সর্বশেষঃ

শিক্ষক দম্পতির সন্তান: গর্বের এক পরিচয়- মোঃ শাফায়াত হোসেন সিয়াম

কিছু পরিচয় মানুষ অর্জন করে, আর কিছু পরিচয় জন্মের সঙ্গে জীবনের অংশ হয়ে যায়। আমার জীবনে এমনই একটি পরিচয় হলো ‘আমি একজন শিক্ষক দম্পতির সন্তান।’ এই পরিচয় আমার কাছে শুধু গর্বের নয়, এটি আমার বেড়ে ওঠার গল্প, আমার মূল্যবোধের গল্প এবং জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়ার গল্প।

আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবস। এই দিনটি পৃথিবীর কোটি কোটি শিক্ষককে শ্রদ্ধা জানানোর দিন। কিন্তু আমার কাছে শিক্ষক দিবসের অনুভূতিটা একটু আলাদা। কারণ, শিক্ষকতা আমার কাছে কোনো দূরের পেশা নয়। ছোটবেলা থেকেই আমি এই পেশাকে খুব কাছ থেকে দেখেছি, অনুভব করেছি এবং আমার বাবা-মায়ের জীবনের মধ্য দিয়ে এর অর্থ বুঝেছি।

একজন শিক্ষক যখন শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করেন, তখন তাঁর সামনে শুধু কিছু শিক্ষার্থী থাকে না। তাঁর সামনে থাকে অনেকগুলো স্বপ্ন। কেউ চিকিৎসক হতে চায়, কেউ প্রকৌশলী, কেউ শিক্ষক, কেউ উদ্যোক্তা, কেউ আবার শুধু একজন ভালো মানুষ হতে চায়। সেই স্বপ্নগুলোকে সঠিক পথে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্বের একটি বড় অংশ থাকে শিক্ষকের হাতে।

আমার বাবা-মাকে দেখেই বুঝেছি, শিক্ষকতার দায়িত্ব শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের মধ্যে শেষ হয় না। দিনের পাঠদান শেষ হওয়ার পরও শিক্ষার্থীদের নিয়ে ভাবনা থেকে যায়। কোনো শিক্ষার্থী ভালো করলে আনন্দ, কেউ পিছিয়ে পড়লে চিন্তা, কারও সমস্যা হলে পাশে থাকার চেষ্টা। একজন শিক্ষক কখন যে শিক্ষার্থীদের জীবনের সঙ্গে নিজের দায়িত্বকে জড়িয়ে ফেলেন, তা হয়তো তিনি নিজেও বুঝতে পারেন না।

শিক্ষকতার এই মানবিক দিকটি বাইরে থেকে সবসময় দেখা যায় না।

একজন শিক্ষক হয়তো প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থীর সামনে দাঁড়িয়ে পাঠদান করেন। কিন্তু তাঁর বলা একটি বাক্য কোনো একজন শিক্ষার্থীর মনে বছরের পর বছর থেকে যেতে পারে। তাঁর দেওয়া একটি উৎসাহ একজন ভীত শিক্ষার্থীকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে পারে। তাঁর একটি পরামর্শ হয়তো কোনো তরুণকে ভুল সিদ্ধান্ত থেকে ফিরিয়ে আনতে পারে।

এটাই একজন শিক্ষকের অদৃশ্য অবদান।

আমরা যখন কোনো সফল মানুষের গল্প শুনি, তখন তাঁর অর্জনের কথা বলি। কিন্তু সেই অর্জনের পেছনে থাকা শিক্ষকদের কথা অনেক সময় আমাদের আলোচনার বাইরে থেকে যায়। অথচ একজন চিকিৎসককে চিকিৎসাবিজ্ঞান শেখানোর পেছনে যেমন শিক্ষক ছিলেন, একজন প্রকৌশলীকে প্রকৌশলের জ্ঞান দেওয়ার পেছনেও শিক্ষক ছিলেন, তেমনি একজন সমাজকর্মী, সাংবাদিক, বিজ্ঞানী, উদ্যোক্তা কিংবা রাষ্ট্রনায়কের পথচলার শুরুতেও কোনো না কোনো শিক্ষক ছিলেন।

একজন শিক্ষক তাই শুধু একটি বিষয় পড়ান না; তিনি ভবিষ্যৎ তৈরি করেন।

একটি দেশের উন্নয়ন নিয়ে আমরা যখন আলোচনা করি, তখন অবকাঠামো, অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও শিল্পের কথা বলি। কিন্তু এসবের ভিত্তিতে যে মানুষগুলো কাজ করবেন, তাঁদের গড়ে তোলার দায়িত্ব কার? সেই দায়িত্বের একটি বড় অংশ শিক্ষকের।

তাই শিক্ষকের অবদানকে শুধু একটি পেশার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখার সুযোগ নেই। শিক্ষকতা আসলে একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম ভিত্তি।

