জীবনের ডায়েরী থেকে গল্প সমগ্র : পর্ব-২৭

[ ড. টি. এন. রশীদ ]

(গত পর্বের পর) : ছোট ছেলেটি আরো সুন্দর। শরতের শিশির ভেজা শিউলির মত। তেমনি শুভ্র, কোমল, লাল একটি সুতির জামায় তাকে মনে হচ্ছিল একটি লাল গোলাপ। হাটি হাটি পায় সে হেঁটে বেড়ায়। আধো ভাষায় সে মা মা, বাবা, বাবা বলে ডাকে। লক্ষ্মী পূজার দিনে কৃষক বৌটি লক্ষ্মীর আরতি দিয়েছিল, তৈরী করেছিল অনেক প্রসাদ। সারা রাত জেগে করেছিল লক্ষ্মী পূজা। যদি দেবী দয়া করে ভর করে তার সংসারে। কালি পূজার দিনে আলোয় আলোয় ভরে গেল রাজপুরি। কালি অর্ঘ্য দেওয়া হলো বিরাট করে। মা কালীকে খুশি করার কোন ব্যতিক্রমই হলো না। কুমারের মনে শান্তি নেই। কি করে সেই কৃষাণীকে আনা যায়। তার ঐশ্বর্যকে করেছে সে পদাঘাত। তাচ্ছিল্য করেছে তার প্রেমকে। এত তার দেমাগ? এত তার অহংকার? কুমার বাহাদুর রাজ্যে তার প্রিয় সহচরদের ডেকে নিয়ে গেল তার ঘরে। কি করে সেই কৃষাণীকে আনা যায়। তার কয়েকজন অন্তরঙ্গ সহচর বললো- কুমার আমরা পারব এই কৃষাণীকে স্বামীর বুক থেকে ছিনিয়ে আনতে। এই মন্তব্য নিয়ে তারা ঘরের পানে ফিরে চলল।

