জীবনের ডায়েরী থেকে গল্প সমগ্র : পর্ব-১৩

ড. তাইবুন নাহার রশীদ (কবিরত্ন),
(গত সংখ্যার পর), আজ আমরা একুশে ফেব্রুয়ারীতে বুকে কাল ব্যাজ লাগাই, আর পহেলা বৈশাখে রমনার বটমূলে যেয়ে পান্তা খাই। কিন্তু সেই একদিনই কয়েকজন মানুষ দেখা যায়। তারা মনে প্রাণে সত্যিই বাঙ্গালী ? শুধু একদিনের বাঙ্গালী সেজে তো বাঙ্গালীর সত্ত্বাকেই অপমান করা হচ্ছে। আজকাল তো অনেকেই বাংলায় কথা বলতেও অসম্মত বোধ করে। আর যারা আছে তাদের মুখে বাঙ্গালীপনা আর ভিতরে পাশ্চাতের প্রভাব। ছেলে মেয়েদেরকে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ানোকেই উপযোগী মনে করে। এমনকি ২১ ফেব্রুয়ারী আর ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ ও তাদের কাছে বিশেষ অর্থসহ নয়। এর ব্যতিক্রম ও রয়েছে। আমরা চাই দেশের প্রতিটি মানুষ বাঙ্গালী সত্ত্বাকে মনে প্রাণে মেনে চলুক। নিজের অস্তিত্ব নিয়ে আর লুকোচুরি না করে। যে দিন এদেশের প্রতিটি নাগরিকের মনে দেশপ্রেম সত্যিকার ভাবে জেগে উঠবে সে দিন থেকে আমরা আমাদের সোনার বাংলা গড়ে তুলতে পারব।
আমি সেই বৃটিশ আমলের মানুষ। কত উত্থান, কত পতন, কত পরিবর্তন ঘটেছে আমার চোখের সামনে। দেশকে দেখেছি জন্ম লগ্নে আর এখনও দেখছি। নিজের দেশের প্রতি আমার যে ভালবাসা আছে হয়ত এক ভালবাসা আর কারো জন্যই ছিল না। যে কারণে বাবা-মা, স্বামী-সন্তান, পরিবারসহ সকল কিছুর মায়াতেই দেশকে ত্যাগ করিনি। বরং শত বাধা-বিপত্তি অগ্রাহ্য করেই আমি দেশের জন্য কাজ করেছি। আমার পরিবার হয়তো রাজনীতি করা পছন্দ করত না । সমাজ সেবাটা ও অনেকের চোখের বালি ছিল। কিন্তু তারপরও লেখা লেখিটা সকলের পছন্দ ছিল।
আমার সাহিত্য চর্চার জন্য আমার স্বামী আমাকে উৎসাহ দিতেন। কিন্তু বাইরে তা প্রকাশ করার অনুমতি দেন নি কখনো। কিংবা কোন বই-পত্রিকাও আমার জন্য নিয়া আসেন নি। ঘরের বাহিরে সমাজ সেবামূলক আমার সকল কাজই তার অপছন্দ ছিল। এ জন্যই হয়তো আমাকে ঘরে ধরে রাখতে চাইত। অন্যদিকে শুধু লেখা-লেখি করতে বলতেন।
আমার সন্তানেরা প্রত্যেকই বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত দেশ-বিদেশে তাদের কত সুনাম। এই সন্তনদের মানুষ করার পিছনে আমার কত অবদান। কত রাত জাগরণ কত প্রহর গোনা কত চিন্তা সন্তানের জন্য। নিজের কাজকে প্রাধান্য দিয়ে কখনো সন্তানদের ভুলে যাইনি। বুকে আগলে রেখেছি পরম মমতায়। অথচ আমার স্বামী বলত আমি না কি ঘরের খেয়ে বনের মহিষ তাড়াই।
তখন তার কথায় মনে কষ্ট পেলেও পরে বুঝেছি, তিনি তো আমার স্বামী। কখনোই আমার অমঙ্গল চাইবেন না। অবশ্য আমরা আগের দিনের মানুষ। সে কারণে হয়তো চাইতেন ঘরের বউ ঘরে থাক। বুঝতে পেরেছি বলেই তার প্রতি আমার কোন অনুযোগ ছিল না। আজ আমার স্বামী নেই। তিনি পৃথিবী থেকে চির বিদায় নিয়ে গেলেন। স্বামী হিসেবে সর্বত্র আমি তাকে ভক্তি শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করি।
(চলবে———)
