দক্ষিণবাংলার সাংস্কৃতিক আরণ্যকের তিনি একমাত্র রংতুলির কবি ‘টারজান’ ভাই

সময়টা ১৯৮৩-৮৪ সালের কথা। পটুয়াখালীর পুরোনো টাউন হলে উদীচী আয়োজিত নাটক দেখতে গিয়েছিলাম। নাটকের নাম ছিল ‘ওরা কদম আলী’, রচনায় মামুনুর রশীদ আর নির্দেশনায় গাজী মঈনউদ্দীন ‘টারজান’। তখন অত শত বুঝতাম না, কেবল নাটক দেখার আমেজেই যাওয়া। উদীচীর এই নাটকের সব পাত্র-পাত্রী বা কুশীলবদের কথা আজ আর স্পষ্ট মনে নেই, তবে নোয়াখালীর ভাষায় যে মানুষটি অসাধারণ অভিনয় করেছিলেন, তাঁকে কোনোদিন ভুলতে পারিনি।
এরপর প্রায়ই রাস্তায় ওঁনার সাথে দেখা হতো—বেশ রাশভারী এক ব্যক্তিত্ব। একদিন হঠাৎ পটুয়াখালী শিশু একাডেমির খোলা বারান্দায় ওনাকে আবিস্কার করলাম চিত্রাঙ্কন বিচারক হিসেবে। দেখা গেল, তিনি একদিকে ছবি আঁকছেন, অন্যদিকে বাচ্চাদের বুঝিয়ে দিচ্ছেন। আমার বন্ধু জুয়েল ও তার বোন লিলি বিশ্বাসের সাথে আমাদের পারিবারিক সুসম্পর্ক ছিল। জুয়েলের সাথে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওঁনার সেই শিল্পী সত্তাটি দেখছিলাম।
হঠাৎ দেখলাম, তৎকালীন সময়ের প্রখ্যাত আবৃত্তিশিল্পীদের মধ্যে সুমন, জাহিদ, আসাদ ভাই এবং নারীদের মধ্যে রজি আপা (রজি আপাও আমার পারিবারিকভাবে পরিচিত ছিলেন) সেখানে এলেন। দেখলাম, সেই একই মানুষ রজি আপাকে কবিতার আবৃত্তি বুঝিয়ে দিচ্ছেন। পরম বিস্ময়ে আমি মানুষটিকে দেখছিলাম। তখন ওঁনার ‘টারজান’ নামটা শুনলেই মনের ভেতরে ইংরেজি বহুল আলোচিত চলচ্চিত্র ও সিরিজের ‘টারজান’-এর কথা মনে পড়ে যেত, আর মনে মনে একা একাই কত দিন হেসেছি!
মানুষটি চোখে একটা চিকন ফ্রেমের ছোট ফ্যান্সি সানগ্লাস পরতেন, যা ওনাকে বেশ মানিয়ে যেত। মাথায় ঘন কালো কোঁকড়ানো লম্বা চুল—সব মিলিয়ে চমৎকার লাগত।
এরপরের ঘটনা, শহীদ আলাউদ্দীন শিশু পার্কের পাশ দিয়ে ভাড়া সাইকেল চালাচ্ছি। দেখলাম, সেই মানুষটি ডেকোরেটরের লোকজনকে কী যেন বুঝিয়ে দিচ্ছেন। সাথে তখন সুভাষ রায় স্যারসহ আরও অনেকেই ছিলেন। শৈশবের কথা, সবাইকে আজ আর মনে নেই। এবার আমার মনে কৌতূহল জাগল, ওঁনার পিছু নিলাম—দেখা যাক মানুষটি কোথায় যান!
দেখলাম, তিনি সোজা হেঁটে পটুয়াখালী প্রেসক্লাব পার হলেন, তারপর লাইট হাউস সিনেমার পার হয়ে নতুন বাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভেতরে ঢুকে পড়লেন। সম্ভবত সেদিন স্কুল বন্ধ ছিল। নিচতলার একটি কক্ষে নাটকের মহড়া চলছিল, যা বোধহয় আগে থেকেই শুরু হয়েছিল। ভেতরের দু-একজন ছাড়া সবাইকে আমি চিনতাম না। যাঁদের চিনেছিলাম, তাঁরা হলেন বাবুল কুমার দাস, মিজান ভাই, বিপুল দা, আর আমার নানা অ্যাডভোকেট এ. কে. বদরুল হক বাচ্চু। নানাকে দেখামাত্রই আমার অনুসন্ধিৎসু মন ও গোয়েন্দাগিরির নেশা এক নিমেষে পালিয়ে গেল!
