সর্বশেষঃ

যে চোখ ভোলাকে ছয় দশক ধরে দেখেছে: একজন এম. এ. তাহের

যে চোখ ভোলাকে ছয় দশক ধরে দেখছে : একজন আবু তাহের

এ এইচ এম বজলুর রহমান::

যে চোখ ভোলাকে ছয় দশক ধরে দেখেছে

নদীভাঙন, মুক্তিযুদ্ধ, কারাবরণ, প্রেসক্লাবের শুরুর দিন আর মানুষের কথা বলার দায়। প্রবীণ সাংবাদিক এম. এ. তাহের, বি.এ.-এর জীবন শুধু একজন সংবাদকর্মীর ব্যক্তিগত ইতিহাস নয়, এটি ভোলার সামাজিক স্মৃতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

 

এখন তিনি আগের মতো সংবাদপত্র পড়তে পারেন না।

 

চোখে সমস্যা। ছোট অক্ষর ঝাপসা হয়ে আসে। যে মানুষটি একসময় মানুষের খবর খুঁজে বেড়াতেন, দূরের চর থেকে নদীভাঙনের খবর আনতেন, রাস্তা-ঘাটের দুরবস্থা লিখতেন, যুদ্ধের সময় মৃত্যু আর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন, সেই মানুষটিকেই এখন সংবাদপত্রের পাতা পড়তে লড়াই করতে হয়।

 

এম. এ. তাহের, বি.এ.-এর এই বার্ধক্যের দৃশ্যটি যেন শুধু একজন প্রবীণ সাংবাদিকের নয়, বাংলাদেশের পুরোনো জেলা সাংবাদিকতারও প্রতীক।

 

একটি সময় ছিল যখন সাংবাদিকতা করতে স্মার্টফোন লাগত না। লাগত পা, চোখ, কান, সাহস আর ধৈর্য।

 

এম. এ. তাহের সেই সময়ের মানুষ।

 

তিনি সাংবাদিকতায় এসেছিলেন ১৯৬০-এর দশকে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৬৫ সালের দিকে তাঁর প্রথম দিকের একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। বিষয় ছিল ভোলার নদীভাঙন।

 

আজকের ভাষায় এটিকে হয়তো ‘ক্লাইমেট স্টোরি’ বলা হতো।

 

তখন অবশ্য জলবায়ু পরিবর্তন শব্দবন্ধটি আমাদের নীতির ভাষায় প্রবেশ করেনি। কিন্তু নদীভাঙন যে শুধু নদীর পাড় ভাঙা নয়, মানুষের জীবন ভাঙা, সেটি স্থানীয় সাংবাদিকেরা বহু আগেই দেখেছিলেন।

 

এম. এ. তাহেরও দেখেছিলেন।

 

প্রথম খবর ছিল ভাঙনের

 

ভোলা নদীবেষ্টিত জেলা। নদী এখানে শুধু ভূগোল নয়, ভাগ্যও।

 

নদী মানুষকে দেয়, আবার কেড়ে নেয়।

 

একটি পরিবার এক সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখতে পারে, তাদের বাড়ির সামনের জমি নেই। আরেক বছর পর হয়তো বসতভিটার বড় অংশই নদীতে।

 

এম. এ. তাহেরের সাংবাদিকতার প্রথম গল্পগুলোর একটি ছিল এই ভাঙন নিয়ে।

 

এখানেই তাঁর সাংবাদিকতার চরিত্রটি বোঝা যায়।

 

তিনি বড় রাজনীতির বড় বক্তব্য দিয়ে শুরু করেননি। শুরু করেছিলেন মানুষের বসতভিটা হারানোর গল্প দিয়ে।

 

এটা গুরুত্বপূর্ণ।

 

কারণ সাংবাদিকতার একটি নীরব শ্রেণিবিন্যাস আছে। রাজধানীর রাজনীতি বড় খবর। গ্রামের রাস্তা ছোট খবর। মন্ত্রীর বক্তব্য বড় খবর। নদীভাঙনে একটি পরিবারের ভিটা হারানো ছোট খবর।

 

কিন্তু সেই পরিবারটির কাছে কোনটি বড়?

