সর্বশেষঃ

ভোলায় ব্রিজ ভেঙে বিচ্ছিন্ন ৫ গ্রামের যোগাযোগ, দুর্ভোগে ৩০ হাজার মানুষ

ভোলার লালমোহন উপজেলায় বালুভর্তি ট্রাক নিয়ে একটি আয়রন ব্রিজ ভেঙে খালে পড়ার ঘটনায় যোগাযোগ মাধ্যমটি বিচ্ছিন্ন হয়ে চরম দুর্ভোগে রয়েছেন অন্তত ৫টি গ্রামের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন স্কুলগামী কোমলমতি শিক্ষার্থীরা, অসুস্থ রোগী, কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। এতে কার্যত ভেঙে পড়েছে সেখানকার বাসিন্দাদের জীবনমান।

এছাড়া ব্রিজটি ভেঙে পড়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় এবং ট্রাকচালক নিহত ও হেলপার পঙ্গুত্ব বরণের ঘটনায় স্থানীয় এলজিইডির গাফিলতিকেই দুষছেন ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা।

সরেজমিনে জানা যায়, উপজেলার রমাগঞ্জ ইউনিয়নের ডা. আজাহার উদ্দিন সড়কের পূর্বপাশে চর উমেদ গ্রামে প্রায় দুই যুগ আগে বেতুয়া খালের ওপর ৪৫ মিটার দৈর্ঘ্যের ও ৩ মিটার প্রস্থের এ আয়রন ব্রিজটি নির্মাণ করা হয়। এতে উপজেলা শহরের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত হয় ধলীগৌরনগর ইউনিয়নের চরমোল্লাজি, চতলা, পাটোয়ারী বাজার ও কাজীরবাজারসহ আশপাশের দুর্গম গ্রামের অন্তত ৩০ হাজার মানুষ। কিন্তু গত ২৩ জুন দুপুরে একটি বালুভর্তি ট্রাক ব্রিজটি পেরিয়ে চরমোল্লাজি গ্রামের দিকে যাওয়ার সময় হঠাৎ বিকট শব্দে ব্রিজটি ভেঙে খালে পড়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হন পার্শ্ববর্তী এলাকার বাসিন্দা ট্রাকচালক নাঈম এবং গুরুতর আহত হন হেলপার আলামিন। আর এতেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে কয়েক গ্রামের মানুষের। বর্তমানে সেখানকার বাসিন্দাদের ভরসা একটি ডিঙি নৌকা, সেখানেও রয়েছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত ৫ বছর ধরেই ব্রিজটি চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল। কিন্তু ব্রিজটি ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা দিয়ে কোনো সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড টানানো হয়নি এবং বাসিন্দাদের সচেতনও করেনি উপজেলা এলজিইডি কর্তৃপক্ষ। এলজিইডির গাফিলতিতেই ঘটেছে এতো বড় দুর্ঘটনা।

রমাগঞ্জের বাসিন্দা মো. কবির ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এ ব্রিজটি ছিল বেতুয়া খালের দুই পাড়ের মানুষের মিলনস্থল। সেটি এখন বিচ্ছিন্ন। এ ব্রিজটি দিয়ে দুই পাড়ের মানুষ সহজে চলাচল করতো। ব্রিজটি ভেঙে যাওয়ার কারণে এক কিলোমিটারের পথে যেতে ঘুরতে হয় ৫ কিলোমিটার। চরমোল্লাজি গ্রামসহ নদীর ওই পাড়ে অধিকাংশই হলো কাঁচা সড়ক। একজন মানুষ মুমূর্ষু রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য সেখানে কোনো অ্যাম্বুলেন্সও যেতে পারবে না। আসলে আমাদের ভোগান্তির শেষ নেই।

