মধ্যরাত : পর্ব-২২৬

ড. তাইবুন নাহার রশীদ (কবিরত্ন),
(গত পর্বের পর) : অনেক রাত বেড়ে চলল, আমি বিছানায় গড়াতে গেলাম। রাত যেখন হয়েছে তখন বিছানায় পিঠ রাখতে হবে। সরাদিন কাজের মধ্যে থাকি, সময় কেটে যায়। ছাত্র পড়ানো, বই পড়া আবার ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে এসব নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা। এ করে জীবনটা চলছে, যার যে ক’দিন বেঁচে আছি চলবে। হেমন্ত ক’দিন পর্যন্ত আসে না। উমাকে বললাম, উমা হেমন্ত ছেলেটা আসে ? আমি বললাম, ওকে-ত ক’দিন দেখি না। ওকে দেখলে আমার খুব ছোট্ট ভাইয়েল মত মনে হয়। বড় আদর করে ভাল বাসতে ইচ্ছে করে। উমা বলল, দাদা ও আমাদের এখানে থাকে না কেন ? ও থাকলে আমাদের একাকীত্ব অনেকটা কমে যেত।
আমি ভার্সিটির পথে পা বাড়ালাম। উমা টেবিলে আমার জন্য খাওয়া-দাওয়ার বন্দবস্ত করে দিল। আমি খেয়ে দেয়ে ভার্সিটির পথে পা বাড়ালাম। সেদিন আবার আমার ইমপর্টেন্ট ক্লাশ ছিল। বাস স্টপেজে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম। বাসের স্টাইক চলছিল, দু-একটা বাস আসে-কি আসে না; ভাগ্যক্রমে একটা বাস এসে দাঁড়াল, উঠে পরলাম। বাসে যেতে যেতে অনেক কথা মনে হল, বাস স্টপেজে বাস থাকার সাথে নেমে পরলাম। অনেক খানি পথ হেটে হেটেই ভার্সিটিতে পৌছে গেলাম। দেখলাম প্রফেসাররা অনেকে এখনও এসে পৌছেনি।
আমি কমন রুমে বসে বসে ম্যাগাজিনের পাতা উল্টে যাচ্ছিলাম। দেখি রাহাত খান হন্ত দন্ত হয়ে আমার রুমে ঢুকে বসে পরল। বলল ভাই বউ-বাচ্চা সব এসে পরেছে, একটা ভালো এপার্টমেন্ট পচ্ছি না। আমি বললাম, বাচ্চা কয়টি ? বলল, ১ ছেলে। বললাম, চিন্তা কি; পেয়ে যাবেন। বললাম, বৌদিকে আমার ওখানে নিয়ে আসবেন। আমি বললাম, বাচ্চার নাম কি ? বলল খুশী। আমি বললাম, বাঃ বেশ-ত নাম খুসী। ও বলল, মা, আমার মা রেখেছে। রাহাত খান বলল, প্রশান্ত বাবু আপনি বাচ্চা-কাচ্চা খুব ভালবাসতেন, অথচ সংসার বাঁধলেন না, বিয়ে করলেন না। আমি বললাম, ওসব কথা আর তুলবেন না। এখন যেই দায়িত্ব ঘাড়ে পরেছে, সেটাই সামলে নিতে আমাকে হিম সিম খেতে হবে। রাহাত খান বলল, আপনার বন্ধুত টাকা-পয়সা রেখে গেছেন। আমি বললাম, তার টাকা-পয়সা আমি আজ পর্যন্ত ছুয়েও দেখিনি। আমার এখানে আছে, আমার যা জোটে আমিও খাই, উমাও তাই খায়। ও কাশী যেতে চায়, গয়া যেতে চায়, খরচ-পত্র করে যাবে। বা বাকী দিনগুলি সেখানে থেকে কাটিয়ে দিতে চায়, আমার আর কোন আপত্তি নেই। রাহাত খান আবার ম্যাগগিলের প্রফেসার। তারও ক্লাশ আছে, বুথা বাক্য ব্যয় না করে সে উঠে দাঁড়াল, আমিও ক্লাশে গেলাম।
ক্লাশ শেষে কমন রুমে ঢুকে সকলকে দেখে মনটা প্রফুল্লতায় ভরে গেল। আজ-কাল যেন একাকীত্ব খুব খারাপ লাগে। যেন অনেক লোক, অনেক লোকের সমাগম আমার পছন্দ। সব বন্ধুরা অনেক রকম গল্প করছিল, কেউ ছেলের গল্প, ভাই এর গল্প, স্ত্রীর গল্প, কেউ আবার শ্বশুর বাড়ীর গল্প জুড়ে দিল। বিজন বলল, প্রশান্ত দা চুপ করে কেন ? আপনি কিছু বলুন ? আমি বললাম-আমি ? কার গল্প করব ? স্ত্রী নেই, পুত্র নেই; বিজন বলল কেন ? ডোরাদি’র গল্প বলুন। আমি বললাম, সুশান্ত মরে যাওয়ার পর আমার সে রোমাঞ্চ আস্তে আস্তে মরে যাচ্ছে। এখন সুশান্ত যে কর্তব্য দিয়ে গেছে সে চিন্তা, যে আমি কতটুকু এই বিশাল দায়িত্ব সামলে উঠতে পারব। তার উপর নাতনীটা আবার প্রেগন্যান্ট। ওর শরীরটা ভালনা, তবু তার স্বামী এসে লস এঞ্জেল নিয়ে গেছে। ভাবছি বাচ্চা হবার আগে ওকে আবার আমার কাছে নিয়ে আসব। ঘর বাধিনি সত্য, কিন্তু ভগবান যে দুটো দায়িত্ব আমার ঘাঁড়ে চাঁপিয়েছেন, তোমরা আমাকে আশির্বাদ করো যেন এ কর্তব্য সমাধা করতে পারি। বিজন আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল, ও কি যেন খুজছিল, আমার মধ্যে যে জিনিস আছে বা যে জিনিস আমার মধ্যে নেই।
(চলবে——-)
