জীবনের ডায়েরী থেকে গল্প সমগ্র : পর্ব-২৫ 

[ ড. টি. এন. রশিদ ]
(গত পর্বের পর) : গ্রাজুয়েট বেকার (এম.আর) : দেশে শিক্ষিত গ্রাজুয়েটদের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু কর্মসংস্থান অপ্রতুল। যার প্রেক্ষাপটে অনেক গ্রাজুয়েটকে টিউশনির দ্বারহস্ত হতে হয়। আর এ ক্ষেত্রে প্রায়ই বিজ্ঞাপন লক্ষ্য করা যায় পড়াইতে চাই। ল্যামপোষ্টে এক খানি বিজ্ঞাপন আটা, বি.এ পাস “মানস মোহন মুখোপাধ্যায়”, বয়স চব্বিশ পঁচিশ বছর। বিজ্ঞাপনটি তার নোট বুকে নকল করিতে ছিলেন দুই একজন কৌতুহলী পথিক। ঘাড় উঁচু করিয়া বিজ্ঞাপনটি পড়িয়া গেল মানস ভরসা নেই তবু টুকিতে লাগীলেন। চোখ বুঝে ঢিল ছুড়ি তো, লাগে লাগবে, না লাগলে পাঁচ পয়সা গেল।
এর চেয়ে মেট্রিকুলেশ পাস করে পড়াশুনা বন্ধ করা ভাল ছিল। তবু একটা কিছু পাওয়া যেত। পনের, কুড়ি, যা হয়। গ্রাজুয়েট শুনলেই বলে, গ্রাজুয়েট পুষবার টাকা নেই। থাকবে কি করে? টাকা সব নোট হয়ে গিয়েছে। কিন্তু এত মাইনে তারা দিবে কোথেকে? টাকা চুরি করে দিক, ডাকাতি করে দিক আমার মাস গেলে পকেটে এলেই হলো। প্রথম মাসটা দেখে পরের মাস থেকে নতুন নিয়মে পড়াব। একে বারে ভারতীয় পদ্ধতিতে। বৈকুন্ট সরকারের প্রবেশ
মানস : নোটবুক দিয়া বিজ্ঞাপনটি আড়াল করিয়া কি চান মশাই আপনি?
বৈকুন্ট : খাতা সরাও
মানস: আপনার কি দরকার?
বৈকুন্ট : বিজ্ঞাপনটা দরকার
মানস : ওটা রাতের ঔষধ বিজ্ঞাপন নয়, আপনার কাজে লাগবে না।
বৈকুন্ট : ভাল উৎপাত, খাতা সরাও না? আমাকে আবার তাগাদা যেতে হবে। কর্তার বুড়ো কালে ধেড়ে রোগে ধরেছে, পয়সা বেশী হয়েছে কি না, খাতাটা সরাও না?
মানস : আপনি কি পাস?
বৈকুন্ট : সে খোঁজে তোমার কি কাজ হে ছোকরা? সরাও বলছি। মানসের নোট বুক টানিয়া সরাইয়া এইটা সেইটা দিয়ে তার পরে ভাল করে লেখ। এ ভাবে কাগজটি আটিয়া দিলেন। কাল দিলেন এক বিজ্ঞাপন, আবার আজ পাঠালেন এক চুটকি। এখন সারা শহর ভরচুট সেটে ভেড়াই আর কি।
মানস : মশাই দাঁড়ান, নমস্কার। আপনার মনিবের স্কুল বুঝি?
বৈকুন্ট : স্কুল না, বাপের পিনি। বিয়ে করেছ?
মানস : আজ্ঞে না।
বৈকুন্ট : তবে পিন্ডি গিলতে পারলে না, ঘরের বাছা ঘরে যাও।
মানস : ওরে বাবা তাইতো, সত্যি দেখছি, প্রস্তান স্ত্রী ভাগ্যের ধন, মুখের কাছে এসে ভাতের গ্রাস খসল। বিয়ে করলেও নাজেহাল, না করলেও তবু টুকে নেই। নকল করিতে লাগিলেন। নিহারিকা (নিহা) গাঙ্গুলী ডায়োসেশনের নবিনা গ্রাজুয়েট, স্নান মুখে হাতে ব্যাগ ঝুলাইয়া প্রবেশ করিলেন।
নিহা : দশ টাকার জন্য রোজ তিন ক্রোশ, আর পারিনে, (মানসের পিছনে আসিয়া) ঘাড়টা একটু সরাবেন?
মানস : (মুখ ফিরাইয়া) ঘাড়তো এখানে বসে থাকার জন্য আসে নি, একটু পরেই সরবে।
নিহা : ক্ষমা করবেন, ওটা কি ওয়ান্টেড?
মানস : (মুখ ফিরাইয়া) ওহঃ মাফ করবেন, আমি ভেবেছিলাম আর কেউ।
নিহা : ওটা কিসের?
মানস : একটা বিজ্ঞাপন, শুনবেন? Wanted a tutor and tuitoress both graduates or rs, 100 and 120 respectuely for my nerly faunded girls school.
নিহা :  ঠিকানা এইরে সেরেছে, আপনার স্ত্রীও কি গ্রাজুয়েট বেকার? কেন, বলুন তো?
মানস: লেজুড় আছে, শুনেছেন? দেখুন মাষ্টারি হাজবেন্ট এন্ড ওয়াইফ, বাংলা করে বুঝাব? না বুঝেছি, থ্যাঙ্কস। মানস, ঠিকানাটা নিয়ে যান
নিহা : দরকার নেই।
মানস: একই তো বেকার প্রস্থান, অন্যদিকে ব্লাউজের হাতায়, আর পায়ের জুতায় তালি পড়েছে। একটা স্বামী থাকলে। দি-আইডিয়া (নিহার উদ্দেশ্যে) দেখুন, দাঁড়ান, শুনুন, শুনেছেন। নিহারিকা পুনঃ প্রবেশ।
নিহা : কি হয়েছে?
মানস: দুটু কথা জিজ্ঞাসা করব, মনে কিছু করবেন না তো?
নিহা : আমার সময় নেই। নয়টায় টিউশনি আছে।
মানস: অল্প কথা দুটু আপনি কি গ্রাজুয়েট?
নিহা : ডায়োসেশন থেকে…
মানস : যেখান থেকে হোক, একটা কথা বলতে চাই, একটা কথা বলব, কোন মতলব আছে, ভাববেন না, আমি গ্রাজুয়েট এবং গরীব, তবে ভদ্র লোক, আমার সাথে পাটনারশিপে…
নিহা : (হাত ঘড়ি দেখিয়া) নয়টা প্রায়ই বাজে। আমাকে…
মানস: নয়টা দশটা যা ইচ্ছে বাজুক, আমার কথামত আর টিউশনি করতে হবে না। আর কেউ জানবেও না, আমি আর আপনি আর আপনার বুড়ো বাপ মা, ঠিক আছে তো?
নিহা : থ্যাংকস, গুড বাই।
(চলবে—–)

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।