সর্বশেষঃ

জীবনের ডায়েরী থেকে গল্প সমগ্র : পর্ব-৪৮

[ ড. টি. এন. রশীদ ]

(গত পর্বের পর) : রাতের কুহেলি : শ্যামস্নিগ্ধ বর্ষার নব ঘনঘটা, অবিরাম বৃষ্টি হয়ে যে পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘরাশি উড়ে চলছে দূর হতে দূরান্তরে, দিগ হতে দিগন্তরে, কোন বিরহিনীর বিরহ কাতরতা নিয়ে তারা উড়ে চলছে মেঘের কল্পলোকে। “জায়ী” আকাশ পানে তাকিয়ে দেখছিল আর ভাবছিল পৃথিবীর এই অনন্তকালের অনন্ত লোকের কথা। এই বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত, বসন্ত, ঋতু চক্র ঘুরে ঘুরে আসে, ঘুরে ঘুরে চলে যায়। মানুষের জীবনটাও তদ্রুপ। এত মান-সম্মান, প্রতিপত্তি, যশ, ঐশ্বর্য, যৌবন ধারাকে যারা সরা জ্ঞান করে, তারপর হঠাৎ একদিন অলক্ষ্যে অগোচরে নিজের অজান্তে চলে অসীম অনন্তলোকে।। জায়ী, জায়ী, দরজায় মৃদু টোকা পড়ে। জায়ী চমকে উঠে। এগিয়ে দরজা খোলে। দেখে বৃষ্টি ভেজা গায়ে দরজায় মম দাঁড়িয়ে আছে। যেন কত অপরাধীর মত দু’টো অসহায় আঁখি মেলে ধরে তার পানে। জায়ী বলে এস, এস মম ভিতরে এস। মম ভিতরে আসে এ ঘরে ওঘরে ভেড়ায়। শোকেসে যে কত রকমারী খেলনা। তার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে জায়ী এসে বলে, এ খেলনা গুলো কার মম? মম বলে আমার।
জায়ী শোকেস থেকে খেলনা গুলো বের করে চাবি দেয় কোনটা হামাগুড়ি দেয়, কোনটা দৌড়ে দৌড়ে ঘুরে ভেড়ায়, কোনটা নাচে। এ রূপ বিভিন্ন রকমারী খেলনা। দেখে দেখে মমের সাধ মেটেনা আরো দেখতে ইচ্ছে করে। মোমের বয়স প্রায়ই তিন বছর। ছোট পায়ে হেটে বেড়ায় চারিদিক। বাড়ীতে চাচা, ফুফু, বড় ভাই, খাজা সাহেবের বাড়ীতে আসুক চায় না। এটা তবুও মম লুকিয়ে লুকিয়ে খাঁজা সাহেবের বাড়ী আসে। বড় ভাই চাচা, ফুফু ওরা জানতে পারলে শাস্তির আর অন্ত থাকে না।
বড় ভাইটা মমকে মেরে একদিন গলাটিপে ধরে ছিল, জিহ্ববাটা অনেকখানি বের হয়ে গিয়েছিল একবার মমের গায়ে আগুন লেগে মমের বুকের কিছু অংশ এবং চুল পড়ে যায়। লোক মুখে শুনা যায় বড় ভাই নাকি সিগারেট খেয়ে সিগারেটের আগুন সহ ছুড়ে মেরেছে। মম ঘুমিয়ে ছিল সিগারেটের অংশ গিয়ে বালিশের কোনায় পড়ে মমের চুলে আগুন ধরে যায়। এ ঘটনার এক বছর পূর্বে মমের বাবা-মা মারা গিয়াছে সে এক মর্মান্তিক ব্যাপার। মমের বাবা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একজন প্রতিষ্ঠিত ডাক্তার। ভদ্রলোকের সাতটা ছেলে মেয়ে। ঘরে জোয়ান স্বাস্থ্যবতী সুন্দরী স্ত্রী। টাকা পয়সা জিনিষ পত্রে ঘর জমজমাট। বাগানে বিভিন্ন ফল-ফুলে ভরপুর। ফুলের মধ্যে বিশেষ করে রজনী গন্ধার ঝাড়ই বেশী। শাক-শবজি ও বাগান ভর্তি। নিজেরা খায়, আত্মীয় স্বজন সহ পাশ্ববর্তীদেরকে বিলায়।
ঘরে বিধবাশালী দু’টো ছেলে মেয়ে সহ নিজের ভাই, ভাইর বৌ, তাদের ছেলে-মেয়ে সহ এক সাথে থাকে। বড় মেয়েটা করাচি থাকে। বিশেষ ছুটি পেলে মাঝে মধ্যে বেড়াতে আসে এ রূপ হাসি খুশি সংসার তাদের। মম ডাক্তার সাহেবের যমজ সন্তান মমের সাথে আর এক ভাই জন্ম গ্রহন করেছিল। তখন তার মা খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে ছিল। মহান প্রর্ভু হয়ত সন্তানদের উছিলায় বাঁচিয়ে রেখেছেন। খাজা সাহেব মমদের বাড়ীর পাশেই থাকতেন। বিদেশী কোম্পানির বড় অফিসার। সাতটি ছেলে মেয়ে তবু খাজা সাহেবের স্ত্রী এই মম মেয়েটার প্রতি কেন যেন মায়ায় পড়েছিল। অল্প বয়স হতে মিসেস খাজা মমকে মাঝে মাঝে নিজের কাছে রাখতেন। দুধ খাইয়ে দিতেন, ঘুম পড়াতেন। ভারি সুন্দর মুখ মমের।
সুন্দর টান-টানা দু’টো চোখ, যেন অনাদি অনন্ত কালের স্বপ্ন ওর দু’চোখে, মাথা ভরা কালো কোকড়ানো চুল। সকল সৌন্দর্য যেন তার মধ্যে নিহিত। দেখলে যে কেহ তাকে ভাল না বেসে পারে না। মম আস্তে আস্তে বড় হতে লাগল মমের বয়স যখন আড়াই বছর তখন মমের মা আবার অন্তঃসত্ত্বা হল। মমের মা একদিন গল্প চছলে মিসেস খাজাকে বললেন, ভাবি এ বার বোধহয় বাঁচব না। দোয়া করবেন। আমার মন যেন কেমন ভরসা পাচ্ছে না। তখন শরৎকাল শেষ হয়ে গিয়ে শীতের আগমনী হাওয়া বইছে। শীতের রূপালী পাখা তখন ভাল করে মেলেনি। শীতের হালকা আমেজ তখন যেন মনে প্রাণে শাস্তির ছায়া মেলে ধরে। শিশির ধোয়া রাতে শিউলীর মৃদু গন্ধ হালকা সুরভি ছড়িয়ে মাঝে মাঝে মনকে উন্মাদ করে তোলে।

(চলবে—–)

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।