সর্বশেষঃ

তরমুজের খোসায় নতুন সম্ভাবনা, খাদ্য ও ওষুধ শিল্পে হতে পারে মূল্যবান কাঁচামাল

দেশের দক্ষিণাঞ্চলে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ তরমুজ উৎপাদিত হলেও ফলটির একটি বড় অংশ শেষ পর্যন্ত বর্জ্যে পরিণত হয়। ভোক্তারা লাল শাঁস খাওয়ার পর খোসা ও বিচি ফেলে দেওয়ায় সৃষ্টি হয় বিপুল জৈব বর্জ্য। তবে কৃষি ও খাদ্যপ্রযুক্তি গবেষকদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা, গবেষণা ও প্রক্রিয়াজাত প্রযুক্তি নিশ্চিত করা গেলে এই খোসা ও বিচি থেকেই তৈরি হতে পারে খাদ্যপণ্য, পশুখাদ্য, জৈবসার, এমনকি ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল।

বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা ও বরগুনাসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় উৎপাদিত একটি তরমুজের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই খোসা। এসব খোসা দ্রুত পচে পরিবেশে দুর্গন্ধ ও মিথেন গ্যাস সৃষ্টি করে। অথচ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তরমুজের সাদা খোসা দিয়ে আচার, জ্যাম, মোরব্বা ও অন্যান্য খাদ্যপণ্য তৈরি করা হয়।

পটুয়াখালী জেলার দুমকী উপজেলার আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আলিমুর রহমান বলেন, একটি তরমুজের উল্লেখযোগ্য অংশই খোসা ও বিচি। অধিকাংশ মানুষ এগুলো ফেলে দিলেও সঠিক প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে এগুলো থেকে মূল্য সংযোজিত পণ্য উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। এতে একদিকে খাদ্য অপচয় কমবে, অন্যদিকে কৃষকও বাড়তি আয় করতে পারবেন।

তিনি জানান, তরমুজের সাদা খোসা দিয়ে আচার, জ্যাম ও মোরব্বা তৈরি করা সম্ভব। একই সঙ্গে এটি তরকারি, ভাজি ও স্যুপ তৈরিতেও ব্যবহার করা যায়। অনেক দেশে খোসার এই অংশ নিয়মিত খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া ব্যবহার অনুপযোগী খোসা গবাদিপশুর খাদ্য ও জৈবসার তৈরির কাঁচামাল হিসেবেও কাজে লাগানো সম্ভব।

গবেষকদের মতে, তরমুজের খোসা থেকে সিট্রুলিন (Citrulline) নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যামিনো অ্যাসিডও নিষ্কাশন করা যায়, যা ওষুধ শিল্পে ব্যবহৃত হয়। পাশাপাশি খোসা থেকে পেকটিন এবং বিচি থেকে ভোজ্য তেল উৎপাদনের সম্ভাবনাও রয়েছে। বিচিতে থাকা প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর চর্বি ও খনিজ উপাদান এটিকে পুষ্টিকর খাদ্য উপাদান হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করেছে। শুকিয়ে ভাজা বিচি স্বাস্থ্যকর স্ন্যাকস হিসেবে খাওয়া যায়, আবার গুঁড়া করে বেকারি পণ্য ও পুষ্টিকর খাদ্য তৈরিতেও ব্যবহার করা সম্ভব।

তবে সম্ভাবনা থাকলেও দক্ষিণাঞ্চলে তরমুজের খোসা বা বিচি নিয়ে এখনো উল্লেখযোগ্য গবেষণা কিংবা শিল্পভিত্তিক উদ্যোগ দেখা যায়নি।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান অনুষদের চেয়ারম্যান মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, দেশে এখন পর্যন্ত তরমুজের খোসা নিয়ে তেমন কোনো গবেষণা হয়নি। তবে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, খোসা থেকে বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের পাশাপাশি সিট্রুলিন নিষ্কাশন করা সম্ভব, যা ওষুধ শিল্পে ব্যবহার করা হয়।

এদিকে কৃষকদের অভিযোগ, মৌসুমে উৎপাদন বেশি হলেও সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে অনেক তরমুজ নষ্ট হয়ে যায়। পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার কৃষক নান্না গাজী বলেন, ফলের পাশাপাশি খোসা থেকেও যদি বাণিজ্যিক পণ্য তৈরি করা যায়, তাহলে কৃষকরা অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ পাবেন।

গলাচিপা উপজেলার কৃষক দেলোয়ার হোসেন বলেন, তরমুজের বিভিন্ন অংশের শিল্পভিত্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে এই খাত থেকে আরও বড় অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন সম্ভব হবে।

খাদ্যপ্রযুক্তি গবেষকদের মতে, তরমুজকে শুধু মৌসুমি ফল হিসেবে না দেখে এর উপপণ্যগুলোকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। খোসাভিত্তিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গড়ে তোলা গেলে খাদ্য অপচয় কমবে, পরিবেশ দূষণ হ্রাস পাবে, কৃষকের আয় বাড়বে এবং গ্রামীণ এলাকায় নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বর্তমানে যে খোসা বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেওয়া হচ্ছে, ভবিষ্যতে সেটিই হতে পারে নতুন সম্ভাবনাময় শিল্পখাতের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল।

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।