জীবনের ডায়েরী থেকে গল্প সমগ্র : পর্ব-২৬

[ ড. টি. এন. রশীদ ]

(গত পর্বের পর) : পাষাণের কান্না : ঐশ্বর্যের দম্ভ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাজা দীঘাপতিয়ার রাজমহল। মর্মের মর্ম বেদনায় আজও তারা কাঁদে, আজও তারা হাসে, রাণী দীঘাপতিয়ার মত খিল খিল করে। সেই গভীর নিশীথ রাতে পরিখার পারে বাজনা ঘরের বাজনার তালে তালে আজও নর্তকীরা হাত ধরা দরি করে নাঁচে। রাণী মহল থেকে রাজ মহলে আসার পথটা লাল, নীল, আলোক মালায় জ্বলে উঠে রাণী আসার অপেক্ষায়। রাণী আসে স্বশরীরে নয়, অশরীরী আত্মা নিয়ে। কুমার মহল তেমনি জম-সমাট হয়ে কিন্নরীদের নুপুরের তালে। সাবাস সাবাস ধ্বনিতে সচকিত হয়ে উঠে নিস্তব্ধ পুরিটা। কেউ নেই তবুও পূর্ণিমার রাতে সবাই একত্রিত হয়। এটা এখানকার একটা কিংবদন্তী।
রাজা দীঘাপাতিয়ার তেমনি আফিমের ঘোরে ঝিমায়। রাজ নর্তকী তেমনি আজও সরাব ঢেলে চম্পাকলির মত হাত দিয়ে মুখের সামনে এগিয়ে দেয়। সবই লোকের কল্পনা, বানানো কথা। বসন্তের পূর্ণিমা রাতে এমনি কল্পনায় ভরে উঠে রাজপুরিটা। সিংহদ্বারের বড় ঘড়িটা তেমনি ঢং ঢং করে বছরের পর বছর বেজে চলছে। ক্লান্তি নেই, শ্রান্তি নেই। কালের কপোল তলে, কালের স্মৃতিকে মুছে দিতে চায় না, অতীতকে বর্তমানের মাঝে বেঁধে রাখতে চায়। তেমনি- নাটোরের মত ছোট্ট একটা মহকুমা। নাটোর থেকে তিন মাইল দূরে এই রাজা দীঘাপাতিয়ার মহল। দু’ধারে ঝাউবীথি এই তিন মাইল রাস্তাকে বয়ে নিয়ে গেছে, মনে হয় ফুলমালি নিজ হাতে ফুলের কেয়ারী করে গেছে। রাজপুরির চারিদিকে ঘিরে আছে বিরাট পরিখা। পরিখার পানি আজও কাকচক্ষুর মত টলটল করে। বিরাট বিস্তীর্ণ বাউন্ডারিটা আজও রাজপুরির জয় ঘোষণা করে। নিস্তব্ধ পুরিটা আম গাছে ভরে আছে। কোনটা রাণীর পছন্দ, কোনটা রাজার পছন্দ, কোনটা কুমারের পছন্দ এসব নাম অলংকৃত করে আজও দাঁড়িয়ে আছে প্রভুভক্ত প্রহরীর মত।
ইটালিয়ান গার্ডেন আজও শোভাবর্ধন করে দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষ্য নিয়ে। আজও মনে হয় জীবন্ত। রাজমহলের বাইজীরা এই মাত্র উঠে গেল, পায়ের ছাপ রয়ে গেছে প্রতিটি শিশির ভেজা দুর্বাঘাসে। রংমহলের রূপ ধরে রূপসীরা রূপের নেশায় ঘুরে ঘুরে বেড়ায়। আজও খোঁজে তারা রাজা দীঘাপাতিয়ার ও কুমার বাহাদুরকে। বিস্মৃতির অতল তলে তারা মরে যেতে চায় না। বেঁচে থাকতে চায় তারা