আমার বাবা-মা দুজনই শিক্ষক। তাঁদের সন্তান হিসেবে আমি দেখেছি, একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় আনন্দ অনেক সময় নিজের জন্য কিছু অর্জনে নয়, বরং তাঁর শিক্ষার্থীর সাফল্যে। কোনো প্রাক্তন শিক্ষার্থী ভালো করেছে, নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে, সমাজে সম্মানের সঙ্গে কাজ করছে, এমন খবর একজন শিক্ষকের মুখে যে আনন্দ এনে দেয়, তা খুব সহজে ব্যাখ্যা করা যায় না।

হয়তো এ কারণেই শিক্ষকতার পেশাকে অন্য অনেক পেশা থেকে আলাদা মনে হয়। এখানে সাফল্যের একটি বড় অংশ নিজের নামে জমা হয় না। একজন শিক্ষক তাঁর সাফল্য ছড়িয়ে দেন তাঁর শিক্ষার্থীদের মধ্যে।

বহু বছর পর কোনো শিক্ষার্থী যখন তাঁর শিক্ষককে মনে করে, কোনো সাফল্যের মুহূর্তে যখন বলে, ‘আমার শিক্ষক আমাকে বিশ্বাস করেছিলেন’, তখন সেই একটি বাক্যই হয়তো একজন শিক্ষকের সারাজীবনের পরিশ্রমের সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি।

তবে শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা শুধু একটি দিবসের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি শুভেচ্ছা বার্তা কিংবা ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো সুন্দর, কিন্তু এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো শিক্ষকদের যথাযথ মর্যাদা দেওয়া, তাঁদের পেশাগত পরিবেশকে সম্মানজনক করা এবং শিক্ষা ব্যবস্থাকে এমনভাবে গড়ে তোলা, যেখানে একজন শিক্ষক নিশ্চিন্তে তাঁর মূল দায়িত্ব, মানুষ গড়ার কাজটি করতে পারেন।

কারণ শিক্ষকদের সম্মান করা মানে শুধু একজন শিক্ষককে সম্মান করা নয়। এটি জ্ঞানকে সম্মান করা, শিক্ষা ব্যবস্থাকে সম্মান করা এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সম্মান করা।

আমার জীবনের প্রথম শিক্ষক আমার বাবা-মা। তাঁদের কাছ থেকে আমি শুধু বইয়ের জ্ঞান পাইনি। পেয়েছি দায়িত্বশীলতার শিক্ষা, মানুষের প্রতি শ্রদ্ধার শিক্ষা, পরিশ্রমের মূল্য এবং নিজের জ্ঞানকে অন্যের কল্যাণে কাজে লাগানোর অনুপ্রেরণা।

তাঁদের শিক্ষকতা আমার চোখে শুধু একটি পেশা নয়, বরং প্রতিদিনের এক নীরব উদাহরণ। তাঁরা আমাকে শিখিয়েছেন, মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার জন্য সবসময় বড় কিছু করার প্রয়োজন হয় না। কখনো একটি ভালো কথা, একটি সঠিক পরামর্শ কিংবা একজন মানুষের পাশে দাঁড়ানোই যথেষ্ট।

আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবসে তাই আমার বাবা-মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে পৃথিবীর প্রতিটি শিক্ষককেই শ্রদ্ধা জানাতে চাই।

যাঁরা প্রতিদিন একটি শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়ে তুলছেন, যাঁরা নিজেদের সময় ও শ্রম দিয়ে শিক্ষার্থীদের স্বপ্নকে পথ দেখাচ্ছেন, যাঁরা হয়তো তাঁদের অবদানের পুরো স্বীকৃতি কখনো পান না, তাঁদের প্রত্যেকের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা।

আমি গর্বিত, আমি শিক্ষক দম্পতির সন্তান।

এই পরিচয় আমার কাছে শুধু একটি গর্বের বাক্য নয়। এটি আমার জীবনের একটি বড় শিক্ষা, একটি অনুপ্রেরণা এবং আমার সবচেয়ে আপন পরিচয়গুলোর একটি।

একজন শিক্ষক হয়তো তাঁর হাতে থাকা চকটি দিয়ে বোর্ডে কয়েকটি শব্দ লেখেন। কিন্তু সেই শব্দগুলো কখনো কখনো একজন শিক্ষার্থীর পুরো জীবন বদলে দিতে পারে। একটি শ্রেণিকক্ষ থেকে শুরু হতে পারে একটি পরিবারের পরিবর্তন, একটি সমাজের পরিবর্তন, এমনকি একটি দেশের পরিবর্তনও।

তাই শিক্ষককে সম্মান করা মানে ভবিষ্যৎকে সম্মান করা।

বিশ্ব শিক্ষক দিবসে পৃথিবীর সকল শিক্ষককে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও অশেষ কৃতজ্ঞতা।

তাঁরা জ্ঞানের আলো জ্বালিয়ে রাখুন, আর সেই আলোয় আলোকিত হোক আমাদের আগামী প্রজন্ম।

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।