সর্বশেষঃ

ভোলা-বরিশাল সেতু হলে ইলিশের বড় প্রজননক্ষেত্র হুমকিতে

মোঃ সামিরুজ্জামান, সিনিয়ার স্টাফ রিপোর্টার

ভোলা-বরিশাল সেতু নির্মিত হলে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ ও অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে—এমন প্রত্যাশা রয়েছে সরকারের। তবে প্রস্তাবিত সেতুর অবস্থান নিয়ে বড় ধরনের পরিবেশগত ও মৎস্যসম্পদ ঝুঁকির কথাও বলছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের আশঙ্কা, কালাবদর ও তেঁতুলিয়া নদীর ওপর সেতু নির্মাণের ফলে ইলিশের গুরুত্বপূর্ণ প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্রের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এতে দীর্ঘমেয়াদে ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দ্বীপ জেলা ভোলাকে বরিশালের সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগে যুক্ত করতে কালাবদর ও তেঁতুলিয়া নদীর ওপর প্রায় ১১ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করছে সরকার। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শেষ হওয়ার পর প্রকল্পটির জন্য অর্থায়নকারী দেশ খোঁজা হচ্ছে। প্রস্তাবিত সেতুর দৈর্ঘ্য সংযোগ সড়ক ছাড়া ১০ দশমিক ৮৬৭ কিলোমিটার, যা পদ্মা সেতুর মূল সেতুর চেয়েও দীর্ঘ হবে।

সেতুটি নির্মিত হলে ভোলার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলে সরবরাহের সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি শিল্পায়ন, বিনিয়োগ ও সড়ক যোগাযোগে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা। তবে এর বিপরীতে নদীর গতিপথ, নাব্যতা এবং জলজ প্রাণবৈচিত্র্যের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কালাবদর ও তেঁতুলিয়া নদী ইলিশের গুরুত্বপূর্ণ অভয়াশ্রমের অন্তর্ভুক্ত। অভ্যন্তরীণ নদীতে ইলিশের জন্য ঘোষিত ছয়টি অভয়াশ্রমের মধ্যে বরিশালের কালাবদর ষষ্ঠ এবং ভোলার তেঁতুলিয়া চতুর্থ অভয়াশ্রমের অংশ।

এই নদীগুলো শুধু ইলিশের প্রজননের জন্য নয়, সাগর থেকে নদীতে ইলিশের চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবেও বিবেচিত। তেঁতুলিয়া নদীর মোহনা দিয়ে ইলিশ মেঘনা হয়ে কালাবদর, হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জের বিভিন্ন নদীপথে চলাচল করে। মেঘনায় প্রজননের পর জাটকার একটি বড় অংশ দুই থেকে তিন মাস তেঁতুলিয়া নদীতে অবস্থান করে বলেও মৎস্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

ইলিশসম্পদ উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের উপপরিচালক মো. নাসির উদ্দিন বলেন, তেঁতুলিয়া নদীর গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। মেঘনা নদীর ইলিশ সাগরে যাওয়া-আসার ক্ষেত্রে এ নদীর পথ ব্যবহার করে। তাঁর মতে, কোনো কারণে তেঁতুলিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হলে ইলিশের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় পরিচালক কামরুল হাসান জানান, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ ইলিশ দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদী থেকে আহরণ করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ ভোলা এলাকায় পাওয়া যায় বলে তিনি জানান।

মৎস্য কর্মকর্তাদের মতে, গত কয়েক বছরে কালাবদর ও তেঁতুলিয়া শুধু ইলিশ নয়, পাঙ্গাশ, আইড়, পোমাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের গুরুত্বপূর্ণ প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। ফলে নদী দুটির স্বাভাবিক প্রবাহে বড় ধরনের পরিবর্তন হলে এর প্রভাব পড়তে পারে পুরো মৎস্যসম্পদের ওপর।

প্রস্তাবিত সেতুর সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনে অবশ্য জলজ প্রাণী ও পরিবেশগত প্রভাবের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেতু নির্মাণে উন্নত প্রযুক্তির পাইল ব্যবহার করা হলে শব্দ ও কম্পন তুলনামূলক কম হবে। নদীতে কমসংখ্যক স্তম্ভ রাখার পরিকল্পনার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নির্মাণকাজের সময় ইলিশ ও ডলফিনের ওপর প্রভাব কমাতে বিশেষ নির্দেশিকা চুক্তিপত্রে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, নির্মাণকাজের সময়কার সাময়িক প্রভাব কমানো গেলেও দীর্ঘমেয়াদে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও ভূ-প্রকৃতির পরিবর্তন কীভাবে সামাল দেওয়া হবে।

বাংলাদেশ মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল ওহাব বলেন, কালাবদর-তেঁতুলিয়া প্রাকৃতিক মাছের রেণুর জন্য দেশের অন্যতম বড় ‘নার্সিং হোম’। এই নদীগুলোর স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হলে মৎস্যসম্পদের ওপর বড় ধরনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।

