সর্বশেষঃ

শীতে কুয়াশায় মোড়ানো মনপুরা, পর্যটনের অপার সম্ভাবনা

মোঃ সজীব মোল্লা || শীতের আগমনী বার্তায় কুয়াশার চাদরে ঢেকে যাচ্ছে চারপাশ। হিমেল বাতাস, নদীর বুকে ভেসে থাকা ধোঁয়াটে কুয়াশা আর বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠে প্রকৃতি যেন সাজছে নতুন রূপে। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে মেঘনার বুকে কুয়াশার আস্তরণ, সারি সারি গাছপালা, আঁকাবাঁকা মেঠোপথ আর গ্রামীণ জনপদের স্নিগ্ধ দৃশ্য তৈরি করে এক মায়াবী পরিবেশ। প্রকৃতির এমন অপরূপ সৌন্দর্যে শীতের পর্যটকদের হাতছানি দিচ্ছে ভোলার দ্বীপ উপজেলা মনপুরা।

ভোলা জেলা শহর থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মনপুরা। বঙ্গোপসাগর ও মেঘনা নদীবেষ্টিত এই দ্বীপের রয়েছে স্বতন্ত্র ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। নগরজীবনের কোলাহল থেকে দূরে নিরিবিলি পরিবেশে সময় কাটানো, নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করা কিংবা প্রকৃতির কাছাকাছি যাওয়ার জন্য মনপুরা হতে পারে ভ্রমণপিপাসুদের আকর্ষণীয় গন্তব্য।

শীতের সকালে মনপুরার প্রকৃতি যেন ধারণ করে এক ভিন্ন রূপ। ঘন কুয়াশায় ঢেকে থাকা নদী, হিমেল বাতাসের পরশ আর সূর্যের প্রথম আলোর মিতালি মুগ্ধ করে প্রকৃতিপ্রেমীদের। রাস্তার পাশে সারি সারি খেজুরগাছ, গাছিদের খেজুরের রস সংগ্রহ এবং গ্রামীণ উঠানে খেজুরের গুড় তৈরির ব্যস্ততা শীতের বাংলার চিরচেনা ঐতিহ্যকে তুলে ধরে। কোথাও চিতই পিঠাসহ নানা ধরনের শীতের পিঠা তৈরির আয়োজন, কোথাও আবার কৃষকের মাঠে কর্মব্যস্ততা—সব মিলিয়ে মনপুরার গ্রামীণ জীবন হয়ে ওঠে আরও প্রাণবন্ত।

সূর্যের প্রথম আলো যখন ধীরে ধীরে কুয়াশার আবরণ ভেদ করে নদীর বুকে ছড়িয়ে পড়ে, তখন প্রকৃতির সৌন্দর্য পায় নতুন মাত্রা। দূর দিগন্তে নদী আর আকাশের মিতালি, নৌকার ধীরগতির চলাচল এবং নদীর ঢেউয়ের মৃদু শব্দ ভ্রমণকারীদের মনে এনে দিতে পারে প্রশান্তির অনুভূতি। শীতের সকালে নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় দেখা কিংবা বিকেলে সূর্যাস্তের রঙিন আভা উপভোগ করা হতে পারে ভ্রমণের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা।

মেঘনা নদীবেষ্টিত মনপুরার অন্যতম আকর্ষণ এর বিস্তীর্ণ নদীতীর ও জলরাশি। নদীতে জেলেদের মাছ ধরা, নৌযানের চলাচল এবং উপকূলীয় মানুষের জীবনসংগ্রাম দ্বীপটির সৌন্দর্যের পাশাপাশি তুলে ধরে নদীকেন্দ্রিক জনজীবনের বাস্তব চিত্র। প্রকৃতিপ্রেমীদের পাশাপাশি আলোকচিত্রীদের জন্যও এখানকার নদী, কুয়াশা, সবুজ প্রকৃতি ও গ্রামীণ পরিবেশ হতে পারে ছবি তোলার দারুণ অনুষঙ্গ।

মনপুরার সবুজ ফসলের মাঠ, আঁকাবাঁকা পথ, গাছপালায় ঘেরা জনপদ আর নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা জনবসতি পর্যটকদের সামনে তুলে ধরে বাংলার গ্রামীণ জীবনের অনন্য রূপ। স্থানীয় মানুষের জীবনযাপন, মাছ ধরা, নৌযাত্রা এবং ঋতুভিত্তিক গ্রামীণ কর্মযজ্ঞের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগও রয়েছে এখানে। পরিবার-পরিজন, বন্ধু কিংবা প্রিয়জনদের নিয়ে নিরিবিলি পরিবেশে সময় কাটাতে চান, এমন ভ্রমণপিপাসুদের জন্য মনপুরা হতে পারে ভিন্নধর্মী এক অভিজ্ঞতার ঠিকানা।

শীতকাল সাধারণত ভ্রমণের উপযোগী সময় হিসেবে বিবেচিত হয়। এ সময় তুলনামূলক আরামদায়ক আবহাওয়ায় ঘোরাঘুরি, ছবি তোলা এবং খোলা পরিবেশে সময় কাটানো সহজ হয়। বিশেষ করে কোলাহলপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রের পরিবর্তে যাঁরা প্রকৃতির সান্নিধ্যে শান্ত সময় কাটাতে চান, তাঁদের কাছে মনপুরার আকর্ষণ হতে পারে আলাদা।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও স্বতন্ত্র ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে মনপুরায় পর্যটনশিল্প বিকাশের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন পরিকল্পিত উদ্যোগ, পর্যটকবান্ধব যোগাযোগব্যবস্থা, নিরাপদ নৌযাত্রা, মানসম্মত আবাসন ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা। একই সঙ্গে দ্বীপের জীববৈচিত্র্য, নদী ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ।

ভোলা-৪ (চরফ্যাশন-মনপুরা) আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম নয়নও মনপুরার পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
তিনি প্রথমে জাতীয় সংসদ তার বক্তব্যে এবং পরে ২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা বাসস প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে চরফ্যাশন ও মনপুরাকে পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, পরিকল্পিতভাবে টেকসই ইকো-ট্যুরিজম গড়ে তোলা গেলে স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে এবং কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
নুরুল ইসলাম নয়ন আরও উল্লেখ করেন, মনপুরা ও চরফ্যাশনের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল, নদী, সমুদ্র ও প্রাকৃতিক পরিবেশ পর্যটন বিকাশের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। সরকার মনপুরাকে পর্যটন অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করলে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে টেকসই পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলেও তিনি মত দেন।

মনপুরা (ভোলা) প্রতিনিধি
তাং-২০-১০-২৬
Mdsajeebmolla98@gmail.com

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।