ভয়ে সেখান থেকে চটজলদি বেরিয়ে এসে দেখি, আমার ভাড়া করা সাইকেলটি আর নেই! আসে-পাশের অনেককে জিজ্ঞেস করেও কোনো হদিস পেলাম না। ভয়ে আর ভাড়া সাইকেলের গ্যারেজের মুখো হলাম না। ধারণা করলাম, সাইকেলটি নিশ্চয়ই কেউ চুরি করে নিয়ে গেছে। সেদিন অত্যন্ত বাজে একটা দিন ও আতঙ্কের সন্ধ্যা পার করছিলাম—এই বুঝি ভুবন দা সাইকেলের ক্ষতিপূরণ চাইতে বাসায় চলে আসেন! বাসায় এলে তো সব গোমড় ফাঁস হয়ে যাবে—ভাড়ায় সাইকেল চালাই, আর পড়াশোনা ফেলে শহরজুড়ে ঘুরে বেড়াই! তবে সেযাত্রা বেঁচে গিয়েছিলাম; ভুবন দা আর বাসায় আসেননি।
যাহোক, নতুন বাজারে মহড়ার সময় বাবুল দা উৎসুক মানুষের ভিড় সামলাতে বলছিলেন, “শনিবার সন্ধ্যায় শিশু পার্কে আইসেন, এখন যানতো ভাই।” কথাটা আমার কানে থেকে যায়।
পরের দিন যথাসময়ের অনেক আগেই শৈশবের কয়েকজন খেলার সাথী—পটুয়াখালীর শিমুলবাগের রিয়াজ, রিপন, জুয়েল ও দোকানদার মামুন ভাইকে নিয়ে পার্কপাড়ায় চলে এলাম। এসে দেখি পুরো জায়গায় পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে রেখেছে। উদীচীর নাটক ছিল ‘দিন বদলের পালা’। অত রাজনীতি না বুঝলেও ভীষণ রাগ হচ্ছিল। সেখান থেকে জব্বার অ্যাডভোকেটসহ অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। চারপাশে প্রচুর মানুষের ভিড়, ডিসি ও এসপি সাহেব চলে এসেছেন—নাটক করতে দেওয়া হবে না।
মনে হলো, সেযাত্রা বোধহয় আর নাটক দেখা হলো না। তবে মঞ্চের পাশে তাকাতেই দেখি, সেই চেনা মানুষটি (টারজান ভাই) বসে সবার সাথে খুব হাসি-ঠাট্টা করছেন। এর মাঝেই ডিসি ও এসপি সাহেবের সাথে রাশভারী কণ্ঠে, পরিমিত ও মার্জিত বাংলায় এক ভদ্রলোক কথা বলছেন—কণ্ঠটি আমার খুব পরিচিত। তিনি আর কেউ নন, আমার নানা, সাবেক বিচারপতি এ. কে. বদরুল হক বাচ্চু। তিনি এগিয়ে গিয়ে টারজান ভাইকে বললেন, “টারজান, একটু রয়ে-সয়ে সংলাপ দিও। ডিসি ও এসপি মহোদয় তোমাদের নাটক দেখবেন।”
একথা শুনে মনে যে কত আনন্দ হয়েছিল, তা ভাষায় বোঝাতে পারব না!