ইলিশসম্পদ উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের সাবেক পরিচালক মোল্লা এমদাদুল্লাহও নদীর গতিপথ পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। তাঁর মতে, বড় অবকাঠামো নির্মাণের ফলে নদীতে চর জাগা ও প্রবাহ পরিবর্তনের মতো প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হতে পারে। তিনি পদ্মা সেতুর আশপাশে গত কয়েক বছরে চর জাগার উদাহরণ টেনে ভোলা-বরিশাল সেতুর ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি নদী ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের কারিগরি বিভাগের একজন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সেতু নির্মাণ হলে নদীর ভূ-প্রকৃতিতে পরিবর্তন আসতে পারে এবং চর জাগার বিষয়টি পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়। তাঁর মতে, নদীর স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নিয়ে সেতুর নকশা ও নদীশাসন পরিকল্পনা করতে হবে।

প্রস্তাবিত সেতুর স্থান নির্ধারণেও নদীর গভীরতা, প্রবাহ ও তীরের স্থিতিশীলতা বিবেচনা করা হয়েছে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় তিনটি স্থান যাচাই করে বরিশালের লাহারহাট ফেরিঘাট থেকে প্রায় ১ দশমিক ৮ কিলোমিটার ভাটিতে এবং ভোলার ভেদুরিয়া ফেরিঘাটের সামান্য ভাটিতে সেতু নির্মাণের স্থানকে উপযুক্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এই এলাকায় তিনটি প্রধান নদীখাত, কয়েকটি ছোট খাল এবং প্রায় আট কিলোমিটার দীর্ঘ চরাভূমি রয়েছে। নদীর পানির গভীরতা স্থানভেদে ৬ থেকে ২১ দশমিক ৯ মিটার পর্যন্ত।

তেঁতুলিয়া নদীতে জোয়ার-ভাটার পানির উচ্চতার পার্থক্য ৩ থেকে ৪ মিটার। বর্ষাকালে নদীটির আয়তনিক প্রবাহ প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২৮ হাজার ৮৭০ ঘনমিটারে পৌঁছায়। ফলে সেতুর নকশা, পিলারের অবস্থান এবং নদীর পানি প্রবাহের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত কারিগরি বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে।

সেতু নির্মাণের পাশাপাশি এ অঞ্চলের পরিবেশগত ঝুঁকির আরেকটি উদাহরণ হিসেবে মৎস্য কর্মকর্তারা পটুয়াখালীর কলাপাড়ার আন্ধারমানিক নদীর কথা উল্লেখ করছেন। পায়রা বন্দর ও তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের পর ওই এলাকায় প্রায় ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ মাছের অভয়াশ্রম স্থায়ীভাবে হারিয়ে গেছে বলে তাঁরা জানান।

বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ভোলা-বরিশাল সেতুর সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন ২০২৩ সালে প্রণয়ন করা হয় এবং ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা জমা দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ও জাপান সরকারের সপ্তম প্ল্যাটফর্ম সভায় প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হয়। চলতি বছরের ৮ এপ্রিল অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় প্রকল্পটি নীতিগতভাবে অনুমোদিত হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে অননুমোদিত নতুন প্রকল্পের তালিকাতেও এটি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

সেতু বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে জাপানের নির্মাণ প্রতিষ্ঠান মিয়াগাওয়া কেনসেতসু কনস্ট্রাকশন লিমিটেড আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-জাপান যৌথ পিপিপি প্ল্যাটফর্মের অষ্টম সভায় ভোলা-বরিশাল ও শরীয়তপুর-চাঁদপুর সেতুকে অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত সেতুর বরিশাল প্রান্ত হবে বরিশাল সদর উপজেলার লাহারহাটে কালাবদর নদীর তীরে এবং ভোলা প্রান্ত ভেদুরিয়ায় তেঁতুলিয়া নদীর তীরে। বর্তমানে দুই প্রান্তেই ফেরিঘাট রয়েছে। সেতুটি বাস্তবায়িত হলে ফেরিনির্ভর যোগাযোগের অবসান ঘটিয়ে ভোলা ও বরিশালের মধ্যে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হবে।

মৎস্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় পরিচালক কামরুল হাসান বলেন, অভয়াশ্রমের নদীতে সেতু নির্মাণের বিষয়ে এখন পর্যন্ত সেতু কর্তৃপক্ষ ও মৎস্য অধিদপ্তরের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক সভা হয়নি। তবে প্রকল্পের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করার আগে মৎস্য অধিদপ্তরের মতামত নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।

ভোলা-বরিশাল সেতু তাই শুধু একটি যোগাযোগ অবকাঠামো নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি, জ্বালানি, শিল্পায়ন এবং নদীনির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকা। একই সঙ্গে কালাবদর ও তেঁতুলিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ নদী এবং ইলিশের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র রক্ষার প্রশ্নটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

উন্নয়ন ও পরিবেশের এই দ্বৈত বাস্তবতায় সেতুর চূড়ান্ত নকশা ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনায় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, মাছের প্রজনন, ডলফিনসহ জলজ প্রাণীর বিচরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি নদী-ভূপ্রকৃতির পরিবর্তন কতটা বিবেচনায় নেওয়া হয়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

এ বিষয়ে জানতে সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আব্দুর রউফ এবং বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী আবু হুমায়ুন মো. শাখাওয়াত আকতারের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।