জামাই বাড়ি বেড়াতে গিয়ে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল শাশুড়ির
ভোলায় গ্যাস আছে, বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে তবু লোডশেডিং কেন ?

চাহিদার চেয়ে প্রায় চারগুণ বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করেও তীব্র লোডশেডিং-এ নাকাল দ্বীপ জেলা ভোলা। চাহিদামতো বিদ্যুৎ না পাওয়ায় একদিকে যেমন সাধারণ জনজীবন চরম দুর্ভোগে পড়েছে, অন্যদিকে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
ভোলায় প্রায় সাড়ে চারশ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, অন্যদিকে বিদ্যুতের চাহিদা সর্বোচ্চ ১২০ মেগাওয়াট। তার পরেও বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা থেকে দ্বীপবাসীদের মুক্তি নেই। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ দ্বীপবাসী।
দেশের বিভিন্ন এলাকার কেন্দ্রগুলো জ্বালানি সংকটে ভুগলেও এই ভোলার কেন্দ্রগুলোর এই সমস্যা নেই। এই জেলা পাওয়া গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন চালু আছে, সেই গ্যাস অন্য জেলায় পাঠানোর পাইপলাইনও নেই। ফলে এই গ্যাস শুধু ভোলাতেই ব্যবহার করতে হয়।
জেলার বোরহানউদ্দিনের দক্ষিণ কুতুবা এলাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) মালিকানাধীন ‘ভোলা-১’ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ২২৫ মেগাওয়াট।
বোরহানউদ্দিনেই রয়েছে নূসতান নামের ২২০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার আরও একটি ডুয়েল-ফুয়েল কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্ল্যান্ট।
খেয়াঘাট এলাকায় ৪০ মেগাওয়াটের আরও একটি রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, যেটি চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। এটি আবার চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে, ফের চালু হলে জেলায় বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা হবে ৪৮৫ মেগাওয়াট।
ভোলার সাত উপজেলার মধ্যে ৬টিতে বিতরণ সংস্থা ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ওজোপাডিকো) ও পল্লী বিদ্যুৎ মিলিয়ে গ্রাহক সংখ্যা ৫ লক্ষাধিক। ওজোপাডিকোর দৈনিক চাহিদা ২২ থেকে ৩০ মেগাওয়াট, পল্লী বিদ্যুতের চাহিদা ৭০ থেকে ৯০ মেগাওয়াট।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক শাহ মো. রাজ্জাকুর রহমান টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, “জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত সরবরাহ না পাওয়ায় আমরা বাধ্য হয়েই লোডশেডিং দিচ্ছি। বর্তমানে দিনে ও রাতে মিলিয়ে প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ লোডশেডিং রাখতে হচ্ছে।”
ওজোপাডিকোও চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ পায় না। আর চাহিদা ও যোগানের পার্থক্যের কারণে শহর থেকে গ্রাম সব জায়গায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
ভোলাবাসী মানতেই পারে না, তাদের গ্যাসে উৎপাদিত বিদ্যুৎ স্থানীয় চাহিদা পূরণ না করে অন্য এলাকা আলোকিত করতে পাঠানো হয়।
ইলিশা বরফ কলের সত্ত্বাধিকারী মোর্শেদ আলম আক্ষেপ করে বলেন, “ভোলার বিদ্যুৎ দিয়ে অন্য জেলা চলে। অথচ ভোলায় তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে আমাদের বরফ কলের ব্যবসা এখন বন্ধের পথে।”
লালমোহনের ব্যবসায়ী রিজভী সাকিল বলেন, “লোডশেডিং তো এখন প্রতিদিনের নিয়মে পরিণত হয়েছে। আমাদের পুরো ব্যবসাটাই বিদ্যুৎনির্ভর, কিন্তু যে হারে লোডশেডিং হচ্ছে তাতে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলা ছাড়া উপায় নেই।”
ভোলার বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর একটি বিশেষ সুবিধা আছে। দেশে গ্যাসভিত্তিক অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র জ্বালানির অভাবে বন্ধ থাকলেও এই জেলার চিত্র উল্টো। এখানে গ্যাস সরবরাহের কোনো সংকট তো নেই, উল্টো চাহিদা অপর্যাপ্ত থাকায় সবগুলো গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদনই করা হয় না।
রাষ্ট্রীয় তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান এবং উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের হিসাবে ভোলায় বর্তমানে ১ দশমিক ৭৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মজুত আছে। এর পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে। ১৯৯৫ সালে ভোলায় প্রথম শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে বাপেক্স। সেখান থেকে গ্যাস উৎপাদন শুরু হয় ২০০৯ সালে। ২০১৮ সালে আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্র ভোলা নর্থ এবং ২০২৩ সালে আবিষ্কৃত ইলিশা থেকে এখনও উৎপাদন শুরু হয়নি।
গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মোট দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ১২২ মিলিয়ন ঘনফুট। তবে স্থানীয় চাহিদা সীমিত থাকায় এবং জাতীয় পাইপলাইন না থাকায় বর্তমানে শাহবাজপুরসহ উৎপাদনে থাকা ক্ষেত্রগুলো থেকে প্রতিদিন প্রায় ৯০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন ও সরবরাহ করা হয়। বাকি গ্যাস অব্যবহৃত বা উদ্বৃত্ত থাকে।
ভোলা থেকে গ্যাসের পাইপলাইন করা বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হবে না বিবেচনায় সেই উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তবে এখান থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে সেই বিদ্যুৎ লাইনে করে জাতীয় গ্রিডে নিয়ে যাওয়া হয়।
ভোলা শহরের মুসলিম পাড়ার বাসিন্দা দিলরুবা জেসমিন টাইমসকে বলেন, “ভোলা থেকে প্রতিদিন জাতীয় গ্রিডে প্রায় সাড়ে চারশত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দেয়া হয়। অথচ ভোলায় লোডশেডিং। এ যেন বিদ্যুতের দেশে বিদ্যুতের আকাল।”
