সর্বশেষঃ

বৃষ্টিতেই ধস মনপুরার হাজার কোটি টাকার বেড়িবাঁধে, নিম্নমানের কাজের অভিযোগ

আবদুর রহমান সোয়েব, মনপুরা :

ভোলার মনপুরায় উপকূল রক্ষায় নির্মাণাধীন প্রায় ১ হাজার ১৭০ কোটি টাকার টেকসই বেড়িবাঁধ প্রকল্পের বিভিন্ন স্থানে ধস ও বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। টানা বৃষ্টির পর নির্মাণাধীন বাঁধের একাধিক অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং যথাযথ তদারকির অভাবেই বারবার ধসের ঘটনা ঘটছে। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বলছে, অতিবৃষ্টির কারণে কিছু স্থানে ক্ষতি হয়েছে এবং দ্রুত মেরামতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পাউবো সূত্র জানায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভোলা জেলার মুজিবনগর ও মনপুরা উপকূলীয় বাঁধ পুনর্বাসন, নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং তীর সংরক্ষণে ৫০ দশমিক ৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রকল্প নেওয়া হয়। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ১৭০ কোটি টাকা। প্রকল্পের বিভিন্ন অংশ বাস্তবায়ন করছে ছয়টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান—এনবিই, ওটিবিএল, জিসিএল, এলএকে এসএসএ, পিডিএল ও ওয়েস্টার্ন।

স্থানীয়দের দাবি, গত দেড় মাসে নির্মাণাধীন বাঁধের বিভিন্ন অংশে একাধিকবার ধসের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিবারই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ভেকু মেশিন দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অংশে তাৎক্ষণিক সংস্কার করেছে। কিন্তু কয়েক দিনের ব্যবধানে আবারও একই ধরনের ক্ষতি দেখা দিচ্ছে।

সর্বশেষ গত মঙ্গলবার ও বুধবারের টানা বৃষ্টিতে হাজিরহাট ইউনিয়নের ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম পাশে নির্মাণাধীন বাঁধের একটি অংশ ধসে পড়ে। ধসে পড়া বালু পাশের আমন ধানের জমিতে ছড়িয়ে পড়ায় এক কৃষকের ফসল নষ্ট হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, মনপুরা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড, হাজিরহাট ইউনিয়নের ২, ৩ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ড এবং দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়নের সূর্যমুখী এলাকায় নির্মাণাধীন বাঁধের বিভিন্ন অংশে ধস ও বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও কোথাও বাঁধের ঢাল ভেঙে বালু নিচে নেমে গেছে।

হাজিরহাট ইউনিয়নের সোনারচর এলাকার কৃষক বাপ্পী বলেন, “মেঘনা নদী থেকে আনা নিম্নমানের বালু দিয়ে বাঁধ নির্মাণ করায় সামান্য বৃষ্টিতেই ধসে পড়ছে। এতে আমার পুরো আমনের ক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে।”

স্থানীয় বাসিন্দা আকবর আলী, হান্নান মাঝি, রাকিব ও বনি আমিনের অভিযোগ, মূল ঠিকাদাররা নিজেরা কাজ না করে সাব-ঠিকাদারের মাধ্যমে কাজ করাচ্ছেন। এতে নির্মাণকাজের মান বজায় থাকছে না। তাঁদের আশঙ্কা, প্রকল্প শেষ হওয়ার আগেই যদি এমন অবস্থা হয়, তাহলে জলোচ্ছ্বাস বা বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে পুরো বাঁধ ঝুঁকিতে পড়বে।

তাঁরা আরও বলেন, গত বছর বাঁধ নির্মাণে অনিয়মের প্রতিবাদের সময় ছাত্রদল নেতা রাশেদের মৃত্যু হয়। একই বছরে মনপুরা ইউনিয়নের রামনেওয়াজ এলাকায় নির্মাণাধীন বাঁধের একটি গর্তে পড়ে ১০ বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়। এরপরও নির্মাণকাজে প্রয়োজনীয় সতর্কতা নিশ্চিত হয়নি বলে তাঁদের অভিযোগ।

অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী মো. তুহিন বলেন, “ক্ষতিগ্রস্ত অংশে ভেকু মেশিন দিয়ে সংস্কারকাজ চলছে। পাউবোর প্রকৌশলীদের উপস্থিতিতেই নির্ধারিত নকশা ও মান অনুযায়ী কাজ করা হচ্ছে।”

পাউবো ডিভিশন-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসফাউদদৌলা বলেন, “প্রকল্পের নির্মাণকাজ এখনো শেষ হয়নি। অতিবৃষ্টির কারণে কয়েকটি স্থানে গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যেই সংস্কারকাজ শুরু হবে।”

উপকূলের প্রায় দেড় লাখ মানুষের নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এ প্রকল্পে বারবার ধসের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। নির্মাণকাজের গুণগত মান নিশ্চিত এবং কার্যকর তদারকির দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।