জীবনের ডায়েরী থেকে গল্প সমগ্র : পর্ব-২৮

[ ড. টি. এন. রশীদ ]

(গত পর্বের পর) : নন্দকুজা : নন্দকুজা নামটার কেমন যেন একটা মোহ আছে। নামটা শুনতেই ভাল লাগে। কেন, জানি না। চুম্বকের মত নিবিড় আকর্ষণে মনটাকে আমার কাছে টেনে নিতে চায়। যেন কত যুগ-যাগান্তরের বন্ধুত্বের গাঢ় পরিচয় তার সাথে আমার। অথচ কোন দিনই তাকে আমি একবারও চোখে দেখিনি। শুধু আমার এক বান্ধবীর কথায় পিকনিকের জন্য মেতে উঠলাম। এ কয়দিনের পিক্সিকের প্রস্তুতির জন্য ক্লান্তি, শরীরের শ্রান্তি, জিনিষপত্র কেনাকাটার হাঙ্গামা, চাঁদা তোলার বিরক্তি, পথে পাড়ি দেবার কালে বান্ধবীদের মনোরঞ্জন করার লৌকিকতা কাটিয়ে শান্ত মনে নন্দকুজার পথে পাড়ি জমালাম।
পথে যেতে যেতে ফাল্গুনের ঝরাপাতার দিনের শিমুলের সমারোহ আমাদের হাতছানি দিয়ে অভিনন্দন জানাল। আম্র মুকুলের গন্ধে মনপ্রাণ কেমন উদাস হয়ে উঠল। কুহুকুহু রবে বনের কোকিল বনে বনে ডেকে উঠল। এক ঝাঁক বলাকা আমাদের মত নিরুদ্দেশের পথে পাড়ি জমাল। হয়ত ওরাও আমাদের মত কোন নন্দ কাননের কুঞ্জপথে পাড়ি জমিয়েছে। ফাল্গুনের বনে বনে লেগেছে রংয়ের আগুন। সে আগুনই আমাদের মনে ঢেলেছে হোলির আবির। দীর্ঘ পথের ক্লান্তি নিয়ে নন্দকুজার তোরণের দুয়ারে আমাদের মটর এসে থেমে গেল। এখানেই আমাদের ক্লান্তির টারমিনাল। কেমন যেন পরিশ্রম, ঢুলুঢুলু চোখে নন্দকুজার পানে একবার চেয়ে দেখলাম। ভরা যৌবনের অনন্ত রূপরাশি নিয়ে সে আমাদের অভ্যর্থনা জানাল। ভাদ্রের ভরা নদীর মত তার উচ্ছ্বাস বসন্তের আবির সমারোহ তার দেহে, যৌবনের কানায় কানায় তার কত আকুলি, ব্যাকুলি, কত কথা, কত ব্যথা, কত প্রেমের পুঁজার অঞ্জলী তার দু’হাত ভরা।
ছোট্ট একটি বাংলো, ছোট্ট একটি পার্ক, পার্ক ভরে আছে অনেক রজনীগন্ধার ঝাড়। অনেক গোলাপের কেয়ারী। আর পার্কের এক কোণে ফুটেছিল একটি রক্ত গোলাপ। অদ্ভুত সে গোলাপ আর অনুপম সে সুন্দর। প্রথম ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই গোলাপটি আমার চোখে পড়েছিল। ভেবেছিলাম যতক্ষণ থাকব, ততক্ষণ ও থাকবে আমার পাশে। কিন্তু পাঁচ মিনিট পরে দেখলাম গোলাপ আর গাছে নেই। বুকটা ছ্যাৎ করে উঠল। দেখলাম একটা মেয়ে হাতে করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু বলতে পারলাম না বুকের মধ্যে একটু কষ্ট অনুভব করলাম।
পার্কের আশেপাশে অনেক কাঁঠাল গাছের সারি সেই ছায়া ঘেরা মায়াভরা গাছের নীচে রান্নার যোগাড় আরম্ভ করলাম। নন্দকুজার সি.এন্ড.বির স্টাফরা আমাদের চা খাওয়ালো। একজন দারোয়ান অনেক দিন যাবত এখানেই আছে। ও নাকি আমরা আসব জেনে ডাক বাংলোর ট্যাংকে অনেক পানি তুলেছিল। এখন নাকি একটু পানিও নেই। চিনিও নাকি অনেক এনে রেখেছিল, তাও নেই। এক জিন সাহেব নাকি এখানে থাকেন। তিনি সারা রাত নামায পড়ে পড়ে পানি খরচ করে সেই জীন সাহেবও চিনিগুলি খেয়ে গেছেন। আল্লাহ জানেন, এটা শোনা কথা। আরো শুনলাম, নন্দকুজার এক গরীব ব্রাহ্মন ঘরে ‘নন্দা’ নামে একটি সুন্দরী মেয়ে ছিল। মেয়েটি ছোট বেলা থেকেই খুব ধর্মভীরু ছিল। সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠেই ছোট ফুলের ডালাটা নিয়ে যেত ফুল তুলতে। ছোট হাতে ছোট ছোট ফুল তুলে পুঁজার মন্দিরে দিয়ে আসত।
এমনি করে নন্দা দিন দিন বড় হতে লাগল। বাপের অগোচরে করত প্রতিমা পরিচর্যা। গরীব ব্রাহ্মণ ছিল সারা গাঁয়ের পুরোহিত। পুরোহিত হিসেবে তার খুব সুনাম ছিল। তার শীষ্যের অন্ত ছিল না। শিষ্যেরা তার সেবা শুশ্রুষা ও পরিচর্যা করত। সেই গ্রামের একটি সম্ভ্রান্ত হিন্দু কায়স্থ পরিবার ছিল। তার একমাত্র ছেলে, নাম তার কুঞ্জ। কুঞ্জ ছিল নিখুঁত সুন্দর। সারা গ্রামে তার মত অত সুন্দর আর কেহ ছিল না। সে মধুর সুরে বাঁশি বাজাত, গাইত আরো সুন্দর। মাঝে মাঝে উদাস দুপুরে সে গাছের ছায়ায় বসে মোহন বাঁশি বাজাত। বাঁশির মোহন সুরে গ্রামের আকাশ বাতাস কেঁদে উঠত, আর কেঁদে উঠত সারা গাঁয়ের বৌঝিদের মন।
নন্দা সেই উদাস দুপুরে পুঁজাঘরের সাজ সরঞ্জামাদি পরিষ্কার করে ঘরে তুলে রাখত। বাপের আহ্নিকের ধুয়ে পরিষ্কার করে গুছিয়ে রাখত। বাপ মাঝে মাঝে বলত হ্যায়রে নন্দা, তুই বোধ হয় কোন কালে, না, না কোন কালে কেন, সেই পূর্বজন্ম আমার মা ছিলি! নন্দা কিছু বলত না, শুধু মুচকি হেসে কাজে যোগ দিত। বাপ যা যা খেতে পছন্দ করত, পাকা গিন্নির মত সে রেঁধে খাওয়াত।

(চলবে—–)।

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।