 

এই প্রশ্নটাই স্থানীয় সাংবাদিকতার কেন্দ্র।

 

এম. এ. তাহেরের প্রজন্মের সাংবাদিকেরা জানতেন, জেলা সাংবাদিকতার অর্থ হলো এমন বিষয়কে দৃশ্যমান করা, যা জাতীয় আলোচনায় সহজে জায়গা পায় না।

 

রাস্তা ভাঙা। ঘাট বন্ধ। সেতু দরকার। চরবাসীর যাতায়াত নেই। নদী বাড়ি খেয়ে ফেলছে।

 

এসবকে ‘ছোট খবর’ বলা সহজ।

 

কিন্তু এগুলোই মানুষের জীবন।

 

তখন সংবাদ পাঠানোও ছিল একটি অভিযান

 

আজ একজন প্রতিবেদক ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে মোবাইলে ভিডিও পাঠাতে পারেন। ছবি পাঠাতে পারেন। লাইভ করতে পারেন। দশ মিনিটের মধ্যে প্রতিবেদন অনলাইনে চলে যেতে পারে।

 

এম. এ. তাহেরের সময় তা ছিল না।

 

খবর সংগ্রহের পর আরও একটি যুদ্ধ শুরু হতো: খবর পাঠানোর যুদ্ধ।

 

টেলিফোন সীমিত। যোগাযোগ ধীর। জেলা থেকে ঢাকায় সংবাদ পৌঁছানো কঠিন। কখনো হাতে লেখা কপি, কখনো ফোন, কখনো অন্য কোনো মাধ্যমের সাহায্যে খবর পাঠাতে হতো।

 

এর ফলে সংবাদে গতি কম ছিল।

 

কিন্তু গতি কম ছিল বলে কি সাংবাদিকতা দুর্বল ছিল?

 

সব সময় নয়।

 

বরং অনেক ক্ষেত্রে সাংবাদিককে ঘটনাস্থলে যেতে হতো। মানুষের সঙ্গে বসতে হতো। ঘটনার ভেতরে ঢুকতে হতো।

 

আজ সাংবাদিকতা দ্রুত হয়েছে, কিন্তু একটি নতুন সমস্যা তৈরি হয়েছে: মাঠের বদলে স্ক্রিনের ওপর নির্ভরতা।

 

ফেসবুক পোস্ট থেকে খবর। ভিডিও ক্লিপ থেকে খবর। অন্যের স্ট্যাটাস থেকে খবর। কখনো যাচাই ছাড়াই সংবাদ।

 

প্রযুক্তি সাংবাদিকতাকে সহজ করেছে। কিন্তু সহজ সাংবাদিকতা সব সময় ভালো সাংবাদিকতা নয়।

 

এম. এ. তাহেরের প্রজন্ম থেকে তাই একটি শিক্ষা পাওয়া যায়: সাংবাদিকতা প্রযুক্তি দিয়ে করা যায়, কিন্তু সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি হয় না।

 

তা তৈরি হয় মাঠে গিয়ে, দেখে, শুনে, যাচাই করে।

 

২৫ মার্চের রাত

 

এম. এ. তাহেরের জীবনের সবচেয়ে নাটকীয় স্মৃতিগুলোর একটি ১৯৭১ সালের মার্চ।

 

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২৫ মার্চের সময় তিনি ঢাকায় ছিলেন।

 

সেই রাতে ঢাকায় পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর অভিযান শুরু হয়।

 

শহরের জীবন কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বদলে যায়।

 

ভয়, মৃত্যু, গুলির শব্দ, বন্ধ দোকান, খাবারের সংকট, অচল যোগাযোগ।

 

এম. এ. তাহেরের স্মৃতিতে আছে সামান্য খাবার জোগাড় করে বেঁচে থাকার চেষ্টা। কোথাও দুই মুঠো ভাত, কোথাও আলুভাজি বা ডাল।

 

এই বর্ণনা খুব বড় কোনো সামরিক ইতিহাস নয়।

 

এটাই তার গুরুত্ব।

 

যুদ্ধের ইতিহাস শুধু বন্দুক, মানচিত্র, কমান্ডার আর যুদ্ধক্ষেত্রের ইতিহাস নয়। যুদ্ধের ইতিহাস হলো ক্ষুধার ইতিহাসও। পথ হারানোর ইতিহাস। বাড়ি ফেরার পথ খোঁজার ইতিহাস।

 

কয়েক দিন পর তিনি ঢাকা ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন।

 