নাটক শুরু হলো। কিন্তু সেই টারজান ভাই আর মঞ্চে আসেন না। হঠাৎ ওঁনার ভরাট ও গম্ভীর গলায় কবিতা আবৃত্তি শুনতে পেলাম। তার কিছুক্ষণ পর—কী অসাধারণ অভিনয়! জমিদারের সুদে-আসলে চড়া মহাজনের ভূমিকায় তিনি মঞ্চে অবতীর্ণ হলেন। টারজান ভাই এই নাটকের দুটি মূল চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন এবং সেদিন দর্শকদের কাছ থেকে প্রচুর প্রশংসা ও করতালি কুড়িয়েছিলেন। মূলতঃ সেদিন থেকেই অভিনয়ের একটা সুপ্ত বীজ আমার মনের গহীনে রোপিত হয়ে গিয়েছিল।
১৯৮৮ সালে ‘খেলাঘর’-এর যাত্রা শুরু। মহিলা সমিতি স্কুলে মহড়ার সময় প্রায়ই নানা টালবাহানা হতো। কী আর করা! বাধ্য হয়ে আমরা টারজান ভাইয়ের বাবা—প্রবীণ আইনজীবী ও বিশিষ্ট আওয়ামী লীগ নেতা মরহুম আজাহার উদ্দিন সাহেবের চেম্বারে মহড়া করতাম। তখন ছোট ছিলাম, সব কিছু আজ স্পষ্ট মনে না থাকলেও এটুকু খুব মনে আছে—টারজান ভাই পটুয়াখালীতে অনেককে নিজ হাতে ধরে ধরে আবৃত্তি, ছবি আঁকা ও নাটক শিখিয়েছেন। একমাত্র আমিই হয়তো তাঁর কাছে সরাসরি আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু শিখতে পারিনি; তবুও আমার সমস্ত সাংস্কৃতিক ও নাট্যশিক্ষার মূল ভিত্তিপ্রস্তর বা ব্রিজলাইন কিন্তু এই মহান মানুষটিই।
১৯৯৬ সালে আমি, পঙ্কজ ও মনি সুন্দর একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে সুন্দরম নামের সংগঠনটি ছেড়ে দিলাম। সিদ্ধান্তটি ছিল—কোনো অবস্থাতেই ‘দখিনা খেলাঘর’-এর কার্যক্রম ব্যাহত বা নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না। তাই ‘শহীদ স্মৃতি পাঠাগার’-এর জং ধরা তালা খুলে, ইঁদুরের আস্তানা পরিষ্কার করে, কেটে দেওয়া বিদ্যুৎ সংযোগ আবার পুনর্বহাল করলাম।
এরই মধ্যে আমরা শুনতে পেলাম, টারজান ভাই বরিশাল থেকে এমা আপার নেতৃত্বে আবার খানিকটা স্থবির হয়ে পড়া উদীচীর কার্যক্রম বেগবান করতে পটুয়াখালী জেলা সংসদের সম্মেলন আয়োজনের কথাবার্তা চিন্তা করছেন। আমি ও আমরা একবাক্যে তাতে সায় দিলাম এবং সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলাম। শুরু হলো নাটকের মহড়া তৈরী হলো সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি গঠন।
এবার এক নতুন ও উদ্যমী টারজান ভাইকে ধীরে ধীরে আবিষ্কার করতে লাগলাম। আর তাঁর কাছ থেকে গ্রহণ করতে শুরু করলাম তাঁর অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার আলো। টারজান ভাইও আমার ওপর ভরসা করতে শুরু করলেন। আমার অভিনয়, নাট্যচর্চার প্রতি তীব্র অনুরাগ ও কবিতা পাঠের ধরণ তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। প্রায়শই তিনি বলতেন, “তোমাকে মূল্যায়ণ করার মতো মানুষ এই শহরে কেউ নেই”। কষ্ট পেয়ে থেমে যেও না, তোমার চর্চা তুমি চালিয়ে যাও।”
তাঁর সাথেই আবার ‘দিন বদলের পালা’ নাটকে অভিনয় করলাম। মঞ্চে ওঁনার বলিষ্ঠ অভিনয় যেন আমার অভিনয়কে স্তব্ধ ও মুগ্ধ করে দিচ্ছিল! কীভাবে একজন মানুষ বাচিক আঙ্গিক ও শারীরিক অঙ্গভঙ্গিতে (Gesture) এত নিখুঁত ও প্রাণবন্ত অভিনয় করতে পারে! সেদিনই বুঝেছিলাম, ওঁনার মতো অভিনয় করতে হলে আমাকে অনেক বড় প্রশিক্ষণ নিতে হবে। টারজান ভাইয়ের যোগাযোগের পরিধি ও নেটওয়ার্ক ছিল সত্যিই প্রশংসনীয় ও সুদূরপ্রসারী….
