ভোলার পাঙ্গাশিয়ায় প্রায় এক একর জমির ফলদ ও বনজ বৃক্ষ কেটে নিয়েছে দূর্বৃত্তরা
গরুর মাংসের দাম ৫শ টাকায় নামাতে চায় সরকার

চড়া পশু খাদ্য মূল্য, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল, দানাদার নির্ভরতা, কাঁচাঘাসের ব্যবহার কম করার কারণে বাড়ছে গরুর মাংসের দাম। ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। গরুর মাংসের উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি উৎপাদন খরচ কমিয়ে ভোক্তার হাতে ৫শ থেকে সাড়ে পাঁচশ টাকায় গরুর মাংস পৌছে দিতে কাজ শুরু করেছে প্রাণীসম্পদ গবেষণা ইন্সটিটিউট (বিএলআরআই)।
বিএলআরআইয়ের গবেষণার তথ্য বলছে, ২০১৫ সালের পর থেকে চাহিদার তুলনায় গরুর মাংস উৎপাদনের সক্ষমতা কমতে থাকে। তবে নানা প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বড় বড় উদ্যোক্তারা মাংস উৎপাদনে আসায় এই সক্ষমতা ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে। যার ধারবাহিতকায় ২০২৩ সালে এসে দেশে গরুর মাংসের উৎপাদন চাহিদার চেয়ে ২১ শতাংশ বেড়ে যায়। বাড়তি উৎপাদনের এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলেও সংকট তৈরি হয়েছে ভোক্তা পর্যায়ে। শুধুমাত্র বাড়তি দামের কারণে গরুর মাংসের খাওয়া কমে গেছে প্রায় ২০ শতাংশ। এই সংকেটের মূলে রয়েছে বাড়তি উৎপাদন খরচ। ২০১৫ সালের পর থেকে দানাদার খাবারের দাম বেড়েছে অন্তত ১৫০গুণ, যার প্রভাব পড়েছে মাংসের দামে। ২০১৫ ও ২০১৬ সালে গরুর মাংস বিক্রি হয়েছে যথাক্রমে ২৮০ টাকা এবং ৪০০ টাকা কেজি দরে। যা বর্তমান সময়ে এসে বিক্রি হচ্ছে ৮৫০ -৮৮০ টাকায়।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, অস্ট্রেলিয়ার উৎপাদিত নেপিয়ার ঘাস নিয়ে আমাদের বিএলআরআই গবেষণা করছে। এই ঘাস শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বে সমাদৃত হবে। এই ঘাসে ১৮ শতাংশ প্রোটিন রয়েছে। বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ার সহযোগিতায় এই ঘাস যদি খামারি পর্যায়ে উৎপাদন ও ব্যবহার করতে পারে তাহলে আমাদের পশু খাদ্যে ব্যাপক পরিবর্তন আনবে। এই ঘাস খরা ও লবন সহিষ্নু হওয়ায় দেশের সব জায়গায় চাষ করা সম্ভব। খামারি পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে পারলে দানাদার খাদ্যের ব্যবহার কমে যাবে। ফলে বাড়বে মাংস ও দুধ উৎপাদন। খাদ্য খরচ কমার পাশাপাশি কমবে গরুর মাংস ও দুধের দাম।
এ বিষয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, দেশে খামারির সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। বাড়ছে দেশে পশু উৎপাদনের সংখ্যাও। বাংলাদেশ এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত পশু ও মাংস বিদেশে রপ্তানির লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে। তবে গরুর মাংস যাতে সাধরণ মানুষের ক্রয় সীমার মধ্যে রাখা যায় সে জন্য আমরা কাজ করছি। পশুপালনের সবচেয়ে বড় ব্যয় খাদ্য খাতে। খাদ্যের উচ্চমূল্যের কারণে পশুর দামও বৃদ্ধি পায়। তাই মাংসের দাম কমাতে সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। অস্ট্রেলিয়ার সহযোগিতায় উন্নত জাতের ঘাস উৎপাদন প্রকল্প চালু করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ৮৩৫ জন ক্ষুদ্র খামারিকে ঘাস উৎপাদনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তিনি আরো বলেন, উন্নত ঘাস ব্যবহারের ফলে পশুর খাদ্য ব্যয় কমবে এবং দুধ উৎপাদনও বৃদ্ধি পাবে। কমবে দানাদার খাদ্য নির্ভরতা। এ কারণে ঘাসভিত্তিক পশুপালনে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
তিনি আশা করেন, খাদ্য উৎপাদন ব্যয় কমানো গেলে ধীরে ধীরে গরুসহ অন্যান্য পশুর মাংসের দামও কমে আসবে। বেসরকারি খাতের কিছু প্রতিষ্ঠান সীমিত পরিসরে মাংস রপ্তানি করছে। সরকার এ খাতে বড় খামারিদের উৎসাহ ও সহযোগিতা দেবে।
