কোরবানির হাটকে ঘিরে ভোলার নারী উদ্যোক্তাদের অপেক্ষা

স্টাফ রিপোর্টার ॥
কোরবানির ঈদ যত ঘনিয়ে আসে, দেশের পশুরহাটগুলো ততই জমে ওঠে। গরুর হাঁকডাক, ক্রেতা-বিক্রেতার দরকষাকষি আর উৎসবমুখর ব্যস্ততায় সরগরম হয়ে ওঠে জনপদ। কিন্তু এই মৌসুমের অর্থনীতির পেছনে থাকে আরও অনেক নীরব গল্প-বছরের পর বছর ধরে লালন করা স্বপ্ন, সংসারের হিসাব-নিকাশ আর একটুখানি স্বস্তির অপেক্ষা।
ভোলার প্রত্যন্ত চরাঞ্চলের বহু নারীর কাছে কোরবানির মৌসূম কেবল পশু বিক্রির সময় নয়; এটি ভবিষ্যৎ গড়ার একটি সুযোগ। কেউ সন্তানের পড়াশোনার খরচ জোগাতে চান, কেউ ঋণ শোধের স্বপ্ন দেখেন, আবার কেউ ভাবেন নতুন করে ছোট বাছুর কিনে জীবনযুদ্ধের চাকা সচল রাখার কথা।
ভোলা সদর উপজেলার ভেলুমিয়া ইউনিয়নের চর চন্দ্রপ্রশাদ এলাকার অনেক নারী সারা বছর ধরে গরু-ছাগল লালন-পালন করেন কোরবানির হাটে ভালো দামে বিক্রির আশায়। কেউ এক বছর, কেউবা দুই বছর ধরে যত্নে বড় করেন গবাদিপশু। পরিবারের পুরুষ সদস্যদের পাশাপাশি তারাও হয়ে উঠেছেন গ্রামীণ অর্থনীতির নীরব শক্তি।
ভেলুমিয়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ফরাজী বাড়ির গৃহিণী মিনারা বেগম (৪০) তেমনই একজন সংগ্রামী নারী উদ্যোক্তা। স্বামী মন্নান ফরাজী অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালান। দুই ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে ছোট্ট সংসার, সবাই শিক্ষার্থী। সীমিত আয়ের এই পরিবারে কিছুটা স্বস্তি এনে দেয় গবাদিপশু পালন।
ভোরের আলো ফোটার আগেই দিনের কাজ শুরু হয় মিনারার। কাঁচা ঘাস কাটা, গরুকে গোসল করানো, খাবার তৈরি—সবকিছুই সামলান প্রায় একাই। তার ছোট্ট বাড়িতে এখন তিনটি গরু, একটি ছাগল ও পাঁচটি দেশি মুরগি আছে। বছরের পর বছর ধরে যত্নে বড় করা কালো গরুটি এবার কোরবানির হাটে তোলার প্রস্তুতি নিয়েছেন তিনি। সম্ভাব্য বাজার মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা।
মিনারা বেগম বলেন, সারা বছর অনেক কষ্ট করে গরু লালন করি। ভালো দামে বিক্রি করতে পারলে সংসারে একটু স্বস্তি আসবে। ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার খরচ দেব, কিছু টাকা জমাবো, আবার ছোট গরু কিনে পালন শুরু করবো।
একই ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মোল্লা বাড়ির গৃহিণী গোলেনুর বেগম (৩৫)-এর গল্পও ভিন্ন নয়। কৃষিশ্রমিক স্বামী রহিম গাজীর আয়ে চার সন্তানের সংসার চলে কষ্টে। তিন ছেলে ও এক মেয়েকে মানুষ করার সংগ্রামে তিনি বেছে নিয়েছেন গবাদিপশু পালনকে।
তার গোয়ালে রয়েছে নেপালি জাতের গরুসহ চারটি গরু। কোরবানির বাজারকে সামনে রেখে বছরের বড় একটি সময় চলে গরুর পরিচর্যায়। খাদ্য, ওষুধ ও পরিচ্ছন্নতার দিকে বিশেষ নজর রাখেন তিনি, যেন ঈদের হাটে ভালো দাম পাওয়া যায়। এবছর প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা মূল্যের একটি নেপালি জাতের গরু বিক্রির আশা করছেন গোলেনুর।
তার ভাষায়, এই গরুগুলোই আমাদের ভরসা। ভালো দামে বিক্রি করতে পারলে সংসারের দেনা শোধ হবে, ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালাতে পারবো। আবার নতুন বাছুর কিনে বড় করার ইচ্ছা আছে। শুধু ভেলুমিয়া নয়, ভোলার বিভিন্ন ইউনিয়নের বহু নারী এখন ক্ষুদ্র পরিসরে পশুপালনের মাধ্যমে পরিবারের অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন।