ব্রিজটি ভেঙে যাওয়ায় বর্তমানে আমাদের চলাফেরা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষিখাত নিয়ে চরম দুর্ভোগে রয়েছেন বলে জানান আরও দুই স্থানীয় বাসিন্দা মো. মফিজ ও নুরুল ইসলাম। তারা বলেন, ব্রিজটা ছিল আমাদের জন্য আশীর্বাদ। বালুর ট্রাক নিয়ে ব্রিজটি ভেঙে গিয়ে ট্রাকের চালক নিহত হন, হেলপার পঙ্গুত্ব বরণ করেন। এছাড়া ব্রিজটি ভাঙা অবস্থায় থাকার কারণে খালের ওই পাড়ে (ধলীগৌরনগর ইউনিয়নের চর মোল্লাজি গ্রাম) ব্যবসার মালামাল ও কৃষিকাজের জন্য পাওয়ার টিলার নিতে পারছি না। এখন জনপ্রতি ৫ টাকা করে ছোট্ট একটি ডিঙি নৌকা দিয়ে কোনোমতে পারাপার করছি। যখন জরুরি মুহূর্তে নৌকাও পাব না তখন কী হবে? এছাড়া দৈনিক কয়েকবার নৌকা দিয়ে আসা যাওয়া করতে হয়। এতে আমাদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হচ্ছে।

পূর্ব চরমোল্লাজি স্কুলের শিক্ষার্থী মো. ফাহিম ও আরাফাত বলেন, আগে আমরা নিরাপদে ব্রিজের ওপর দিয়ে পায়ে হেঁটে স্কুলে যেতাম। বর্তমানে ব্রিজটি ভেঙে যাওয়ার কারণে নৌকা দিয়ে খাল পাড় হতে হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. কবির ও আরাফাত হোসেন বলেন, ব্রিজটি গত ৫ বছর ধরে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল। কিন্তু ব্রিজটি যে ঝুঁকিপূর্ণ সেরকম কোনো সাইনবোর্ড এলজিইডি এখানে টানায়নি এবং ভারী যানবাহন চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞাও দেওয়া হয়নি। সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড টানিয়ে দিলে এতো বড় দুর্ঘটনা ঘটতো না।

তারা অভিযোগ করে বলেন, লালমোহন উপজেলা এলজিইডির গাফিলতিতে ঘটেছে প্রাণহানি ও সহজ যোগাযোগের মাধ্যমটি বিচ্ছিন্ন হয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন প্রায় অর্ধলাখ মানুষ। ব্রিজটি দিয়ে দৈনিক অন্তত ৫ হাজারের বেশি মানুষ চলাচল করতেন। ভেঙে যাওয়ার আগে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকাকালীন কেউ এসেও দেখেননি কোন অবস্থায় রয়েছে ব্রিজটি।

ব্রিজটি ভারী ট্রাক চলাচলের উপযোগী ছিল না বলে শিকার করলেন লালমোহন উপজেলা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তানজিলুর রহমান। তিনি বলেন, দুর্ঘটনাটির কারণ হিসেবে ধারণা করা হচ্ছে আয়রন ব্রিজের পোস্টগুলোর পানির নিচের অংশ দুর্বল হয়ে যাওয়ায় ট্রাকের ঝাঁকুনি নিতে পারেনি। ব্রিজ সংস্কারের জন্য ইতোমধ্যে অনুর্ধ্ব ১০০ মিটার ব্রিজ নির্মাণ প্রকল্পের ডিপিপিই হচ্ছে এবং তথ্য পাঠিয়ে দিয়েছি। দ্রুত ব্রিজটি সংস্কার করে বাসিন্দাদের চলাচলের উপযোগী করার জন্য কাজ করছি।

তিনি আরও বলেন, আমাদের যতগুলো ঝুঁকিপূর্ণ ব্রিজ রয়েছে সবগুলোতেই সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড লাগিয়ে ছবি তুলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে পাঠিয়েছি। সাইনবোর্ড লাগানোর পর সেটি সংরক্ষণের দায়িত্ব ছিল সবার।

এদিকে উপজেলাটি মোট ১১টি ঝুঁকিপূর্ণ আয়রন ব্রিজ রয়েছে। দুর্ঘটনা এড়াতে অতি দ্রুত সবগুলো ঝুঁকিপূর্ণ ব্রিজ অপসারণ করে নতুন ব্রিজ নির্মাণের দাবি স্থানীয়দের।

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।