মনপুরার আলোচিত ধর্ষণ মামলা ঘিরে নতুন বিতর্ক পরিকল্পিত মামলার অভিযোগ, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি; আদালতের রায়ের অপেক্ষায় দুই পক্ষ

ভোলার মনপুরায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে দায়ের হওয়া একটি আলোচিত ধর্ষণ মামলাকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে অভিযুক্তদের স্বজনরা মামলাটিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও হয়রানিমূলক দাবি করে নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন, অন্যদিকে তদন্তকারী সংস্থা আদালতে দাখিল করা অভিযোগপত্রে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগের সমর্থন পাওয়ার কথা উল্লেখ করেছে। ফলে মামলাটি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর মনপুরা থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৯(৩) ধারায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় একাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয় এবং পরবর্তীতে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তদন্ত শেষে পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে মামলাটি বিচারের জন্য প্রেরণের সুপারিশ করে।
তবে অভিযুক্ত মোঃ রুবেল ও মোঃ নাহিদ পাটোয়ারীর পরিবারের সদস্যরা দাবি করেছেন, মামলায় নিরীহ ব্যক্তিদের জড়ানো হয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা বিবাহিত ও স্বাভাবিক পারিবারিক জীবনযাপন করছেন। তাদের অভিযোগ, মামলার মূল আসামি হিসেবে নাম থাকা এক ব্যক্তি দীর্ঘদিন পলাতক থাকলেও অন্যদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তারা আরও দাবি করেন, বাদীপক্ষের সঙ্গে ওই পলাতক ব্যক্তির যোগাযোগ ছিল এবং বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
অভিযুক্তদের স্বজনরা মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের দাবি, ডিএনএ পরীক্ষা, আলামত সংগ্রহ এবং তদন্তের বিভিন্ন ধাপ নিয়ে অসঙ্গতি রয়েছে। এসব বিষয় আদালতের মাধ্যমে পুনঃপর্যালোচনা এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
অন্যদিকে তদন্তকারী সংস্থা আদালতে দাখিল করা অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছে, সাক্ষীদের জবানবন্দি, চিকিৎসা প্রতিবেদন, ডিএনএ বিশ্লেষণসহ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রাথমিক ভিত্তি পাওয়া গেছে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে মামলাটি বিচারের জন্য আদালতে পাঠানো হয়েছে।
মামলাটির তদন্তের দায়িত্বে থাকা মনপুরা থানার সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা, বর্তমানে দৌলতখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আহসান কবিরের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমি মামলার তদন্ত সম্পন্ন করে আসতে পারিনি। অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষণ মামলায় ভুক্তভোগীর ডিএনএ পরীক্ষা করা না হলেও অভিযুক্তদের ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করা হয়েছে। মামলাটিতে বিভিন্ন সামাজিক ও স্থানীয় প্রভাবের বিষয়ও ছিল। তবে তদন্ত চলাকালে আমার সঙ্গে বাদীপক্ষের কোনো আর্থিক লেনদেন বা অনৈতিক যোগাযোগ হয়নি।
তিনি আরও বলেন, “বাদীপক্ষ ও আসামিপক্ষের মধ্যে কোনো ধরনের সমঝোতার আলোচনা হয়েছিল বলে শুনেছি। তবে সেটি বাস্তবায়িত হয়নি। মামলাটি বর্তমানে আদালতের বিচারাধীন এবং আদালতই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন।
এদিকে মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি আপোষনামার কপি স্থানীয়ভাবে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের গুরুতর অপরাধসংক্রান্ত মামলায় কোনো আপোষনামার আইনগত গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার এখতিয়ার একমাত্র আদালতের।
মামলার বিষয়ে বক্তব্য জানতে বাদী সুরমার সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইনজীবী ও তদন্তসংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যক্তিদের কাছ থেকেও তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত মন্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় সচেতন মহলের অভিমত, বিচারাধীন একটি মামলাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের তথ্য ও দাবি-দাওয়া প্রচারিত হচ্ছে। এ অবস্থায় আদালতের চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত কাউকে অপরাধী বা নির্দোষ হিসেবে আখ্যায়িত না করে আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে এবং আদালতের রায়ের মাধ্যমেই এর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে।