মুন্সিগঞ্জ, ফরিদপুর, বরিশাল হয়ে শেষ পর্যন্ত ভোলায় ফেরেন।

 

আজকের বাংলাদেশের একজন মানুষ গুগল ম্যাপে পথ দেখে কয়েক ঘণ্টায় এই যাত্রার পরিকল্পনা করতে পারেন।

 

১৯৭১ সালে সেই একই যাত্রা ছিল জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন।

 

কোথায় সেনা, কোথায় গুলি, কোথায় সড়ক বন্ধ, কোথায় রাত কাটাবেন, কোথায় খাবেন, কেউ জানত না।

 

এম. এ. তাহেরের ব্যক্তিগত যাত্রাটি তাই বৃহত্তর এক সত্যের অংশ: যুদ্ধের সময় সাধারণ মানুষ প্রতিদিন অসংখ্য ছোট সিদ্ধান্ত নিয়ে বেঁচে ছিল।

 

এই ইতিহাস আমাদের পাঠ্যবইয়ে খুব কম আছে।

 

সাংবাদিক থেকে অংশগ্রহণকারী

 

ভোলায় ফিরে এম. এ. তাহের স্থানীয় মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন এবং মুক্তিযুদ্ধের কার্যক্রমে যুক্ত হন বলে সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন।

 

এখানেই সাংবাদিকতার একটি কঠিন নৈতিক প্রশ্ন সামনে আসে।

 

একজন সাংবাদিক কি শুধু পর্যবেক্ষক?

 

সাধারণ সময়ে উত্তর সম্ভবত হ্যাঁ। সাংবাদিকের কাজ ঘটনাকে দেখা, প্রশ্ন করা এবং সত্য তুলে ধরা।

 

কিন্তু যখন একটি জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বই আক্রান্ত হয়?

 

১৯৭১ সালে ‘নিরপেক্ষতা’ শব্দটির অর্থ আজকের মতো ছিল না।

 

সেই সময় বহু শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা, সাংবাদিক, চিকিৎসক, ছাত্র পেশাগত পরিচয়ের বাইরে গিয়ে নাগরিক ভূমিকা নিয়েছিলেন।

 

এখানে গুরুত্বপূর্ণ হলো ইতিহাসকে বর্তমানের নৈতিক মানদণ্ড দিয়ে সরলীকরণ না করা।

 

এম. এ. তাহেরের অভিজ্ঞতা আমাদের দেখায়, সাংবাদিকের পরিচয় কখনো কখনো নাগরিক দায়িত্বের সঙ্গে মিশে যায়।

 

বিশেষত যখন রাষ্ট্র ভেঙে পড়ছে, মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে এবং সত্য নিজেই একটি রাজনৈতিক ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়।

 

মৃত মানুষের মুখ

 

একজন স্থানীয় সাংবাদিকের কাজের রোমান্টিক গল্প আমরা সহজেই বলি।

 

‘মানুষের কথা বলেন’, ‘সাহসী সাংবাদিক’, ‘নির্ভীক কলম’।

 

কিন্তু এই কথাগুলোর আড়ালে কী থাকে?

 

মৃতদেহ থাকে।

 

রক্ত থাকে।

 

ভয় থাকে।

 

এম. এ. তাহের সাক্ষাৎকারে কয়েকটি হত্যাকাণ্ড ও মরদেহ দেখার অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। কোনো ঘটনায় একাধিক মানুষ নিহত। কোনো ঘটনায় নারীর মরদেহ।

 

ট্রান্সক্রিপ্টের কিছু অংশ অস্পষ্ট। কিন্তু স্মৃতির আবেগ স্পষ্ট।

 

একজন সাংবাদিক যখন ঘটনাস্থলে যান, তখন তিনি কেবল ‘স্টোরি’ সংগ্রহ করেন না। তিনি দৃশ্য বহন করে বাড়ি ফেরেন।

 

আজ আমরা সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলি। কিন্তু মানসিক নিরাপত্তা নিয়ে কতটা কথা বলি?

 

সহিংসতা, দুর্ঘটনা, লাশ, শিশু মৃত্যু, ধর্ষণ, দুর্যোগ, যুদ্ধ, রাজনৈতিক সংঘর্ষ নিয়মিত কাভার করা সাংবাদিকের ভেতরে কী ক্ষত তৈরি করে?

