সর্বশেষঃ

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত শিল্পপার্কের দ্রুত বাস্তবায়ন চায় ভোলাবাসী

নাসির উদ্দিন লিটন ॥
দ্বীপজেলা ভোলায় গ্যাসের প্রাচুর্য থাকার পরও সময়োপযোগী পরিকল্পনার অভাবে গত তিন দশকে গড়ে ওঠেনি কাঙ্খিত শিল্প কারখানা। এতে অলস পড়ে আছে প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) গ্যাস। সন্ধান মিলছে নতুন আরও ২টি গ্যাসক্ষেত্রের। চাহিদার চেয়ে বেশি উৎপাদন ক্ষমতা নিয়ে ব্যবহারকারীর (শিল্প প্রতিষ্ঠানের) অপেক্ষায় বসে আছে বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানী। এতে উন্নয়ন বঞ্চিত হচ্ছে ভোলাবাসী। থমকে আছে বিপুল সংখ্যক কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনাও। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর ভোলায় শিল্প পার্ক করার ঘোষণায় নতুন করে গ্যাসভিত্তিক উন্নয়নের স্বপ্ন দেখছেন দ্বীপবাসী। তবে বিগত দিনের মতো আশ্বাসে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার বাস্তবায়ন চান তারা।
জানা গেছে, তিন দশক আগে ১৯৯৫ সালে ভোলার বোরহানউদ্দিনে শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্রের আবিস্কার করে বাপেক্স। যেখানে মজুত আছে প্রায় দুই টিসিএফ (দুই ট্রিলিয়ন ঘনফুট) গ্যাস। প্রায় ১৪ বছর পর ২০০৯ সালে শুরু হয় সেই গ্যাসের বাণিজ্যিক উত্তোলণ। বর্তমানে এ ক্ষেত্র থেকে দৈনিক উত্তোলণ ক্ষমতা ১২২ মিলিয়ন ঘনফুট। বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানীর মাধ্যমে বোরহানউদ্দিনে দুটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র, শেলটেক সিরামিক লিমিটেড, কাজী ফিড, প্রিয় অটো, এ্যাডভান্স অটোবিক্স, সাগর বেকারী, আল মদিনা ও জিকে টেডার্স সাতটি শিল্প কারখানা ও ২ হাজার ৩৪৪টি আবাসিক সংযোগে সরবরাহ করা হচ্ছে ৭০ থেকে ৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট। ইন্টাকো সিএনজি আকারে ঢাকায় নিচ্ছেন দৈনিক ১মিলিয়ন ঘনফুট। উদ্বত্ত থাকছে প্রায় ৫০মিলিয়ন ঘনফুট। এছাড়া ২০১৮ সালে ভোলা নর্থ ও ২০২৩ সালে ইলিশা-১ নামের আবিস্কৃত ক্ষেত্র দুটি থেকে গ্যাস উত্তোলণ শুরু হয়নি এখনো। গ্যাস সংযোগের জন্য বর্তমানে ২টি শিল্প প্রতিষ্ঠানের আবেদন প্রক্রিয়াধীন আছে। কাজ চলছে আবুল উলাইয়া টেক্সটাইল মিলস লি ও প্রাণ-আরএফএল সহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের।
এদিকে গ্যাসের মতো মূল্যবান প্রাকৃতি সম্পদ থাকার পর কাঙ্খিত উন্নয়ন থেকে পিছিয়ে রয়েছে ভোলাবাসী। হচ্ছে না বেকার সমস্যার সমাধান। বিগত সরকার সারকারখানা, ইপিজেড, এলএনজি স্টেশন ও জাতীয় গ্রিডে নেয়ার মতো প্রতিশ্রিুতির ফুলঝুরি ফুটালেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। পাইপ লাইনের মাধ্যমে গ্যাস অন্যত্র নেয়ার পরিবর্তে অথনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন ও কর্মসংস্থানকে গুরুত্ব দিয়ে ভোলাতেই ব্যয়সাশ্রয়ী শিল্পকারখানা করার দাবিতে আন্দোলণ সংগ্রাম করছে দীর্ঘবছর ধরে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় সংসদে ভোলাতেই ‘শিল্পপার্ক’ করার ঘোষণা দিলে হতাশা কেটে নতুন করে স্বপ্ন দেখা শুরু হয়। এছাড়া কমখরচে নৌপথে পণ্য পরিহন ও নিরবিচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎসহ শিল্প কারখানা স্থাপনে অনুকূল পরিবেশ কাজে লাগানোর দাবি স্থানীয়দের।
