সর্বশেষঃ

ভোলার গ্যাস মূল ভূখণ্ডে নিতে এলএনজি ও দুই পাইপলাইন রুটে সম্ভাব্যতা যাচাই

মোঃ সামিরুজ্জামান, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টর

ভোলা থেকে গ্যাস মূল ভূখণ্ডে আনার উপায় নিয়ে সরকার তিনটি বিকল্প সামনে রেখে এগোচ্ছে। স্বল্পমেয়াদে এলএনজি আকারে গ্যাস সরবরাহ এবং দীর্ঘমেয়াদে বরিশাল হয়ে ঢাকা বা খুলনা পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই করবে গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল)।

মঙ্গলবার জ্বালানি বিভাগের এক বৈঠকে জিটিসিএলকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বৈঠকে ভোলার উদ্বৃত্ত গ্যাস কীভাবে জাতীয় গ্যাস গ্রিড ও শিল্প খাতে ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়ে আলোচনা হয়।

উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ার সম্ভাবনা

দ্বীপজেলা ভোলায় বর্তমানে শাহবাজপুর, ভোলা নর্থ ও ইলিশা নামে তিনটি গ্যাসক্ষেত্র রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত ৯টি কূপ খনন করা হয়েছে। দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ১৯ কোটি ঘনফুট হলেও স্থানীয় চাহিদা সীমিত থাকায় বর্তমানে উত্তোলন হচ্ছে মাত্র ৭ থেকে ৮ কোটি ঘনফুট।

পেট্রোবাংলা আরও ১৫টি কূপ খননের পরিকল্পনা নিয়েছে। প্রস্তাবিত কূপগুলোর খনন শেষ হলে দৈনিক উৎপাদন আরও ৩০ থেকে ৪০ কোটি ঘনফুট বাড়তে পারে। বর্তমানে ভোলায় প্রায় ৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) গ্যাস মজুত রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে।

এলএনজিতে স্বল্পমেয়াদি সমাধান

সরকার ঢাকার শিল্পাঞ্চলের তীব্র গ্যাস সংকটের দ্রুত সমাধান হিসেবে ভোলার গ্যাস এলএনজি আকারে এনে সরবরাহের বিষয়টি অগ্রাধিকার দিচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী বেসরকারি বিনিয়োগে ভোলার গ্যাস তরলীকরণ করে জাহাজে মূল ভূখণ্ডে আনা হবে।

তবে এ পদ্ধতির ব্যয় নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনীহা রয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) উপস্থাপিত প্রস্তাব অনুযায়ী, এলএনজি করে ভোলার গ্যাস সরবরাহের সম্ভাব্য দাম প্রতি ঘনমিটার ৪৭ টাকা ৫০ পয়সা। বর্তমানে বিদ্যমান শিল্পের জন্য পাইপলাইনের গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটার ৩০ টাকা।

আগে ভোলা থেকে সিএনজি আকারে গ্যাস ঢাকায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু উচ্চ ব্যয়, পরিবহন জটিলতা ও সীমিত সক্ষমতার কারণে সেই প্রকল্প কার্যত ব্যর্থ হয়।

পাইপলাইনের দুটি রুট

দীর্ঘমেয়াদে পাইপলাইন নির্মাণের জন্য দুটি রুট বিবেচনায় রয়েছে। একটি রুট ভোলা থেকে বরিশাল হয়ে সরাসরি ঢাকার আমিনবাজার পর্যন্ত যাবে। অন্যটি বরিশাল হয়ে খুলনা পর্যন্ত সম্প্রসারিত হবে।

ভোলা থেকে বরিশাল পর্যন্ত ৬৫ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণে ২০২৩ সালে আনুমানিক এক হাজার ৩০০ কোটি টাকার প্রস্তাব দিয়েছিল জিটিসিএল। ঢাকার আমিনবাজার পর্যন্ত পাইপলাইনের মোট দৈর্ঘ্য হতে পারে প্রায় ১৭৫ কিলোমিটার। অন্যদিকে ভোলা-বরিশাল-খুলনা রুটের দৈর্ঘ্য হতে পারে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার।

সাম্প্রতিক উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে প্রথম ধাপে ভোলা-বরিশাল-খুলনা পাইপলাইন নির্মাণের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এ গ্যাস খুলনার রূপসা বিদ্যুৎকেন্দ্র, যশোর, খুলনা ও বরিশালের আবাসিক খাতে সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তীতে গ্যাসের মজুত ও উৎপাদন পর্যাপ্ত থাকলে বরিশাল থেকে ঢাকা পর্যন্ত পাইপলাইন সম্প্রসারণের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

ঢাকার শিল্পাঞ্চল বনাম স্থানীয় উন্নয়ন

শিল্প মালিকদের দাবি, দেশের সবচেয়ে তীব্র গ্যাস সংকট ঢাকা-গাজীপুর শিল্পাঞ্চলে। তাই ভোলার গ্যাসের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত শিল্প উৎপাদন সচল রাখা।

অন্যদিকে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ভোলার গ্যাস আগে স্থানীয় উন্নয়নেই ব্যবহার করা উচিত। ভোলায় সার কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিরামিক, কাচ, রাসায়নিক ও গ্যাসভিত্তিক ভারী শিল্প গড়ে তোলা হলে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন শিল্পবিপ্লব ঘটতে পারে।

জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তায় ভোলার গুরুত্ব

দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট, কিন্তু সরবরাহ করা যাচ্ছে মাত্র ২৬০ থেকে ২৬৫ কোটি ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১১৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থাকছে।

দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদনও ধারাবাহিকভাবে কমছে। এক সময় দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ছিল দৈনিক প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট, যা বর্তমানে নেমে এসেছে প্রায় ১৬৫ কোটি ঘনফুটে। সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানার উৎপাদনও ১৩০ কোটি ঘনফুট থেকে কমে ৮০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমেছে।

সাম্প্রতিক থ্রিডি সিসমিক জরিপে শাহবাজপুর থেকে ইলিশা পর্যন্ত প্রায় ৬০০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ২ দশমিক ৪২৩ টিসিএফ উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের সম্ভাবনা পাওয়া গেছে। চরফ্যাসন এলাকায় আরও ২ দশমিক ৬৮৬ টিসিএফ গ্যাসের সম্ভাবনার তথ্য মিলেছে।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (পরিকল্পনা) আব্দুল মান্নান পাটওয়ারী বলেন, ভোলার গ্যাস কীভাবে সর্বোত্তমভাবে কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে বিভিন্ন বিকল্প পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এলএনজি, পাইপলাইন এবং স্থানীয় শিল্পায়নের সম্ভাবনা যাচাই শেষে সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।