 

বাংলাদেশের স্থানীয় সাংবাদিকতায় এই প্রশ্ন প্রায় অনুপস্থিত।

 

সাংবাদিক ‘শক্ত’ হবে, এটিই যেন ধরে নেওয়া হয়।

 

কিন্তু মানুষ শক্ত হয় না। মানুষ অভ্যস্ত হয়, কখনো নীরব হয়, কখনো ভেঙে পড়ে।

 

এম. এ. তাহেরের স্মৃতি সেই অদৃশ্য মূল্যটির কথাও মনে করিয়ে দেয়।

 

প্রেসক্লাব তখন একটি ঘর

 

বর্তমানে ‘প্রেসক্লাব’ বললে আমাদের চোখে একটি ভবন আসে।

 

সভাকক্ষ। চেয়ার-টেবিল। কমিটি। নির্বাচন। পদ।

 

এম. এ. তাহেরের স্মৃতিতে প্রেসক্লাবের শুরু অনেক সাধারণ।

 

কোনো নির্দিষ্ট জায়গা নেই।

 

কখনো কারও বাসায় বসা। কখনো দোকানে। কখনো অস্থায়ী একটি ঘরে।

কয়েকজন সাংবাদিক একত্র হয়ে কমিটি তৈরি করছেন।

বাংলাদেশের বহু প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস এমনই।

শুরুতে ভবন থাকে না। থাকে মানুষ।

পরবর্তীকালে আমরা ভবনকে প্রতিষ্ঠান ভাবি, কিন্তু প্রতিষ্ঠান আসলে সম্পর্ক, বিশ্বাস, নিয়ম এবং দায়িত্বের সমষ্টি

এই জায়গায় এম. এ. তাহেরের স্মৃতি একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নও তোলে।

আজকের অনেক প্রেসক্লাব কি সাংবাদিকতার পেশাগত মান উন্নয়নের প্রতিষ্ঠান, নাকি স্থানীয় ক্ষমতা ও পদকেন্দ্রিক রাজনীতির অংশ?

এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

প্রেসক্লাব যদি শুধু কমিটি, নির্বাচন আর প্রভাবের জায়গা হয়ে যায়, তাহলে তার মূল উদ্দেশ্য হারিয়ে যায়।

তার কাজ হওয়া উচিত সাংবাদিকদের পেশাগত সুরক্ষা, প্রশিক্ষণ, নৈতিক মান, তথ্যপ্রাপ্তি এবং পারস্পরিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা।

এম. এ. তাহেরদের প্রজন্ম হয়তো সব ক্ষেত্রে আধুনিক পেশাগত মান মেনে চলেননি। কিন্তু তাঁদের কাছে অন্তত একত্র হওয়ার প্রয়োজনটি ছিল কাজের প্রয়োজন।

এই জায়গাটি নতুন করে ভাবা দরকার।

সংবাদ করার জন্য কারাগার

এম. এ. তাহেরের জীবনে জেলও এসেছে।

একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর তাঁকে এবং এক সহকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলে তিনি জানিয়েছেন। তাঁরা কয়েক দিন কারাগারে ছিলেন।

ঘটনাটির পূর্ণ বিবরণ ট্রান্সক্রিপ্টে স্পষ্ট নয়।

কিন্তু এই অভিজ্ঞতার ভেতরে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার একটি দীর্ঘ ইতিহাস আছে।

সংবাদ প্রকাশ করলেই সাংবাদিক নিরাপদ থাকবেন, এমন সময় বাংলাদেশে কখনোই পুরোপুরি ছিল না।

কখনো সরকার। কখনো প্রশাসন। কখনো স্থানীয় প্রভাবশালী। কখনো দলীয় শক্তি।

সত্য প্রকাশের মূল্য সাংবাদিকদের বহুবার দিতে হয়েছে।

কিন্তু আজকের পরিস্থিতি আরও জটিল।

এখন শুধু সরাসরি সেন্সরশিপ নয়, আছে ডিজিটাল হয়রানি, মামলা, ট্রলিং, সংগঠিত অপপ্রচার, বিজ্ঞাপন বন্ধের চাপ, মালিকানার স্বার্থ।

সাংবাদিকতার স্বাধীনতার ওপর চাপের ধরন পাল্টেছে।

তাই এম. এ. তাহেরের কারাবরণের স্মৃতি কোনো অতীতের গল্প নয়।

এটি একটি ধারাবাহিকতার অংশ।

মানুষের জন্য, কিন্তু কোন মানুষের জন্য?

