সর্বশেষঃ

জলাবদ্ধ জমিতে সবুজের বিপ্লব, সর্জান পদ্ধতিতে বদলে যাচ্ছে ভোলার কৃষির চিত্র

মোঃ সামিরুজ্জান, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার : 

ভোলার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে একসময় বর্ষা মানেই ছিল দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা। বছরের কয়েক মাস নিচু জমিগুলো পানিতে তলিয়ে থাকত। কৃষকেরা একটি ফসল ঘরে তোলার পর বছরের বাকি সময় জমি ফেলে রাখতে বাধ্য হতেন। ঝড়, জোয়ার আর বন্যার সঙ্গে লড়াই করে কৃষি ধরে রাখা ছিল তাঁদের নিত্যদিনের সংগ্রাম। সেই চিরচেনা দৃশ্য এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। যে জমিগুলো একসময় অনাবাদি পড়ে থাকত, আজ সেগুলোতেই বছরজুড়ে ফলছে নানা ধরনের সবজি, ফল ও গাছ আলু। একই জমির নালায় চাষ হচ্ছে মাছ। কৃষকের মুখে ফিরেছে হাসি, আর ভোলার কৃষিতে যুক্ত হয়েছে সম্ভাবনার নতুন এক অধ্যায়।

বাংলাদেশের বৃহত্তম দ্বীপ জেলা ভোলাকে জেলা প্রশাসন ‘কুইন আইল্যান্ড অব বাংলাদেশ’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে গড়ে ১০ থেকে ১৯ ফুট উঁচু এ জেলার চারপাশে মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদী, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। প্রকৃতিগত কারণে প্রতিবছর বর্ষাকালে জোয়ারের পানিতে জেলার বিস্তীর্ণ নিচু এলাকা তলিয়ে যায়। জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত অনেক জমিতে ফসল চাষ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। বছরের একটি বড় সময় জমি অনাবাদি থাকায় কৃষকের আয়ও ছিল সীমিত।

কিন্তু সেই বাস্তবতায় পরিবর্তনের বার্তা নিয়ে এসেছে সর্জান পদ্ধতি। জমির একটি অংশ উঁচু করে বেড তৈরি করে সেখানে সবজি, ফল ও অন্যান্য ফসলের আবাদ করা হয়। নিচু অংশে পানি ধরে রেখে চাষ করা হয় মাছ। ফলে একই জমি থেকে একসঙ্গে দুই ধরনের উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। কৃষকেরা বলছেন, আগে যেখানে বছরে একটি বা দুটি ফসল হতো, এখন প্রায় সারা বছরই জমি কাজে লাগানো যাচ্ছে। উৎপাদন যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে আয়ও।

ভোলা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা ড. শামীম আহমেদের ভাষ্য, সর্জান পদ্ধতি শুধু পতিত জমিকে উৎপাদনের আওতায় আনেনি, কৃষিকে ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক ভিত্তির দিকেও নিয়ে যাচ্ছে। একই জমিতে মাছ ও ফসল উৎপাদনের সুযোগ থাকায় কৃষকেরা কম সময়ে বেশি লাভ করতে পারছেন। তবে জেলার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখনো যোগাযোগব্যবস্থা। নদীনির্ভর পরিবহনের কারণে উৎপাদিত কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছানো যায় না। এতে ফসল সংগ্রহোত্তর ক্ষতির পরিমাণ ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তারপরও কৃষকেরা নতুন এই পদ্ধতির ওপর আস্থা রাখছেন।

চরফ্যাশন উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন সর্জান পদ্ধতির সবজি খামার। হাজারীগঞ্জ, চরমাদ্রাজ, আসলামপুর, জাহানপুর, আবদুল্লাহপুর ও আবুবকরপুর ইউনিয়নের মাঠজুড়ে লাউ, করলা, শসা, মরিচ, বেগুন, শিম, পেঁপেসহ নানা ধরনের সবজির সমারোহ। উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে প্রায় সাত হাজার হেক্টর জমিতে এই পদ্ধতিতে চাষাবাদ হয়েছে। কৃষকেরা ব্যস্ত ফসলের পরিচর্যায়। বর্ষার সময়ও যখন অন্য এলাকার অনেক জমি পানির নিচে চলে যায়, তখন এসব খামারে উৎপাদন অব্যাহত থাকে।

আসলামপুর ইউনিয়নের কৃষক আবুল কালামের জীবনেও এসেছে পরিবর্তন। বাবার কাছ থেকেই কৃষিকাজ শিখেছিলেন তিনি। তবে আগে বছরে দুইবারের বেশি চাষ করা যেত না, লাভও হতো সামান্য। কয়েক বছর ধরে সর্জান পদ্ধতিতে চাষ শুরু করেন। এবার আড়াই কানি জমিতে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ব্যয়ে লাউ, করলা ও শসার আবাদ করেছেন। বাজারদর অনুকূলে থাকলে তিন থেকে চার লাখ টাকা লাভের আশা করছেন। তাঁর মতে, সারা বছর চাষাবাদের সুযোগ থাকায় সংসারের আয়ও এখন অনেকটা নিয়মিত।

তবে উৎপাদন বাড়লেও বাজারে ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে কৃষকদের মধ্যে রয়েছে হতাশা। তাঁদের অভিযোগ, সবজির বাজারে একধরনের সিন্ডিকেটের কারণে প্রকৃত দাম থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে।

আসলামপুর ইউনিয়নের কৃষক মো. আব্বাস মীর বলেন, ‘সবজি চাষ করে যে লাভ হয়, সার, বীজ, কীটনাশক ও বাজারদরের ওপর যদি সিন্ডিকেট না থাকত, তাহলে আমরা আরও বেশি লাভবান হতে পারতাম।’

