জীবনের ডায়েরী থেকে গল্প সমগ্র : পর্ব-৩০

[ ড. টি. এন. রশীদ ]

(গত পর্বের পর) : ব্যাকুল হয়ে কুঞ্জ বলল, কে তুমি দেবী? নন্দা চুপ, কি উত্তর দেবে। সে যেন বোবা হয়ে গেছে। কোন কথা মুখে আসছে না। কুঞ্জ এগিয়ে এসে হাত ধরল। নন্দা যেন কেঁপে উঠল। শরীরের শিরায় শিরায় রক্ত চঞ্চল চপলতার ভিতর আগুণ ধরে গেল। কুজ বলল, এত সুন্দর তোমার হাক, এ হাতে আছে পৃথিবীর অনাদি অনন্ত কালের কথা। বল, তুমি কথা বল। নন্দা তবুও চুপ। ডাগর দু’টি চোখের কোণ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল, কুঞ্জের হাতের উপর।
কুঞ্জ বলল, একি, তুমি কাঁদছ নন্দা? কেন কাঁদছ? নন্দা কুজের বুকে মাথা রেখে হু হু করে কেঁদে উঠল। কুঞ্জ অস্থির হয়ে উঠল। কেন? কেন তুমি কাঁদছ। নন্দা কাঁদছি, এত সুখ আমার জীবনে সইবে কি না। আমার বাবা পুরোহিত, আমি খুঁজাবি, ধর্ম, কর্ম, পুজা এই আমার জীবনের ব্রত। কিন্তু এ আমার কি হল? কুঞ্জ বলল- এ ভালবাসা, এ প্রেম। নন্দা বলল- প্রেম? রাত্রি অনেক হয়ে চলল। নন্দা কুঞ্জের কাছ থেকে নিজের ঘরের পানে ফিরে গেল।
তখন অনেক রাত। ব্রাহ্মণের হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গিয়ে গা’টা কেমন হুম হুম করে উঠল। তাড়াতাড়ি নন্দার ঘরের কাছে গিয়ে দেখে নন্দার ঘরের দরজা খোলা। ব্রাহ্মণ অবাক হয়ে ভাবতে লাগল- কোথায় গেল মেয়েটা? সে বারান্দায় পায়চারি করতে লাগল। তখনই নন্দা গিয়ে ব্রাহ্মণের চোখের সামনে পড়ল। নন্দাকে দেখে প্রথমে ব্রাহ্মণ চিনতে পারল না। স্বর্গের দেবী বলে প্রথমে ভুল করেছিল। যখন চোখের পানে তাকাল তখন দেখল তারই মেয়ে। ব্রাহ্মণ রাগে ফেটে পড়ল। দিকবিদিক জ্ঞান শুণ্য হয়ে কাছে এগিয়ে এসে বলল, কোথায় গিয়েছিলে?
মন্দা চুপ। ব্রাহ্মণ আবার চিৎকার করে উঠল। বল, কোথায় গিয়েছিলে? কলঙ্কিনী, তুই আমার ঘরে আর চুকিস না, আমি তোর এই মুখ আর দেখতে চাই না। তোর মৃত্যু হোক। সেই রাত আর ব্রাহ্মণের ঘুম হয় না। সারা রাত ছটফট করে কাটিয়েছে। রাগের মাথায় কি যা তা বলল। অল্প বয়স্ক মেয়ে হয়ত বা পদস্খলন হতে চলেছে। শাসন করলেই ভাল হয়ে যাবে। নন্দাও সারা রাত ঘুমায়নি। কেবল বাপের কথাগুলো কানের কাছে অহরহ প্রতিধ্বনি হতে লাগল। তোর মৃত্যু হোক, তোর মৃত্যু হোক। প্রতিদিনের মত আবার সকাল হলো। আজ ব্রাহ্মণ নিজেই পুঁজার ফুল তুলে নিজেই পুঁজার কাজ সমাধা করল। ঘরে এসে নন্দাকে কয়েকবার ডাকল, নন্দা সাড়া দিল না। তবুও আবার ডাকল, নন্দা মুখ ধুয়ে কিছু খা। ব্রাহ্মণের মনে খুব দুঃখ হল, মা মরা মেয়ে। ব্রাহ্মণ ব্যতিত আর কেহই যে নন্দার নেই। সুখে দুঃখে তিলে তিলে সে মেয়েকে বুকে করে মানুষ করেছে। এত বড় হয়েছে এমনি করে রাগ করা উচিৎ হয় নি। নিজের