স্মৃতির জগতে। কুমার বাহাদুর ভাল বেসেছিল একটি গ্রাম্য সুন্দর সুঠাম সাবলীল মেয়েকে। এ কথা জানত না রাজপুরি কেউ, জানতেন না রাজমাতা, জানতেন না রাজা বাহাদুর। এমনি রাণী বৌমাও জানতা না। জানত শুধু রাজকর্মচারীরা। ক্রমে ক্রমে এ কথা রাজ্যের লোকের কানে উঠল। তবুও কুমার নিরুদ্যম হল না। ঘরে কি না আকাশের চাঁদের মত বৌ ফেলে তিনি মেতে উঠলেন গ্রাম্য সহজ সরল একটি মেয়ের প্রেমে।
মেয়েটি ভালবাসত নিজস্ব গড়া তাদের সংসার, ভাল বাসত গরীব কৃষক স্বামীকে, আর ভালবাসত সমস্ত মনপ্রাণ উজাড় করে তার সুন্দর ছোট ছেলেটিকে। গোধূলী লগ্নে সংসারের সমস্ত কাজ সেরে কৃষক বৌটি গাঁয়ের পথে পানি নিতে আসত। কুমার তার পিছু নিত, মেঠো সুরের বাঁশি বাজাত। তবুও মেয়েটি কানদিন তার পানে ফিরেও চাইত না। এমনি ছিল সতী-সাবিত্রীর মত সেই গ্রামের কৃষক বৌটি। রাজ্যের রাজমন্ত্রীদের দিয়ে কুমার পাঠাত অনেক টাকা-পয়সা। মেয়েটি স্বামীর অগোচরে তাচ্ছিল্য ভরে ফিরিয়ে দিত। ক্রমে ক্রমে এ সব কথা তার স্বামীর কানে উঠল। সে তার বৌকে আর গাঁয়ের পথে যেতে দিত না। সমস্ত শক্তি দিয়ে আঁকড়ে ধরল সেনার প্রতিমা প্রাণ প্রিয় বৌকে।
সেই বছর পুঁজার সময় রাজ্যের লোকজন মেতে উঠল পুঁজার আনন্দে। মা আসছে, মা আসছে, মায়ের আবির্ভাবে মুছে যাবে লোকের দুঃখ, কষ্ট, গ্লানি। রাজা, প্রজা, ধনী, গরীব সকলেই আনন্দে বিভোর। রাজপুরিতে আনন্দের ঢেউ বয়ে গেল। পুঁজাঘরে পুঁজা দেউলে মা দুর্গার মূর্তি, মহালয়ার দিনে শ্রদ্ধাঞ্জলী দিয়ে ঠাকুরের আরতির মাঝে দেওয়া হল দেবতাকে মানুষের মনের অর্ঘ্য। ঘুম নেই কারো চোখে। নাচে গানে হাসিতে আনন্দে রাজপুরি বিভোর। রাজপুরির খানাপিনা খেয়ে সকলেই রাজা বাহাদুরকে ধন্য ধন্য করতে লাগল। বিজয়ার দিন রাজবাড়িতে খুব আরতি হল। আরতির ধুয়ায় রাজবাড়ি খুব অন্ধকার হয়ে গেল। আরতির নাচ হলো আরো অদ্ভূত। রাজমাতা, রাণী, বৌমা, মাকে প্রণাম করল বছরের শুভ কামনা প্রার্থণা করে। সুন্দরের পাদপিঠ বরে, সুন্দরের আরতির মাঝে দেবতার বিসর্জণ হল। সেই কৃষাণ বৌটি তার স্বামীর ঘরে আনন্দা আবেগে উচ্ছল। বিজয়ার দিন তাাঁর স্বামী তাকে এনে দিয়েছিল একখানা লাল তাঁতের শাড়ি। গলায় একছড়া পুঁতির মালা। হাতে একজোড়া সাদা শাখা। তা পরেই সে স্বামীকে প্রণাম করেছিল।

(চলবে——-)।

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।