গবেষকরা বলছে, এই অবস্থা থেকে গরুর মাংসের দাম কমানোর একমাত্র উপায় হচ্ছে খাদ্যের দাম কমিয়ে আনা। এজন্য দেশব্যপি বড় বড় কোম্পানিগুলোর সরবরাহ করা দানাদার খাদ্যের উপর থেকে নির্ভরশীলতা কমিয়ে এনে উন্নত জাতের ঘাসের উপর নির্ভরতা বাড়াতে হবে। কারণ ঘাসের উৎপাদন খরচ একেবারেই কম এবং প্রোটিনের উৎস হিসেবে দানাদার খাবারের চেয়েও বেশি কার্যকরী। গবেষকরা বলছেন, গরু পালনে দানাদার খাবার থেকে বেরিয়ে ঘাস নির্ভর হতে হবে। নতুন প্রযুক্তিতে নেপিয়ার ঘাসের কথা বলা হচ্ছে, যদিও তা বেশ আগে থেকেই সীমিত পরিসরে দেশে চাষ হচ্ছে। যেখানে নেপিয়ার ঘাসের সঙ্গে দানাদার খাদ্য থাকবে মাত্র শূণ্য দশমিক ৫ শতাংশ। এই ব্যবস্থাপনাতেই কমে আসবে মাংসের উৎপাদন খরচ, কমবে দাম।
জানা গেছে, বিএলআরআই আগামী অর্থবছরে গরুর মাংসের উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনার জন্য ‘টেকসই ও কার্বন নিরপেক্ষ গরুর মাংস উৎপাদন’প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। অষ্ট্রেলিয়ার বিশেষজ্ঞদের কারিগরি সহযোগীতায় এই প্রকল্পের কর্মপরিকল্পনা সাজিয়েছেন বিএলআরআইয়ের সিনিয়র সায়েন্টিফিক অফিসার (এসএসও- বায়োটেকনোলজি বিভাগ) ড. মোহাম্মদ খাইরুল বাশার।
খাইরুল বাশার বলেন, গরুর মাংসের দাম কমাতে হলে দানাদার খাদ্য থেকে বেরিয়ে আসার কোন বিকল্প নেই। খামারে ৫শ থেকে সাড়ে পাঁচশ টাকায় গরুর মাংসের উৎপাদন নিশ্চিত করাই এই প্রকল্পের মূল উদ্যেশ্য। এখানে বাংলাদেশ ও অষ্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞানীদের গবেষণার প্রতিফলন ঘটবে এবং অষ্ট্রেলিয়া থেকে কারিগরি সুবিধা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, এই নেপিয়ার ঘাসে যখন ৬-৭ পাতা হয় তখন ঘাসে ১৫-১৬ শতাংশ প্রোটিন এবং ৯.০-৯.৫ শতাংশ মেগাজুল মেটাবলিক এনার্জি এবং এর হজমযোগ্যতা ৬০ শতাংশের বেশি রয়েছে।
এই গবেষক আরো জানান, বর্তমানে সাড়ে ৬ কেজি খাবার খেয়ে এক কেজি মাংস বাড়ে গরুর শরীরে। দানাদার খাবার ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে এক কেজি মাংসের উৎপাদন খরচ পড়ছে ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা। দানাদার খাবারের জায়গায় যদি নেপিয়ার ঘাস প্রতিস্থাপন করা হয় তাহলে এই খরচ এসে দাড়াবে ৫শ থেকে সাড়ে পাঁচশ টাকায়। কারণ, ঘাসের উৎপাদন ব্যয় অনেক কম। আবার এটি প্রোটিনের চাহিদা পূরণের একটি বড় উৎস। প্রোটিনের পাশাপাশি গরুকে শক্তিশালী করতে ঘাসের সঙ্গে মাত্র শূণ্য দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত দানাদার খাবার যেমন ভুট্টা, গমের মত পণ্যগুলো ব্যবহার করা হবে। যাতে করে আর কোম্পানিগুলোর দানাদার খাবারের উপর নির্ভরতা তৈরি করতে না হয়।
জানা গেছে, এক কেজি নেপিয়ার সব খরচ মিলিয়ে দাম পড়ে ১৬ টাকা। সে হিসেবে ৬ দশমিক ৫ কেজি ঘাসের দাম পড়ে ১০৪ টাকা এবং এর সঙ্গে অন্যান্য পরিচালন ব্যয় ৩২ টাকা ধরলে মোট দাম দাড়ায় ১৩৬ টাকা। অর্থাৎ ১৩৬ টাকা খরচের বিপরীতে ১ কেজি ওজন পাবে গরু। এখান থেকে মাংস আসবে ৫০০-৫৫০ গ্রাম। অর্থাৎ পুরো এক কেজি মাংসের জন্য খরচ হবে ২৭২ টাকা। অপরদিকে সাড়ে ৬ কোজি দানাদার খাদ্যের দাম পড়ে প্রায় ৩০০ টাকা। তবে খামারিরা সাধারনত ৩ থেকে ৪ মাস মোটাতাজা করে গরু বিক্রি করে থাকেন। এই হিসেবে এক কেজি মাংসের মোট খরচ ধরা হবে ২৭২ এর দ্বিগুণ অর্থাৎ ৫৪৪ টাকা।
তবে বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে কৃষি জমির স্বল্পতায় ঘাস উৎপাদন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এজন্য চরাঞ্চলের পতিত জমিগুলো ব্যবহার করা যায় কিনা তা আলোচনায় রয়েছে। এভাবে সমন্বিত একটি পরিকল্পনা ও প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে বিজ্ঞানিরা মাংসের দাম কমিয়ে আনতে চাচ্ছেন। জানা যায়, গরু পালনের ক্ষেত্রে ৭০ভাগ খরচ হচ্ছে খাবারের এবং বাকি ৩০ শতাংশে পরিচালন ব্যয়।