ব্যবহারে নিজেই অনুতপ্ত হল। আর তা’ছাড়া নন্দাকে এখন বিয়ে দিতে হবে। মেয়ে বড় হয়েছে। বাপ হিসেবে তার এখন বিয়ের কথা ভাবা উচিত। ওর মা থাকলে কত রাগ করত নন্দাকে বিয়ে দেবার জন্য। ব্রাহ্মণের মনে পড়ল এইত, দিন পনের হল পাড়ার ঠাকুর বাড়ীর শ্যামের সঙ্গে নন্দার বিয়ের কথা তুলেছিল। ব্রাহ্মণ বলছিল, এখনও নন্দা ছোট মেয়ে- আরো কিছুদিন যাক।
নন্দা শ্রান্ত পদে ঘর থেকে বেড়িয়ে এসে বাপের জন্য রান্না করতে বসল। আজ বাজার হয়নি। ঘরে যা ছিল তা দিয়ে কিছু রান্না করে রাখল। বাপের খাওয়ার আসন বিছিয়ে ভাত তরকারী সাজিয়ে সযতেœ ঢেকে রাখল। চৈত্রের খাঁ খাঁ করা রৌদ্রে ব্রাক্ষণ বাড়ী ফিরে এল। উদাস দুপুরে মাথার উপর দিয়ে একটি কাক কা-কা করে ডেকে গেল। অমঙ্গলের অজানা আশংকায় ব্রাহ্মণের বুকটা কেঁপে উঠল। তাঁর স্ত্রী মারা যাবার পর আর কোন অমঙ্গল তাঁর জীবনে আসেনি। আজ তার কি হলো। পা দুটো বড় অবস হয়ে আসছে। মাথাটা কেমন ঝিম ঝিম করছে তবুও একটু বিশ্রাম করে, স্নান সেরে এসে খাবার খেতে বসল। খাওয়া যেন তাঁর মুখে আসছে না। কি যেন ব্যাকুল কান্না তার কণ্ঠ চেপে আসছে, তবুও কিছু মুখে গুজে উঠে পড়ল। হাত মুখ ধোবার সময় বলল নন্দা এগুলো তুলে রাখ। তুই খেয়েছিস না। তুই খা ব্রাহ্মণ বিছানায় একটু গড়াতে গেল। কোথাকার রাজ্যের ঘুম এসে তাঁর চোখে বাসা বাঁধল নাক ডেকে সে অঘোরে ঘুমাতে লাগল।
চৈত্রের সোনা ঝরা সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল দুয়ারে মাধবী লতার অসংখ্য ফুল দুলছিল। তার মিষ্টি গন্ধে মন ভরে এল। কৃষ্ণচূড়া গাছে লাল কৃষ্ণচূড়া কেবল আবেসের হাতছানি দিল। তার একটা মধুর গন্ধে মন প্রাণ ব্যাকুল হয়ে এল। নন্দা পাষাণ প্রতিমার মত নিশ্চল নিশ্চুপ। অসংখ্য চুলগুলো এলো মেলো হয়ে ছড়িয়ে আছে। কপালে লাল টিপটার রং সারা মুখে এখনো লেগে আছে। কোন দিকে তার ভ্রুক্ষেপ নেই। শুধু একটি কথা তার কানে বাজছে- “তোর মৃত্যু হোক।” তাড়াতাড়ি পুঁজার থালাটা হাতে করে আরতির ধূপ দেবার জন্য পুঁজার ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। যাওয়া পথে কাপড়ের খুটে জানি কি বেঁধে নিয়ে গেল। শুনল আরতির ঘন্টা। ব্রাহ্মণ আশ্চর্য হয়ে গেল। এ সময় তো নন্দা কখনো পুঁজার ঘরে যায় না।
কে, কে আরতি ঘন্টা বাজায়? ব্রাহ্মণ তাড়াতাড়ি পুঁজার ঘরের দিকে ছুটে গেল। দেখল সন্ধ্যার ম্লান আলোয় দেব দেউলের প্রতিমার পায়ের নীচে নন্দার দেহটা এলিয়ে পড়ে আছে। ব্রাহ্মণ চিৎকার করে কেঁদে উঠল, মা, এ তুই কি করলি, এ তুই কি করলি, আমি কি নিয়ে থাকব। নন্দা নির্বাক, নিস্তব্ধ, পরপারে চলে গেল। (চলবে———)।

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।