও হাইড্রোলিক মোটরের পাম্প খুলে অন্য ফেরিতে ব্যবহার করা হয়েছে। বর্তমানে সন্ধ্যামালতীর ১০ থেকে ১২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কার্যত কোনো কাজ ছাড়াই অবস্থান করছেন।
অভিযোগের বিষয়ে বিআইডব্লিউটিসির বরিশাল কার্যালয়ের মেকানিক্যাল টেকনিশিয়ান সিহাব উদ্দিন বলেন, ফেরিটি বর্তমানে লাহারহাটে মেরামতের জন্য রাখা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। তবে আড়াই বছর মেরামতের পর মাত্র সাতটি ট্রিপ দিয়েই ফেরিটি কেন অচল হয়ে পড়ল—এ প্রশ্নের জবাব তিনি দেননি।
এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিসির বরিশাল কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদ হাসানের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
বরিশাল-ভোলা নৌপথ দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ মাধ্যম। তাই বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও একটি ফেরির এত দ্রুত অচল হয়ে পড়া, মেরামতকাজের মান নিয়ে প্রশ্ন এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