সাক্ষাৎকারের শেষ দিকে এম. এ. তাহেরের একটি কথা বারবার ফিরে আসে।

তিনি মানুষের জন্য কাজ করেছেন।

মানুষের সেবা করেছেন।

কথাটি সুন্দর।

কিন্তু এখানেও একটি সাংবাদিকতাগত প্রশ্ন করা দরকার।

‘মানুষের জন্য সাংবাদিকতা’ মানে কী?

এটি কি শুধু দরিদ্র মানুষের পক্ষে কথা বলা?

নাকি ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করা?

বাস্তবে দুটোই।

শুধু আবেগ দিয়ে সাংবাদিকতা হয় না। আবার শুধু ‘দুই পক্ষের বক্তব্য’ দিয়েও জনস্বার্থ প্রতিষ্ঠিত হয় না।

সাংবাদিকতার কাজ হলো প্রমাণ খোঁজা, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা এবং যার ক্ষতি হচ্ছে তার অভিজ্ঞতাকে দৃশ্যমান করা।

এম. এ. তাহেরের সাংবাদিকতায় নদীভাঙন, রাস্তা, খাবার, দারিদ্র্য, স্থানীয় সমস্যা এসেছে।

আজ সেই তালিকায় নতুন বিষয় যুক্ত হয়েছে।

ডিজিটাল বৈষম্য। জলবায়ু বাস্তুচ্যুতি। অনলাইন প্রতারণা। নারী ও শিশুর ডিজিটাল নিরাপত্তা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার। স্থানীয় তথ্যের সংকট।

প্রশ্ন বদলেছে।

কিন্তু সাংবাদিকের দায়িত্ব বদলায়নি।

সাংবাদিকতার নতুন রোগ

এম. এ. তাহেরের প্রজন্মের দিকে তাকিয়ে অতীতকে রোমান্টিক করা ঠিক হবে না।

পুরোনো সাংবাদিকতায়ও পক্ষপাত ছিল। রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা ছিল। তথ্যের সীমাবদ্ধতা ছিল। পেশাগত প্রশিক্ষণ ছিল কম।

কিন্তু আজকের সাংবাদিকতায় নতুন কিছু রোগ তৈরি হয়েছে।

প্রথমটি হলো গতি।

সবার আগে দিতে হবে।

দ্বিতীয়টি হলো দৃশ্যমানতা।

কত লাইক, কত শেয়ার, কত ভিউ।

তৃতীয়টি হলো অ্যালগরিদম।

কোন সংবাদ গুরুত্বপূর্ণ, সেটি অনেক ক্ষেত্রে সম্পাদক নয়, প্ল্যাটফর্ম ঠিক করছে।

চতুর্থটি হলো কম খরচের সাংবাদিকতা।

মাঠে না গিয়ে ডেস্কে বসেই খবর তৈরি।

এই চারটি প্রবণতা স্থানীয় সাংবাদিকতার ভিত্তিকে দুর্বল করতে পারে।

কারণ স্থানীয় সাংবাদিকতার শক্তি ছিল মানুষের কাছে থাকা।

যদি স্থানীয় সাংবাদিকও মানুষের বাড়ি, বাজার, ঘাট, চর, ইউনিয়ন পরিষদ, হাসপাতাল, থানা ছেড়ে শুধু ফেসবুক স্ক্রিনে চলে যান, তাহলে জাতীয় ও স্থানীয় সাংবাদিকতার পার্থক্য কমে যায়।

আর তখন হারিয়ে যায় স্থানীয় জ্ঞান।

শেষ বয়সের একটি চোখ

এম. এ. তাহের এখন নিয়মিত পত্রিকা পড়তে পারেন না।

চোখে সমস্যা।

এই দৃশ্যটি মনে থাকে।

একজন মানুষ যিনি প্রায় ছয় দশক ধরে দেখেছেন, এখন দেখতে পান কম।

কিন্তু হয়তো তাঁর কাজ এখনো শেষ হয়নি।

কারণ তাঁর স্মৃতি এখনো আছে।

সেই স্মৃতি রেকর্ড না করলে হারিয়ে যাবে।

শুধু এম. এ. তাহের নন।

ভোলায়, বরিশালে, কুড়িগ্রামে, সাতক্ষীরায়, সুনামগঞ্জে, রাঙামাটিতে এমন বহু প্রবীণ সাংবাদিক আছেন, যাঁদের মাথার ভেতরে স্থানীয় ইতিহাসের বিশাল আর্কাইভ।

