নয় মাস পর আবার শিল্পে সিএনজি সরবরাহে ফিরল ইন্ট্রাকো, ভোলার গ্যাসে স্বস্তির আশা

প্রায় নয় মাসের বিরতির পর আবারও শিল্প খাতে সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাস (সিএনজি) সরবরাহ শুরু করেছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ইন্ট্রাকো রিফুয়েলিং স্টেশন পিএলসি। বিস্ফোরক অধিদপ্তরের অনুমোদনের পর কোম্পানিটির গ্যাসবাহী টিউব ও ক্যাসকেড সিলিন্ডার ট্রেইলার পুনরায় চালু হওয়ায় ঢাকা, গাজীপুর ও টাঙ্গাইলের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গ্যাস পরিবহন স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে।
দেশে চলমান গ্যাস সংকটের মধ্যে এ সিদ্ধান্ত শিল্প উৎপাদনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। বিশেষ করে জাতীয় গ্যাস পাইপলাইন নেটওয়ার্কের বাইরে থাকা শিল্পকারখানাগুলোর জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিস্ফোরক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ মহসিন উদ্দিন বলেন, চীনের প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষাগারে ইন্ট্রাকোর ব্যবহৃত যানবাহনের কারিগরি সক্ষমতা যাচাই করা হয়েছে। পরীক্ষায় সেগুলো নিরাপদভাবে গ্যাস পরিবহনের উপযোগী বলে প্রমাণিত হওয়ায় গ্যাস পরিবহনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকটের কারণে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
এর আগে রাষ্ট্রায়ত্ত সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি থেকে ভোলার গ্যাস সংগ্রহ করে ইন্ট্রাকো বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করত। তবে গত বছরের নভেম্বরে লাইসেন্সসংক্রান্ত জটিলতায় বিস্ফোরক অধিদপ্তরের নির্দেশে ৩৫টি যানবাহন প্রত্যাহার করতে বাধ্য হওয়ায় কোম্পানিটির গ্যাস পরিবহন কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।
পরে চলতি বছরের জুলাইয়ে সংকুচিত গ্যাস পরিবহনের জন্য ১৮টি টিউব-ট্রেইলার ট্রাকের লাইসেন্স দেওয়া হয়। সর্বশেষ আরও ২০টি ক্যাসকেড সিলিন্ডার ট্রেইলারকে ছয় মাসের জন্য গ্যাস পরিবহনের অনুমতি দেওয়ায় কোম্পানিটি পূর্ণ সক্ষমতায় কার্যক্রম শুরু করতে সক্ষম হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইন্ট্রাকোর ব্যবহৃত টিউব ও ক্যাসকেড সিলিন্ডার ট্রেইলারগুলো চীনের Enrich CNG তৈরি করেছে এবং Hartfast Stream Boiler সেগুলোর মান যাচাই ও সনদ দিয়েছে। বাংলাদেশে এ ধরনের বিশেষায়িত যানবাহনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ না থাকায় বিস্ফোরক অধিদপ্তর, ইন্ট্রাকো এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি প্রতিনিধি দল চীন সফর করে প্রস্তুতকারক ও সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে সরেজমিন পরিদর্শন করে।
মহাপরিচালক মহসিন উদ্দিন বলেন, প্রতিনিধি দল পরিদর্শনের পর নিশ্চিত হয়েছে যে যানবাহনগুলো নিরাপদ। তবে বাকি ২০টি ক্যাসকেড সিলিন্ডার ট্রেইলারের স্থায়ী লাইসেন্স দিতে বিদ্যমান বিধিমালায় সংশোধন প্রয়োজন হবে।
ইন্ট্রাকোর কোম্পানি সচিব জি. এম. সালাহউদ্দিন বলেন, বর্তমানে বাজারের চাহিদার তুলনায় কম পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ করা হলেও জাতীয় গ্যাস পাইপলাইন নেটওয়ার্কের বাইরে থাকা শিল্পকারখানাগুলোর জন্য কোম্পানিটি এখনো গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহকারী।
সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানির সঙ্গে ১০ বছরের চুক্তির আওতায় ইন্ট্রাকো ঢাকা, গাজীপুর ও টাঙ্গাইলের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ করছে। চুক্তি অনুযায়ী শুরুতে প্রতিদিন ৫০ লাখ ঘনফুট (৫ এমএমসিএফডি) গ্যাস পরিবহনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও ভবিষ্যতে তা ২ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট (২৫ এমএমসিএফডি) পর্যন্ত বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে কার্যক্রম স্থগিত হওয়ার আগে কোম্পানিটি দৈনিক প্রায় ৩৫ লাখ ঘনফুট (৩.৫ এমএমসিএফডি) গ্যাস পরিবহন করছিল।
কোম্পানিটি সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানির কাছ থেকে প্রতি ইউনিট গ্যাস ১৭ টাকা ১০ পয়সা দরে কিনে সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাস প্রতি ইউনিট ৪৭ টাকা ৬০ পয়সা দরে শিল্প গ্রাহকদের কাছে সরবরাহ করে।
গ্যাস সরবরাহ প্রক্রিয়ায় প্রথমে ভোলার গ্যাসক্ষেত্র থেকে উদ্বৃত্ত গ্যাস সংগ্রহ করে সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি। পরে ইন্ট্রাকো সেটি সংকুচিত করে উচ্চচাপের ক্যাসকেড সিলিন্ডার ট্রেইলারে শিল্পাঞ্চলে পরিবহন করে। গন্তব্যে পৌঁছানোর পর রেগুলেটিং কন্ট্রোল ইউনিট (আরসিইউ) গ্যাসের চাপ কমিয়ে শিল্পকারখানার বয়লার ও বিদ্যুৎ উৎপাদন যন্ত্রে ব্যবহারের উপযোগী করে।
এদিকে আর্থিক অবস্থার অবনতির কারণে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দেশের দুই পুঁজিবাজারে ইন্ট্রাকোর শেয়ার ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে অবনমিত করা হয়। তবে দীর্ঘ বিরতির পর গ্যাস পরিবহন কার্যক্রম পুনরায় শুরু হওয়ায় কোম্পানিটির ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং শিল্প খাতে জ্বালানি সরবরাহ—উভয় ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