চরফ্যাশন উপজেলার এওয়াজপুর ইউনিয়নের সাহিনা বেগম গৃহস্থালির কাজের পাশাপাশি একটি দুধাল গরু ও একটি ষাঁড় পালন করছেন। তিন সন্তানকে পড়াশোনা করানোর দায়িত্বের বড় অংশই এখন নির্ভর করে এই অতিরিক্ত আয়ের ওপর। একই এলাকার হুমায়রা বেগমের জীবনও সংগ্রামের। স্বামী মো. রশিদের সীমিত আয়ের সংসারে তিন ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে চলছে জীবনযুদ্ধ। তার খামারে রয়েছে প্রায় ৫০ হাজার টাকা মূল্যের একটি গরু, ১৩টি ছাগল, সাতটি মুরগি ও দুটি হাঁস। কোরবানির মৌসুমে একটি গরু ও দুটি ছাগল বিক্রির মধ্যেই দেখছেন বাড়তি আয়ের সম্ভাবনা।
হাজারিগঞ্জ ইউনিয়নের হোসনে আরা বেগমও পশুপালনের মাধ্যমে বদলে দেওয়ার চেষ্টা করছেন সংসারের বাস্তবতা। পাঁচটি গরুর মধ্যে দুটি ইতোমধ্যে বিক্রি করেছেন তিনি। পাশাপাশি হাঁস-মুরগি পালনও করছেন। তার বিশ্বাস, ধৈর্য আর নিয়মিত পরিচর্যা একদিন পরিবারের আর্থিক অনিশ্চয়তা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করবে। একইভাবে স্বনির্ভরতার প্রতীক হয়ে উঠেছেন সাহিন খাতুন। ছোট পরিসরের পারিবারিক খামারে বর্তমানে রয়েছে আটটি গরু। চলতি মৌসুমে একটি গরু বিক্রি করে প্রায় ৭৪ হাজার টাকা পেয়েছেন। তার মতে, পশুপালনই এখন পরিবারের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আয়ের পথ।
কৃষক পরিবার থেকে উঠে আসা নাসিমা বেগমও গবাদিপশু পালনকে বেছে নিয়েছেন বাড়তি আয়ের উৎস হিসেবে। আটটি গরুর মধ্যে চারটি দুধাল গরু এবং সাতটি ছোট বাছুর রয়েছে তার খামারে। ইতোমধ্যে দুটি গরু বিক্রি করেছেন। সন্তানের শিক্ষাব্যয় মেটাতেও সহায়ক হচ্ছে এই আয়।
অন্যদিকে ভোলা সদর উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের সাহামাদার এলাকার মানসুরা বেগম (৪৮) ছাগল পালন করে সংসারের অভাব ঘোচানোর চেষ্টা করছেন। চলতি বছর দুটি ছাগল বিক্রি করে প্রায় ৩০ হাজার টাকা আয়ের আশা করছেন তিনি। ইলিশা ইউনিয়নের গোল নাহার (৩৯)-ও ছয়টি ছাগল পালন করছেন; সেখান থেকে দুটি ছাগল বিক্রির পরিকল্পনা রয়েছে।
ভোলার অন্যতম উন্নয়ন সংস্থা জিজেইউএস এর নির্বাহি পরিচালক মোঃ জাকির হোসেন মহিন বলেন, চরাঞ্চলের অনেক নারী এখন ঘরের কাজের পাশাপাশি গবাদিপশু পালন করে পরিবারের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। একসময় যে পরিবারগুলো পুরোপুরি পুরুষের আয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল, সেখানে নারীরাও হয়ে উঠছেন আয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম খান বলেন, নারীভিত্তিক ক্ষুদ্র পশুপালন গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করছে। অল্প পুঁজি দিয়ে শুরু করা এই উদ্যোগ অনেক পরিবারের জন্য বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করছে। বিশেষ করে কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে পশুর চাহিদা বাড়ায় নারী উদ্যোক্তারা লাভবান হওয়ার সুযোগ পান।
ভোলার প্রত্যন্ত চরের এই নারীরা বড় কোনো ব্যবসায়ী নন। তাদের পুঁজি সীমিত, স্বপ্নও হয়তো ছোট। কিন্তু সেই ছোট স্বপ্নের ভেতরই লুকিয়ে আছে পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার দৃঢ় প্রত্যয়। কোরবানির হাটে গরু কিংবা ছাগলটি ভালো দামে বিক্রি হলে হয়তো সন্তানের স্কুলের বকেয়া ফি পরিশোধ হবে, ঘরে আসবে স্বস্তি, কিংবা গোয়ালে উঠবে নতুন একটি বাছুর। তাই ঈদ যত কাছে আসে, ততই বাড়তে থাকে তাদের প্রতীক্ষা-একটি ভালো বিক্রির, একটু স্বস্তির, আর নতুন করে স্বপ্ন বুনে বেঁচে থাকার।

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।