সর্বশেষঃ

জীবনের ডায়েরী থেকে গল্প সমগ্র : পর্ব-০৮

[ ড. টি. এন. রশীদ ]

(গত পর্বের পর) : তোমাদের যার যা আছে তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব। তবু এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশা আল্লাহ। এ বারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম। এ বারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা। তাঁর এই ভাষন যেন কোন ভাষন নয় বরং দেশের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ের কোন স্বপ্ন পূরণের ইঙ্গিত। জাতি যেন চরম খরায় এক ফোঁটা পানির ছোঁয়া পেল। সকলেই তাদের প্রিয় নেতার ভাষণকে জীবনের লক্ষ্য হিসেবে নিল। সংকল্প করল দেশকে শত্রুদের হাত থেকে রক্ষা করে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার।
এ সময় চারিদিকে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের প্রভাব, প্রতিদিন মিছিল মিটিং চলতে থাকে। স্বাধীনতাকামীরা বিভিন্ন থানা অস্ত্রাগার দোকান পাট থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করতে লাগল। আওয়ামী লীগের একজন সক্রিয় সদস্যা হিসেবে আমিও নিয়মিত মিছিল মিটিং চালাতে লাগলাম। এরই মাঝে বঙ্গবন্ধুর কাছে আমার ডাক পড়ল, আমি তাঁর বাসায় গেলাম। তিনি আমাকে বললেন, শুনলাম আপনি নাকি ক্যাপ্টেন? বললাম হ্যাঁ, কিভাবে ক্যাপ্টেন হলাম জানতে চাইলেন আমি বিস্তারিত বললাম।
মেজর ডেভিডসন আমাকে ট্রেনিং দিয়েছেন। তিনি বললেন, আপনি একজন ক্যাপ্টেন? তাহলে বসে আছেন কেন? দেখছেন না দেশের দুর্দিন, মেয়েদের রাইফেল ট্রেনিং দিন। যেন মেয়েরা শুধু গুলি খেয়ে না মরে, দুই একটা মারতে পারে। পরে চলে আসার সময় তিনি আমার পরিচয় জিজ্ঞাসা করলেন। যখন জানতে পারলেন ‘খান বাহাদুর নূরুজ্জামান’ আমার বাবা। তিনি তখন আরো বেশি প্রফুল্ল হয়ে বললেন, আপনি খান বাহাদুর সাহেবের মেয়ে? আপনি এমন একজনের সন্তান, হ্যাঁ, আপনি পারবেন। আপনাকেই দায়িত্ব দিলাম। তিনি আমাকে সাজেদা চৌধুরীর বাড়ীতে মেয়েদের ট্রেনিং দেওয়ার কথা বলেন। আমি তখন বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে “মরিগ হাউসে” এসে দেখলাম। অনেক মেয়ে ষোল থেকে বাইশ বছরের। সবাই দেশকে ভালবাসে, দেশের জন্য যুদ্ধ করতে চায়। কিন্তু রাইফেল মাত্র ৩০টি। সবাই বলে আমি আগে শিখব। আমাকে রাইফেল দেন। ভীষণ মুশকিলে পড়লাম। সবাই হুলুস্থুল করছে। আমি মেয়েদের বললাম, শৃংখলাই জীবন।
তোমাদের দেখে আমার একটি গল্প মনে পড়েছে। “একদিন এক ব্রাহ্মণ খালি গায়ে গায়ের পথে চলছিল। হঠাৎ ভূতের সাথে দেখা। ভূত বলল, ঠাকুর কোথায় যাচ্ছ? ঠাকুর বলল, যা বিরক্ত করিস না। আমার কাজ আছে। ভূত বল্ল, কি কাজ আমাকে বলতে হবে? ঠাকুর বলল, একটা মানুষের শ্রাদ্ধ করতে যাচ্ছি। ভূত বলল, শ্রাদ্ধ কি? তখন ঠাকুর বলল, মানুষ মরে গেলে আমরা শ্রাদ্ধ করাই। তখন ভূত বলল, আমিও আমার বাবার শ্রাদ্ধ করাইব। ঠাকুর বলল, বেশ, আয়োজন কর, করে আমাকে ডাকিস। সপ্তাহ খানেক পর ভূত আসল। তারপর বলল, চল ঠাকুর সব আয়োজন শেষ। ঠাকুর গিয়ে দেখল হাজার হাজার ভূত মাঠে। সবাই তার বাবার শ্রাদ্ধ করতে চায়। তারা রীতিমত ঝগড়া শুরু করে দিল। ঠাকুর দেখে ভয় পেয়ে সেখান থেকে পালিয়ে গেল।
মেয়েরা গল্প শুনে খুব হাসল ও লজ্জা পেল। বলল, আপনি যে ভাবে ভাল হয় সেভাবেই করুন। আমি তখন ষোল থেকে বাইশ বছরের মেয়েদের আলাদা করে নিলাম। একটা একটা করে প্লাটুন ট্রেনিং দিয়েছি। ৩০ জনে একটা প্লাটুন। ট্রেনিং দেওয়া খুব পরিশ্রমের কাজ। আমার মাথার ঘাম পায়ে পড়েছে। একদিন আইভী রহমান (প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান সাহেবের স্ত্রী) আমাকে বললেন, আপনি এত কষ্ট করে ট্রেনিং দিচ্ছেন আপনার লাভ কি? সত্যিই তো আমার কী লাভ? আমাকে কেউ চা-ও খাওয়ায় না। এক গ্লাস পানি-ও দেয় না। ড্রইং রুমেও ডেকে নিয়ে বসায় না। কিন্তু আমি বললাম, লাভ তো কিছুই নেই। কিন্তু আমি দেশকে ভালবাসি। তাই বঙ্গবন্ধুর আদেশে আমি এ সব মেয়েদের ট্রেনিং দিয়ে আমার শিক্ষা কাজে লাগাচ্ছি। আমাদের দেশের জন্যই আমার এই কষ্ট। অন্য কোন কারণ নেই।
ইতিমধ্যে ২৩শে মার্চ অর্ডার পেলাম, ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ীতে বঙ্গবন্ধুকে গার্ড অব অনার দিতে হবে। বেছে বেছে দু’শ মেয়ে নিয়ে সেই বিশাল রাস্তা ধরে হাতে ত্রিশটি থ্রি নট থ্রি রাইফেল নিয়ে সামনে কমান্ড করে চললাম। মানিক মিয়া এভিনিউতে ভীড় থাকা সত্ত্বেও লোকজন সামনে আমাদের পথ ছেড়ে দিল। আমরা পৌঁছে বঙ্গবন্ধুর ছোট্ট লেনটাতে দাঁড়িয়ে রইলাম। একটু পরেই বঙ্গবন্ধু আসলেন, আমাদের শ্রদ্ধা ও ভালবাসার বঙ্গবন্ধু।

(চলবে——-)

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।