এখনো হয়তো কারও আলমারিতে আছে ১৯৭০-এর দশকের সংবাদপত্র।

কারও কাছে আছে পুরোনো ছবি।

কারও কাছে আছে হাতে লেখা নোট।

কারও কাছে আছে মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ স্মৃতি।

আর কয়েক বছর পর এর অনেক কিছুই থাকবে না।

এখনই দরকার স্থানীয় ইতিহাসের ডিজিটাল আর্কাইভ

বাংলাদেশে জাতীয় ইতিহাস সংরক্ষণের উদ্যোগ আছে।

কিন্তু স্থানীয় সাংবাদিকতার ইতিহাস অনেকটাই অনথিভুক্ত।

ভোলায় একটি ডিজিটাল মিডিয়া ও ওরাল হিস্ট্রি আর্কাইভ তৈরি করা যেতে পারে।

প্রবীণ সাংবাদিকদের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার ধারণ করা যেতে পারে।

পুরোনো সংবাদপত্র স্ক্যান করা যেতে পারে।

স্থানীয় প্রেসক্লাবের পুরোনো কার্যবিবরণী, ছবি, সাংবাদিকদের পরিচয় ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন ডিজিটাল করা যেতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ বিভাগ, স্থানীয় সংবাদমাধ্যম, প্রেসক্লাব, নাগরিক সংগঠন ও তরুণ সাংবাদিকেরা যৌথভাবে এ কাজ করতে পারেন।

এটি নস্টালজিয়ার প্রকল্প নয়।

এটি তথ্যের অবকাঠামো।

কারণ যে সমাজ নিজের স্থানীয় ইতিহাস সংরক্ষণ করে না, সে সমাজ ভবিষ্যতে নিজের সত্য যাচাই করার ক্ষমতাও হারায়।

সাংবাদিকতার শেষ প্রশ্ন

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন সংবাদ লিখতে পারে।

ভিডিও কেটে দিতে পারে।

অডিও ট্রান্সক্রাইব করতে পারে।

ছবি বিশ্লেষণ করতে পারে।

কয়েক সেকেন্ডে হাজার পৃষ্ঠার নথি পড়ে দিতে পারে।

তাহলে সাংবাদিকের কাজ কী?

এম. এ. তাহেরের জীবন সম্ভবত তার একটি সহজ উত্তর দেয়।

সাংবাদিকের কাজ হলো দেখা।

শুধু চোখ দিয়ে নয়।

সমাজকে দেখা।

কে কথা বলতে পারছে না, তা দেখা।

কাকে কেউ শুনছে না, তা দেখা।

কার জমি নদীতে গেল, কার সন্তান স্কুলে যেতে পারছে না, কার এলাকায় রাস্তা নেই, কার ওপর অন্যায় হলো, কার কথা ক্ষমতার টেবিলে পৌঁছাচ্ছে না, তা দেখা।

প্রযুক্তি তথ্য তৈরি করতে পারে।

কিন্তু কোন তথ্য গুরুত্বপূর্ণ, সেই নৈতিক সিদ্ধান্ত এখনো মানুষকেই নিতে হয়।

এম. এ. তাহের, বি.এ.-এর সাংবাদিকতার ছয় দশক তাই শুধু অতীতের গল্প নয়।

এটি ভবিষ্যতের সাংবাদিকতার জন্যও একটি সতর্কবার্তা।

সাংবাদিকতা যদি মাঠ হারায়, মানুষ হারায় এবং ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার শক্তি হারায়, তাহলে প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, সাংবাদিকতা দরিদ্র হয়ে যাবে।

আর যদি সাংবাদিকতা মানুষের দিকে ফিরে তাকাতে পারে, তাহলে একটি নদীভাঙনের খবরও ইতিহাস হয়ে উঠতে পারে।

এম. এ. তাহেরের জীবন তারই প্রমাণ।

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।