একই এলাকার কৃষক মো. কামরুল ইসলামও একই ধরনের অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, ‘ফসলের দাম নিয়ে যে সিন্ডিকেট চলে, সেটা যদি ভাঙা যেত, তাহলে কৃষকের লাভ আরও বাড়ত। একই সঙ্গে আমাদের এলাকায় আরও অনেক কৃষক সবজি চাষে আগ্রহী হতেন।’

এই পরিবর্তনের সুফল শুধু জমির মালিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। কৃষিকাজকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানও বেড়েছে। আবুল কালামের খামারে সারা বছর কয়েকজন শ্রমিক কাজ করেন। মৌসুমের ব্যস্ত সময়ে প্রতিদিন আরও ১০ থেকে ১৫ জন শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। খামারের শ্রমিক মোহাম্মদ জাহিদ বলেন, নিয়মিত কাজ পাওয়ায় তাঁর পরিবারের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।

চরফ্যাশনের আরেক কৃষক ইলিয়াসও একসময় নিচু জমিতে ধান চাষ করে বারবার ক্ষতির মুখে পড়তেন। ঝড়, বন্যা ও জলাবদ্ধতা তাঁর কৃষিজীবনকে অনিশ্চিত করে তুলেছিল। পরে স্থানীয় একটি উন্নয়ন সংস্থার কাছ থেকে প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা নিয়ে সর্জান পদ্ধতিতে সবজি চাষ শুরু করেন। এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি আয় করছেন। তাঁর মতো আরও অনেক কৃষক নতুন এই পদ্ধতির দিকে ঝুঁকছেন।

ভোলার কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার আরেকটি নাম গাছ আলু। চরফ্যাশনের আসলামপুরের কৃষক আবুল হাসেম ফরাজী গত বছর ৩২ শতাংশ জমিতে সর্জান পদ্ধতিতে গাছ আলু, মরিচ, শিম, বেগুন ও পেঁপের চাষ করেন। পাশাপাশি নালায় তেলাপিয়া ও সরপুঁটি মাছও চাষ করেন। মাছ বিক্রি করে প্রায় ৩০ হাজার টাকা এবং গাছ আলু বিক্রি করে প্রায় ৪০ হাজার টাকা আয় করেন। অন্যান্য ফসল মিলিয়ে তাঁর মোট লাভ দাঁড়ায় প্রায় দেড় লাখ টাকা।

ড. শামীম আহমেদ জানান, গাছ আলু বা মেটে আলু এমন একটি লতানো উদ্ভিদ, যার মাটির নিচে বড় আলু এবং কাণ্ডে ছোট আলু ধরে। উভয়টিই খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং বাজারে এর ভালো চাহিদা রয়েছে। সর্জানের আইলে এ ফসল খুব সহজেই বেড়ে ওঠে। তাঁর দাবি, ভোলাই সম্ভবত দেশের একমাত্র জেলা, যেখানে এত বড় পরিসরে সর্জান পদ্ধতিতে গাছ আলুর চাষ হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, সর্জান পদ্ধতির বিস্তারের ফলে ভোলার শস্যবিন্যাস ২৫৮ শতাংশে পৌঁছেছে। তিন ফসলি জমির পরিমাণ ৭০৪ হেক্টর থেকে বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৫৪ হেক্টর। চরাঞ্চলে শস্য নিবিড়তাও বেড়ে ১৯৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ নাজমূল হুদা বলেন, চরফ্যাশনের একাধিক ইউনিয়নে এখন ব্যাপকভাবে সর্জান পদ্ধতিতে চাষাবাদ হচ্ছে। এ পদ্ধতিতে বছরে প্রায় পাঁচবার পর্যন্ত ফসল উৎপাদন সম্ভব। বর্ষা মৌসুমে বাজারদর ভালো থাকায় কৃষকেরাও বেশি লাভবান হচ্ছেন।

তবে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃষিপণ্যের সুষ্ঠু বাজারব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিচ্ছে কৃষি বিভাগ। ভোলা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. খাইরুল ইসলাম মল্লিক বলেন, ‘সর্জান পদ্ধতি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সব ধরনের কারিগরি সহায়তা ও সহযোগিতা কৃষি বিভাগ দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন জরুরি। কৃষি বিপণন অধিদপ্তর যদি এ বিষয়ে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখে, তাহলে কৃষকেরা তাঁদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতভাবে পাবেন।’

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কন্দাল উন্নয়ন প্রকল্পসহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বিভিন্ন উদ্যোগ এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার এই পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা, সংরক্ষণ সুবিধা, বাজারজাতকরণ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা না গেলে কৃষকেরা তাঁদের উৎপাদনের পূর্ণ সুফল পাবেন না।

যে চরাঞ্চল একসময় বছরের পর বছর জলাবদ্ধতার কারণে কৃষকের হতাশার প্রতীক ছিল, সেই ভূখণ্ডেই এখন দেখা যাচ্ছে সবুজের নতুন সম্ভাবনা। সর্জান পদ্ধতি শুধু কৃষিপদ্ধতির পরিবর্তন নয়, এটি ভোলার হাজারো কৃষক পরিবারের জীবন ও জীবিকার পরিবর্তনেরও একটি গল্প। তবে এই পরিবর্তনকে টেকসই করতে হলে উৎপাদনের পাশাপাশি বাজারব্যবস্থা, অবকাঠামো ও কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। উপযুক্ত নীতিগত সহায়তা ও বাজারসংযোগ নিশ্চিত করা গেলে ভোলার এই অভিজ্ঞতা দেশের অন্যান্য উপকূলীয় ও চরাঞ্চলের জন্যও একটি কার্যকর কৃষি মডেল হয়ে উঠতে পারে।

 

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।