তুলির কবি
পটুয়াখালীর প্রবীণ বাচিক শিল্পী, প্রথিতযশা চিত্রশিল্পী, সাংস্কৃতিক সংগঠক এবং আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বটবৃক্ষ—গাজী মঈনউদ্দীন টারজন ভাই আর আমাদের মাঝে নেই। তাকে নিয়ে চাইলে একটা দুটা উপন্যাস লিখলেও শেষ হবে না, সে সব স্মৃতি থেকে একটা ছোট্ট স্মৃতি শেয়ার করা জরুরি।
তখনও ভোরের সূর্য ওঠেনি। আগের দিনই পটুয়াখালী থেকে বরিশালে এসে পৌঁছেছিলাম। রাত শেষ হতেই খুব সকালে বরিশাল সদর রোডের ‘হোটেল হক ইন্টারন্যাশনাল’-এর নিচে এসে টারজন ভাইয়ের ঠিকানা খুঁজতে শুরু করলাম। তখনকার দিনে মোবাইল ফোন ছিল না; ফলে এখনকার মতো সহজে ফোন করে ঠিকানা নেওয়া কিংবা গুগল ম্যাপে লাইভ লোকেশন শেয়ার করার কোনো উপায় ছিল না। তাই ভাইয়ের বরিশালের বাড়িটা সহজে খুঁজে পাচ্ছিলাম না।
হঠাৎ কোথা থেকে যেন হাতে একখানা ব্যাগ নিয়ে হাজির হলেন কেতাদুরস্ত, আলোর বাঁশিওয়ালা মরহুম সৈয়দ মিজান ভাই। তিনি বললেন, “টারজন ভাই তো এই পেছনেই থাকেন।”
এরপর দুজনে গিয়ে দরজায় কড়া নাড়তেই চোখ ডলতে ডলতে দরজা খুললেন টারজন ভাই। মুখে সেই চিরচেনা বিরক্তিহীন আন্তরিক হাসি ফুটিয়ে বললেন, “আইছো?”
সেসময় ‘থিয়েটার স্কুল’-এর ভর্তি পরীক্ষা ছিল। পুরো বিভাগ থেকে মাত্র ৩০ জন শিক্ষার্থী নেওয়া হবে। দেশবরেণ্য ও নামকরা শিক্ষকমণ্ডলী সেখানে থিয়েটারের প্রশিক্ষণ দেবেন। এত বড় একটা সুযোগ, অথচ আমার জেলা বাদ পড়ে যাবে—তা তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি। তাই টারজন ভাই নিজের উদ্যোগে আমার নামে একটা ভর্তি ফরম কিনে এনেছিলেন। আমাকে দিয়ে ফরমটি পূরণ করিয়ে নিজে গিয়ে জমাও দিয়েছিলেন। পরে জেনেছিলাম, কত লোক পরীক্ষা দেবে এবং প্রতিযোগিতা কত কঠিন হবে চিন্তা করে তিনি ব্যাকআপ হিসেবে মিজান ভাইকেও দিয়ে একটা ফরম পূরণ করিয়েছিলেন!
যাই হোক, এরপর আমরা তিনজন ‘সকাল-সন্ধ্যা’ হোটেলে সকালের নাস্তা সেরে হাঁটতে হাঁটতে বরিশালের ‘লুকাস বিল্ডিং’-এ গিয়ে উপস্থিত হলাম। ততক্ষণে সেখানে অনেক মানুষের সমাগম। টারজন ভাই আমাদের ভেতরে নিয়ে গেলেন। অনেকের সাথে কুশল বিনিময় শেষে তিনি চলে গেলেন তাঁর নিজের পত্রিকা ‘সাপ্তাহিক নান্দনিক’-এর কার্যালয়ে।
আমাদের ভাইবা (মৌখিক পরীক্ষা) সম্পন্ন হলো। বিকেলে নোটিশ বোর্ডে গিয়ে দেখি, উত্তীর্ণদের তালিকায় আমার নাম সবার ওপরে! ওই দিন বিকেলে টারজন ভাই মহাখুশি। আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে বললেন, “আমি ভাবছিলাম রানা তুমি যদি বাদ পড়ো, তাই ব্যাকআপ হিসেবে মিজানের ফরমটা পূরণ করাইছিলাম।” এরপর যতদিন বরিশালে ছিলাম, তিনি পরম গর্ব করে সবাইকে বলতেন, “দেখো, আমাদের পটুয়াখালীর ছেলে! তোমরা ওকে বাদ দিতে পারছো?”