কনজুমার এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) ভোলা জেলা সভাপতি মো. সোলাইমান বলেন, শিল্প কারখানা করার সকল পরিবেশ ভোলায় রয়েছে। বিগত দিনে বহু উদ্যোক্তা এসেছে। কিন্তু পরবর্তীতে তার বাস্তবায়ন হয়নি। এর পিছনে সরকারের ব্যর্থতা রয়েছে। উন্নয়ন কর্মী মো. ইকরামুল আলম জানান, গত ১৭ বছর আমরা শুধু আশ্বাস শুনেছি ইকোনিক জোন হবে, মিল কারখানা হবে । বাস্তবে দেখা গেছে ঢাকা থেকে কর্মকর্তারা এসে সরেজমিন দেখে গেছেন কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি। বিভিন্ন উদ্যোক্তারা যখন ভোলায় এসেছে তখন বিশেষ শ্রেণি সিন্ডিকেট করে জমির দাম বাড়িয়েছে, প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। ফলে উদ্যাক্তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা বাস্তবায়নে যেন এমন কোন সিন্ডিকেট শিল্প কারখানা স্থাপনে বাঁধা সৃষ্টি করতে না পারে সেটি কঠোরহাতে দমন করবে হবে। গণমাধ্যম কর্মী আবদুর রহমান হেলালের ভাষ্য, গ্যাসের পাশাপাশি ভোলায় বিদ্যুৎ রয়েছে। নৌ পথের সহজ যোগাযোগ আছে। বর্তমান সরকার ও বিরোধীদল এখানে শিল্প পার্ক স্থাপনের বিষয়ে এক হয়েছে তাই এর বাস্তবায়ন চান তিনি।
জেলা বিএনপির সদস্য সচিব মো. রাইসুল আলম বলেন, ভোলার উন্নয়নের পাঁচটি দাবির অন্যতম গ্যাস ভিত্তিক শিল্পকারখানা স্থাপন। যার মাধ্যমে উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান দুটোই হবে। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে ‘শিল্পপার্ক’ স্থাপনের কাজ শুরুর দাবি জানান। এর মাধ্যমে গ্যাসের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি দেশের উন্নয়নের অবদান রাখার কথা জানান তিনি। এছাড়া উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা আশ্বাস দেন।
ভোলার গ্যাস খুলনা-বরিশাল নিয়ে শিল্পায়নকে বিপুল পরিমান অর্থের অপচয় বলে মনে করেনে ভোলা চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রীর সভাপতি ও জেলা পরিষদ প্রশাসক গোলাম নবী আলমগীর। তিনি বলেন, গ্যাস শুধু বরিশার পর্যন্ত নিতেই ১১শ’ কোটি টাকার খরচ হবে। এতো টাকা খরচ না করে ভোলাকেই শিল্পায়ন হিসাবে গড়ে তুলতে হবে। এতে ভোলার মানুষের পাশাপাশি দেশের মানুষ উপকৃত হবে। অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে এটা প্রধানমন্ত্রী অনুধাবন করেছেন। নৌপথের সুযোগ লাগানোর আহবান তার। সারকারখানা, কৃষি পণ্য সংরক্ষণ, ইপিজেড, বিদ্যুৎ কেন্দ্র সহ গ্যাসভিত্তিক শিল্প প্রতিষ্ঠার সুযোগের কথা জানান এ ব্যবসায়ী নেতা।
জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সদস্য সচিব ও প্রবীণ ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম খান বলেন, সম্পদের তুলনায় ভোলা উন্নয়নের সূচকে পিছিয়ে রয়েছে। এখন সময় এসেছে ভোলার উন্নয়নে সরকারকে এগিয়ে আসার। তিনি আরও জানান ১৯৯৩ সালে তৎকালিন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ভোলার গ্যাস অনুসন্ধান শুরু করেন। এরপর উত্তোলণ শুরু হলেও প্রয়োজনীয় উন্নয়ন হয়নি। তার উত্তোসূরী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিল্পপার্কের ঘোষণা দেয়াকে ইতিবাচক হিসাবে দেখছেন তিনি।
আর শিল্পকারখানা স্থাপনে সরকারে নির্দেশা পালনে সব ধরনের প্রস্ততির কথা জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক ডা. শামিম রহমান। তিনি বলেন, গ্যাসভিত্তিক উন্নয়ন ভোলাবাসীর প্রাণির দাবি। স্থানীয় প্রশাসন জমি বরাদ্দ সহ যা যা প্রয়োজন সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে। ছোট ইন্ডাষ্ট্রির পাশাপাশি ভাড়ি ইণ্ডাষ্ট্রি করার সযোগ রয়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগাতে দেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আকর্ষেণের গুরুত্ব দেন জেলা প্রশাসক।
গ্যাস সম্পদকে ঘিরে দ্বীপবাসীর উন্নয়নের স্বপ্ন অনেক দিনের। এখানকার গ্যাস শুধু উত্তোলণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সরকার গড়ে তুলবে শিল্প, বাড়বে দেশি-বিদেশী বিনিয়োগ, সৃষ্টি হবে নতুন কর্মসংস্থান এমন প্রত্যাশা ভোলার ২০ লাখ মানুষের।

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।