গভীর রাত, কৃষাণ কৃষাণী ঘুমিয়ে আছে গভীর ঘুমে। সুন্দর ছোট্ট বাচ্চাটি মার স্তন মুখে দিয়ে ঘুমের ঘোরে আচ্ছন্ন। মাটির ঘর, ছনের ছাউনি, হালকা দুয়ার, মাটির পিলসুজে মাটির প্রদীপ জ্বলছে। প্রদীপের চেয়েও কৃষাণীর মুখখানা আরো সুন্দর লাগছে। কুমারের সহচরেরা ঘরের দরজা কেটে কৃষাণীর ঘরে ঢুকে পড়ল। দেখল মাটির ঘরে ঘুমায় স্বর্গের প্রতিমা। সুন্দর মুখের পরে লাল সিঁদুরের ফোঁটাটা আরো সুন্দর লাগছে। আলতা রাঙ্গা রংয়ের মাঝে সামান্য শাড়িতেও কত সুন্দর মানিয়েছে। কোথায় লাগে হীরা মুক্তা পান্না, জহরত। ভগমানের সৃষ্টির কাছে এদের কোন দাম নেই। নিস্তব্ধ হয়ে ওরা এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখল। আরো দেখল মার কোল জুড়ে আছে একটি সুন্দর ফুল। হাসিমাখা সে মুখখানা যেন মা যশোদার কোলে শ্রীকৃষ্ণ। তবু তবু মনে পড়ে গেল কুমারের প্রতিশ্রুতির কথা।
কৃষাণী ডান কাত হয়ে ঘুমিয়ে আছে, ডান হাতের উপরে আছে ছেলেটি, বাম হাতটা কৃষাণের বুকের ওপর আলগোছে পড়ে আছে। হাতের আঙ্গুলগুলো কাঁঠাল চাঁপার মতো। বাহুখানা কেমন নিটোল, নধর ধরতেও কেমন সংকোচ হয়। তবুও দুর্বৃত্তরা এসে প্রথমেই কৃষাণীর মুখ বেঁধে ফেলে, কৃষাণের বুকের উপর ধরল উদ্যত ছোরা। কৃষাণীকে কাঁধে ফেলে তারা চললো রং মহলের দিকে। তখনও সবে পূবের আকাশ একটু একটু আলো হয়ে আসছে। রংমহলের বাতিগুলো তখনও নেভেনি। লাল, নীল, হলুদ, বেগুনি বিভিন্ন আলোয় শোভা বর্ধন করেছে। হাসনা হেনা তখন তার সুবাস ছড়াচ্ছে। শিউলী টুপটাপ করে একটা একটা করে ঝরে পড়ছে আর তার হালকা গন্ধে মনপ্রাণ কেমন আনচান করে উঠছে।
কুমার তাকিয়েছিল দূরে আরো দূরে- যেখানে আকাশের শেষ সীমানা এসে থেমেছে মাটির বুকে। পাইন গাছগুলি কেমন নির্ভীক প্রহরীর মত যেন তাকে অভয় দিচ্ছে। শুকতারাগুলো আস্তে আস্তে দূর আকাশের কোলে কেমন সরে সরে যাচ্ছে। রাতজাগা পাখি আর্তনাদ করে ডেকে উড়ে চলে গেল। সোনার খাঁচায় ময়না ডেকে উঠে- এ কি করলে? এ কি করলে? এ ডাকে যেন কুমারের মন কেঁপে উঠল, ভাবল’ না ও কিছু না’। বাহির থেকে জোরে দরজায় ধাক্কা পড়ল: কুমার দরজা খোল, দরজা খোল।
দুর্বৃত্তরা একখানি চাঁদ এনে রাখল কুমারের শয্যায়। পৃথিবীর সব জ্যোৎস্না এসে ভিড় করল কুমারের ঘরে। কুমার ব্যাকুল হয়ে উঠল- এত সুন্দর, এত নিখুঁত। এ যে ভগবানের নিজ হাতে সৃষ্টি, কুমার আস্তে আস্তে গিয়ে কৃষাণীর মুখের বাঁধন খুলে দিল। অনিমেষ নয়নে তাকিয়ে থাকল তার মুখের উপরে। যেন কতগুলো যুগান্তরের ইন্সিত সে মুখ কত বাসরের রাতজাগা সে স্বপ্ন। সে যেন জেগে জেগে স্বপ্ন দেখছিল। হঠাৎ কৃষাণীর আর্তনাদে কুমারের ধ্যান ভঙ্গ হল- আমি কোথায়?
কুমার বলল, তুমি আমার কাছে। কৃষাণী আক্রোশে ফেটে পড়ল- কেন? কেন আমি এখানে? কুমার এগিয়ে এসে বলল- আমার কাছে থাকবে বলে। কি বললে? বলে উঠে সবে দাঁড়াল। কুমার দু’বাহু দিয়ে জড়িয়ে ধরতে। গেল তাকে, কৃষাণী হঠাৎ ছুটে গিয়ে জানালা দিয়ে নিচে লাফিয়ে পড়ল। কেউ জানল না, কেউ শুনল না, কেউ দেখল না। শুধু নিস্তব্ধ রাজপুরি একটা বিরাট আর্তনাদে ভরে গেল। সারা মহল বিরাট অট্টহাসিতে কেঁপে উঠল।- না… না….না..। গগণচুম্বী সে চিৎকার রাজ মহলে রাজমাতা জাগে, জাগে রাজা বাহাদুর, জাগে রাণী বৌমা। ভোর না হতেই রাজকুমারের নামে রাজদরবারে আসে বিরাট অভিযোগ। প্রজারা চায় বিচার, রাজা বিচার করবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়। একদিন, দু’দিন, তিনদিন। রাজপুরি নিস্তব্ধ হয়ে গেল। রাজপুরি শূন্য- কেউ কোথাও নেই- শুধু সিংহ দরজার কাছে রাজা দিঘাপাতিয়ার মর্মবিদারক মূর্তিটা পড়ে আছে।

(চলবে————-)

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।