থিয়েটার স্কুলের সেই মেধা তালিকায় শীর্ষস্থান অর্জনের সুবাদে বরিশালের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আমার এক নতুন পরিচিতি তৈরি হলো। সেই সাথে তৎকালীন সময়ের বাংলাদেশ তথা এশিয়ার অন্যতম স্বনামধন্য স্টুডিও থিয়েটার দল ‘শব্দাবলী’-র সাথে কাজ করার এক অসাধারণ সুযোগও উন্মোচিত হলো।
সেদিনের পর এল আরও এক অনন্য সুযোগ। টারজন ভাই আমার আঁকাআঁকি ও ডিজাইনের প্রতি গভীর আগ্রহ দেখে একদিন যেন তাঁর বুকের ভেতর জমে থাকা কলিজাটাই আমার হাতে তুলে দিলেন। বললেন, “যা কারো কাছে আমি কোনোদিন দিইনি, সেটা তোমাকে দিলাম। নাও।”
সেটি ছিল তাঁর সাধের স্কেচবুক! ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে সেদিন পর্যন্ত তাঁর আঁকা প্রতিটি নতুন রেখা, লেখা কবিতা আর নতুন যা কিছু শিখতেন—সবই ওই স্কেচবুকটায় লিপিবদ্ধ ছিল। খাতাটির পাতায় পাতায় ছিল অগুনতি ছোট-বড় লেখা, তাঁর প্রেম, বিয়ে, জীবনের ছোটখাটো কষ্ট আর অজস্র স্কেচ। তাঁর একমাত্র মেয়ে ‘কাকাতুয়া’-র বিভিন্ন বয়সের পোট্রেট, ভাবির স্কেচ এবং তাঁর নিজের বহু আত্মপ্রতিকৃতি (সেলফ-স্কেচ)। সেখানে আরও ছিল পিকাসোসহ বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্বদের জীবনী থেকে সংগৃহীত অনুপ্রেরণাদায়ক উক্তি ও পরিচিতদের ফোন নম্বর।
প্রায় দীর্ঘ তিনটি বছর খাতাটি আমার কাছে ছিল। টারজন ভাইয়ের ওই স্কেচবুকটি আমার শিল্পচেতনা ও সৃষ্টিশীলতাকে দারুণভাবে সমৃদ্ধ করেছিল। কথায় বলে—একজন নান্দনিক মানুষের একটি যেকোনো শিল্পকর্ম অন্য আরেকজন মানুষকে নান্দনিক করে তুলতে পারে। আমি এমনই একজন সৌভাগ্যবান মানুষ, যিনি এই মহান শিল্পীর ছায়ায় থেকে, দীর্ঘদিন তাঁর সাহচর্যে অনেক কিছু শেখার সুযোগ পেয়েছি।
প্রচণ্ড অভিমানী টারজন ভাই সত্যি আমাদের কাছে ছিলেন একজন আসল ‘সুপারহিরো’। তাঁর সাথে একই মঞ্চে অভিনয় করতে গিয়ে আমি প্রায়ই বিপাকে পড়তাম। কারণ অধিকাংশ সময়ই আমি নিজের অভিনয় ভুলে গিয়ে মুগ্ধ হয়ে তাঁর অভিনয় দেখতাম! একটা মানুষ কীভাবে এত দ্রুত ও সাবলীলভাবে চরিত্রের সাথে মিশে যেতে পারে, তা দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেতাম।
শিক্ষক ও গুরু-শিষ্যের এই পরম ঐতিহ্য ও ঋণ আমার হৃদয়ে চিরকাল অমর হয়ে থাকবে। আমাদের হয়তো এস এম সুলতানকে কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়নি; কিন্তু আমাদের ছিলেন এক অভিমানী, নিভৃতচারী ও প্রচারবিমুখ গুণী শিল্পী, অভিনেতা, আবৃত্তিকার, শিক্ষক ও সংগঠক—গাজী মঈনউদ্দীন টারজন। আমাদের সকলের প্রিয় টারজন ভাই।
আমাদের সমবেত সকল নান্দনিকতায় ও শিল্পবোধে আপনি বেঁচে থাকবেন চিরকাল।
আমরা জীবনযাত্রায় অনেক কিছুই সংগ্রহ বা সংরক্ষণ করি না, কিন্তু এই মহান শিল্পীকে চিরভাস্বর করে রাখতে তাঁর অনন্য শিল্পকর্মগুলো সঠিকভাবে সংগ্রহ ও সংরক্ষণের জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের কাছে আকুল অনুরোধ জানাচ্ছি।
