সর্বশেষঃ

দক্ষিণ শাহবাজপুর থেকে ভোলা: নদী, সংগ্রাম আর সম্ভাবনার ইতিহাস

বাংলাদেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ দ্বীপ জেলা ভোলা। মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীবেষ্টিত এ জেলার ইতিহাস শুধু একটি ভূখণ্ডের নয়, বরং নদীভাঙন, দুর্যোগ, সংগ্রাম ও সম্ভাবনারও ইতিহাস। সময়ের পরিক্রমায় দক্ষিণ শাহবাজপুর নামে পরিচিত জনপদটি আজ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় জেলা হিসেবে পরিচিত।

ইতিহাসবিদ ও সরকারি তথ্যসূত্রে জানা যায়, একসময় ভোলা দক্ষিণ শাহবাজপুর নামে পরিচিত ছিল। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর পলিমাটি জমে ধীরে ধীরে এ দ্বীপাঞ্চলের সৃষ্টি হয়। নদীর গতিপথ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নতুন চর জেগেছে, আবার বহু এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।

ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৪৫ সালে দক্ষিণ শাহবাজপুর নোয়াখালী জেলার অধীনে একটি সাব-ডিভিশন হিসেবে প্রশাসনিক স্বীকৃতি পায়। পরে ১৮৬৯ সালে এটি বরিশাল জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৮৭৬ সালে প্রশাসনিক সদর দপ্তর দৌলতখান থেকে বর্তমান ভোলা শহরে স্থানান্তর করা হয়। দীর্ঘ প্রশাসনিক পথচলার পর ১৯৮৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ভোলা পূর্ণাঙ্গ জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

ভোলা নামকরণ নিয়েও রয়েছে নানা জনশ্রুতি। সবচেয়ে প্রচলিত মত অনুযায়ী, ভোলা গাজী নামে এক ব্যক্তির নাম থেকেই জেলার নামকরণ হয়েছে। তবে এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক দলিল সীমিত হওয়ায় বিষয়টি এখনও লোককথা হিসেবেই বিবেচিত।

১৯৭০ সালের ১১ নভেম্বরের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ভোলার ইতিহাসে সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়। ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাসে অসংখ্য মানুষের প্রাণহানি ঘটে এবং পুরো উপকূলীয় জনপদ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। এই দুর্যোগ বাংলাদেশের ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা হিসেবে বিবেচিত।

বর্তমানে ভোলা সাতটি উপজেলা নিয়ে গঠিত। জেলার অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি কৃষি, মৎস্য এবং প্রাকৃতিক গ্যাস। শাহবাজপুর, ভোলা নর্থ ও ইলিশা এই তিনটি গ্যাসক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাসের মজুত রয়েছে। একই সঙ্গে মনপুরা, চর কুকরি-মুকরি, তারুয়া সমুদ্রসৈকতসহ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর বিভিন্ন পর্যটন এলাকা ভোলার পরিচিতিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাকৃতিক সম্পদ, নদীপথ, পর্যটন সম্ভাবনা এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে কাজে লাগাতে পারলে ভবিষ্যতে ভোলা দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত হতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন পরিকল্পিত শিল্পায়ন, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং নদীভাঙন প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ।

শত বছরের নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে আজও ভোলা তার স্বকীয়তা ধরে রেখেছে। নদীর বুকে জেগে ওঠা এই জনপদ এখন উন্নয়ন ও সম্ভাবনার নতুন অধ্যায়ের অপেক্ষায়।

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।