ভোলায় ‘জ্বিনের বাদশা’ পরিচয়ে প্রতারণার অভিযোগ, স্ত্রী-সন্তান ফেরত ও ন্যায়বিচার চাইলেন প্রবাসী
জীবনের ডায়েরী থেকে গল্প সমগ্র : পর্ব-৫১

[ ড. টি. এন. রশীদ ]
(গত পর্বের পর) : জীবনের কত কথা তার পড়ে আছে, অনন্ত জীবনের কথা। কিছু যে তার গাওয়া হল না। শোনাও হল না। সামনে পড়ে থাকল সুখ সম্ভাবের ঐশ্বর্যের ভরা জয়ের জয়টিকা। ভাই বলল, দাদা আসি- বলে উঠে দাঁড়ালেন। ভাইয়ের চোখে কেন যেন পানি এসে গিয়েছিল। তাড়াতাড়ি করে চলে গেল। ডাক্তার সাহেব কিছু দূর ভাইয়ের সাথে সাথে এগিয়ে গেলেন। আবার ফিরে কিছুক্ষণ বসলেন, কিছুক্ষণ ভাবলেন। পাশের বেডের রোগীরা তাকে অনেক সান্ত¡না দিলেন। অনেক দরদের কথা বললেন। ডাক্তার সাহেব একটু শান্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। একটু হাফ ছেড়ে বাঁচলেন। তখন সন্ধ্যা হয়েয়ে গেছে। মেডিকেল কলেজের আলোগুলো ঝলমল করে জ্বলে উঠল। রোগীদের আত্মীয় স্বজনেরা যে যার মত চলে গেছে। ওয়ার্ড বয়রা রোগীদের খাবার দিয়ে গেছে। ডাক্তার সাহেবের খাবার তার টেবিলে রেখে গেল।
ডাক্তার সাহেব বিছানা ছেড়ে উঠে পেইং ওয়ার্ডটা ঘুরে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। কিছুক্ষণ এভাবে ঘুরে ঘুরে শেষে বিছানায় এসে শুয়ে পড়েন। বিছানায় শুয়েই ক্লান্ত হয়ে গেলেন। সমগ্র ওয়ার্ডের রুগীরা খাবার খেয়ে ঘুমের ব্যবস্থা করতে লাগল। কিন্তু ডাক্তার সাহেবের খাওয়ার নামও নেই। ঘুম ভাঙ্গারও চিহ্ন নেই। পাশের বেডের এক ভদ্রলোকের হঠাৎ খেয়াল হলো যে, ডাক্তার সাহেব ঘুমাইলেই নাক ডাকতেন। কই আজ তো ডাকছে না। এমন সময় নার্স এল, ঔষধ খাওয়াবার জন্য। ভদ্রলোক বললেন, দেখুনতো সিস্টার, এই ভদ্রলোক সন্ধ্যা থেকে ঘুমাচ্ছেন, ভাতও খাচ্ছেন না। কিন্তু এ লোক ঘুমালে নাক ডাকত, আজ নাকও ডাকছেন না। নার্স ভাল করে দেখে বললেন, এ লোক বেঁচে নেই। ওনার মৃত্যু হয়েছে। সমস্ত ওয়ার্ডটা যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেল। হাসপাতালে রোগীর মৃত্যু নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার, এতে সুখেরও কিছু নেই, দুঃখেরও কিছু নেই। আত্মীয়-স্বজনরা এসে কিছুক্ষণ কান্নাকাটি করে তারপর সব শেষ।
ডাক্তার সাহেবের মরা লাশ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নিয়ে যাওয়া হলো। সারা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার লোক তাকে দেখেতে এসেছিল। সকলের হৃদয় জুড়ে কান্নার ঢল নেমে এল। এত দরদী, এত মায়াভরা প্রাণ কম লোকেরই থাকে। আর তার ছেলেমেয়েরা মুক-বধির স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। কাঁদতেও তারা ভুলে গিয়েছিল। আল্লাহ তাদের এত দুঃখ দিল। সাতদিন পূর্বে মা হারাল, ছিল বাবা সেও সাতদিন পর চেলে গেল। আর তাদের আপন বলতে কেউ ছিল না। বড় ছেলেটা ক্লাস টেনে পড়ে, সে বারবার করে বাবার মুখখানা দেখতে লাগল, ছোট ভাই বোনদের ডেকে এনে সবাইকে দেখালো, এ মুখ কত পরিচিত, কত আপন। রক্তের শিরায় শিরায় এর প্রতিধ্বনি। এর শিহরণ সংযোগ সংস্পর্শ।
ডাক্তার সাহেবকে গোসল ও কাফন পড়াতে অনেক সময় হয়ে গেল। শীতের দিন আর সারা আকাশটা মেঘে কুয়াশায় ঢেকে গেছে।। সূর্যের আলো একটুও দেখা যাচ্ছে না। ঘণ অন্ধকার যেন আকাশের বুকটা ব্যথায় বেদনায় থমথম করছে। কবর তৈরী হয়ে গেল স্ত্রী কোহেলীর পাশে। জানাযা পড়বার জন্য লাশ বড় মসজিদের সামনে নেওয়া হল। জানাযায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অধিকাংশ লোক সমবেত হয়েছে। সকলে তার আত্মার শান্তির জন্য মাগফেরাত কামনা করেছে। লাশ দাফনের জন্য সবাই ব্যস্ত ছিল, আকাশ কুয়াশায় ঢেকে গেল, তারপর সন্ধ্যার ঘনঘটা দেখা দিল।
ছেলে-মেয়েদের আবার শেষবারের মত বাবার মুখ দেখার জন্য ডাকা হল। এবার ছেলেমেয়েরা বাবার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। বাবা করে কেঁদে উঠল। মেজ ছেলেটা বলল, না বাবাকে মাটি দিতে দিব না। বড় ভাই অনেক বুঝিয়ে শান্ত করল। বলল, বাবাকে ভাল করে দেখে নাও- মনে রেখ। কাফনের মুখের বাঁধনটা খুলে দিল। মেয়েরা নির্নিমেষ নয়নে চেয়ে থাকল। এ মুখ দেখে তাদের জীবনে কত শান্তি হয়েছে, সাহস হয়েছে, অভয় এসেছে জীবনে। আজ তাকে শেষবারের মত ছেড়ে দিতে হচ্ছে। বড় ছেলেটা বাবা বাবা ওহ্। এই বলে কপালের উপর নিজের কপালটা রাখল। পাশের লোকেরা এসে তাকে সরিয়ে লাশ কাঁধে করে গোরস্থানের দিকে নিয়ে গেল। লাশ দাফন শেষে আত্মীয়-স্বজন সকলে তাদের নিয়ে এল।
মিস্টার খাজা ও মিসেস খাজা এসে ওদের অনেক বুঝিয়ে, অনেক সান্তনা দিয়ে নিজের বাড়ীতে নিয়ে গেল। মিস্টার খাজা দম্পতির ইচ্ছা ছিল মম ও মুশুকে লালনপালন করে বড় হলে ফিরিয়ে দিবে। কিন্তু ডাক্তার সাহেবের ভাই-বোনের মত পেলেন না। তবুও মিসেস খাজা সব সময় ওদের কাছে ডেকে আদর করতেন, খাওয়াতেন, ছোট ছেলে-মেয়ে দুটোকে দুধ খাওয়াতেন, ঘুম পড়াতেন। ঘুমের মাঝে কচি সুন্দর দুটো মুখ তাকে মায়ায় জড়িয়ে ফেলছিল।
(চলবে—–)
