সর্বশেষঃ

জীবনের ডায়েরী থেকে গল্প সমগ্র : পর্ব-৩৯

ড. তাইবুন নাহার রশীদ (কবিরত্ন),

(গত সংখ্যার পর) : আরো শুনলাম, নন্দকুজার এক গরীব ব্রহ্মন ঘরে ‘নন্দা’ নামে একটি সুন্দরী মেয়ে ছিল। মেয়েটি ছোট বেলা থেকেই খুব ধর্মভীরু ছিল। সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠেই ছোট ফুলের ডালাটা নিয়ে যেত ফুল তুলতে। ছোট হাতে ছোট ছোট ফুল তুলে পুঁজার মন্দিরে দিয়ে আসত।
এমনি করে নন্দা দিন দিন বড় হতে লাগল। বাপের অগোচরে করত প্রতিমা পরিচর্যা। গরীব ব্রাহ্মণ ছিল সারা গায়ের পুরোহিত। পুরোহিত হিসেবে তার খুব সুনাম ছিল। তার শীষ্যের অন্ত ছিল না। শিষ্যেরা তার সেবা শুশ্রুষা ও পরিচর্যা করত। সেই গ্রামের একটি সম্ভ্রান্ত হিন্দু কায়স্থ পরিবার ছিল। তার একমাত্র ছেলে, নাম তার কুঞ্জ। কুঞ্জ ছিল নিখুঁত সুন্দর। সারা গ্রামে তার মত অত সুন্দর আর কেহ ছিল না। সে মধুর সুরে বাঁশি বাজাত। গাইত আরো সুন্দর। মাঝে মাঝে উদাস দুপুরে সে গাছের ছায়ায় বসে মোহন বাঁশি বাজাত। বাঁশির মোহন সুরে গ্রামের আকাশ বাতাস কেঁদে উঠত, আর কেঁদে উঠত সারা দায়ের বৌঝিদের মন।
নন্দা সেই উদাস দুপুরে পুঁজাঘরের সাজ সরঞ্জামাদি পরিস্কার করে ঘরে তুলে রাখত। বাপের আহ্নিকের ঘুয় পরিস্কার করে গুছিয়ে রাখত। বাপ মাঝে মাঝে বলত হ্যায়রে নন্দা, তুই বোধ হয় কোন কালে, না, কোন কালে কেন, সেই পূর্বজন্ম আমার মা ছিলি ! নন্দা কিছু বলত না, শুধু মুচকি হেসে কাজে যোগ দিত। বাপ যা যা খেতে পছন্দ করত, পাকা গিন্নির মত সে রেঁধে খাওয়াত।
সেই ছোট বেলায় নন্দার মা মরে গিয়েছিল এক দিনের জ্বরে। ডাক্তার কবিরাজ দিয়ে দেখাবার সময়ও না কি পুরোহিত পায় নি। আজও সে কথা নন্দার কাছে বলে দুঃখ করে। নন্দার মা-ও নাকি অপূর্ব সুন্দরী ছিল। নন্দা কোনদিন উচ্ছল ছিল না। সে ছিল ধীরস্থির, শান্ত, ভীরু একটি কোমল মেয়ে। ঠাকুর ঘরের প্রতিমার সঙ্গে তার রূপের তুলনা করা চলে- পটল তোলা দুটি ভীরু চোখ, ভাদ্রের নদীর মত তার যৌবন, যেন দু’কূল ছাপিয়ে ভেসে চলেছে কোন অজানা সাগর পারে। আস্তে আস্তে সে কথা বলে। আস্তে সে চলে, রক্ত ঝরা ঠোট দু’টি রক্ত গোলাপের মত লাল, যেন সব সময় তাজা রক্ত ঝরে পড়ছে। এত সুন্দর, এত মোহনীয় সে।
সারা গ্রামের লোক তাকে একটু দেখার জন্য তার মুখের মিষ্টি কথা শোনার জন্য ব্যাকুল, কিন্তু নন্দা কারো জন্য এতটুকু ব্যাকুল নয়। সে ব্যাকুল পুঁজা ঘরের পুঁজার জন্য। বাপের খাওয়া দাওয়া আর তার বিশ্রামের জন্য। সেদিন ছিল চৈত্রের বাসন্তী পূর্ণিমা। সারা মাঠ ঘাট জোৎ¯œার আলোয় মুখর। শুকনো মৌসূমে শুকনো পাতা একটি একটি করে টুপটাপ করে ঝরে পড়ছে। কিংশুক সলাজ হয়ে তাদের বুকে মুখ লাকাচ্ছে। রজনীগন্ধা তার সুবাস ছড়িয়ে ক্লান্ত হয়ে এলিয়ে পড়েছে। বকুলের মাতাল করা গন্ধে, যেন প্রাণ বিভোর হয়ে উঠছে। নন্দা চেয়েছিল দূরে, আরো দূরে, আকাশের বড় চাঁদটার দিকে।
কত বড় চাঁদ ! কত সুন্দর ! জীবনেও বোধ হয় এত সুন্দর চাঁদকে দেখেনি। কোথা থেকে যেন বাঁশির সুর ভেসে এল, সে সুর, আরো সুন্দর, চাঁদের থেকে মধুর। কে কে বাজায় এ মোহন বাঁশি। নন্দা ব্যাকুল হয়ে উঠল। মনের অগোচরে সে চলে গেল ঘর ছেড়ে অনেক দূরে। চেনা নেই, জানা নাই, কেহই নাই। শুধু একমাত্র বাঁশির সুরই তার সম্বল।
হাঁটতে হাঁটতে দু’টি পা তার ক্লান্ত হয়ে এল। দেখল দূরে অনেক দূরে সমস্ত বন আলো করে দেবতার মত রূপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক যুবক। নন্দা সোজা সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কুঞ্জও পাতার খসখস শব্দে বাঁশি ছেড়ে দিয়ে নন্দার চোখ পানে তাকিয়ে থাকল। কত না যুগের কত না বলা কথা তার চোখে চোখ রেখে বলে গেল। সে বলার শেষ নেই, সীমা নেই, অনন্ত অসীম সে চাওয়া। অনন্ত অসীম সে পাওয়া।

(চলবে——-)

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।