জীবনের ডায়েরী থেকে গল্প সমগ্র : পর্ব-১০

[ ড. টি. এন. রশীদ ]
(গত পর্বের পর) : সত্যিকার মানুষ তারাই ছিল। আর তাদের এ অশুভ পরিণতি হয়েছিল। অবশেষে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালীর স্বপ্নসাধ পূরণ হয়। এ দিন পাকিস্তানী বাহিনী আত্মসমর্পণ করে ভারত-বাংলাদেশের যৌথ কমান্ডের কাছে। পাকিস্তানের জেনারেল নিয়াজী ঢাকায় মিত্রবাহিনীর আঞ্চলিক কমান্ডার জেনারেল অরোরা এবং বাংলাদেশের গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ.কে.এ খন্দকারের কাছে আত্মসমর্পণ করলে এই মহান যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।
এই যুদ্ধ চলাকালে কত লাখ বাঙ্গালী পাকিস্তানীদের হাতে প্রাণ হারায় তাৎক্ষণিক ভাবে তা গণনা করা সম্ভব ছিল না। অনুমাণ করা হয়েছে এর সংখ্যা ৩০ লক্ষ ছাড়িয়ে যাবে। স্বজন হারানোর বেদনায় অগণিত মানুষের হাহাকারে বাতাস ভারি হয়ে উঠলেও বিজয়ের আনন্দে মহা উল্লাসে বাংলার আকাশ বাতাস আবার আমোদিত হয়ে উঠে। ৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও দেশের একচ্ছত্র নেতা ও রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী। ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারী বিশ্ব জনমতের প্রবল চাপে বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেওয়া হয়। ১০ জানুয়ারী বঙ্গবন্ধু তাঁর মুক্ত স্বাধীন দেশের মাটিতে পা রাখলেন। লাখ লাখ মানুষ বঙ্গবন্ধুকে এ দিন ঢাকায় বিমান বন্দরে তাদের প্রাণঢালা অভ্যর্থনা জানায়। পরে রেসকোর্স ময়দানে এক বিশাল জনসভায় ভাষণ দিতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু বললেন, সাত কোটি বাঙ্গালীর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, স্বাধীন থাকবে।
দেশ স্বাধীন হবার পরে আমি আমার প্রিয় নেতার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। একটি কবিতা লিখে নিয়েছিলাম সাথে করে। দেখা করে ভীরু হৃদয়ে বললাম, আমি একটি কবিতা লিখেছি। বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে কবিতা পড়ার অনুমতি পেয়ে আমি পড়লাম।
হে স্বাধীনতা, তুমি আসবে বলে,
যুগ যুগ ধরে আমি তোমার পথ পানে চেয়ে থেকেছি।
নতুন পৃথিবীর দিক উন্মোচন করে আমি তোমার স্বপ্ন দেখেছি।
হে স্বাধীনতা তুমি আসবে বলে,
হে স্বাধীনতা তুমি আসবে বলে,
কত মা তার ছেলেকে হারাল
কত বোন হারালো ভাই,
কত কুমারী মেয়ে ইজ্জত হারাল
আমি আজ বলতে লজ্জা পাই।
হে স্বাধীনতা, তুমি আসবে বলে
কত শত মায়ের অশ্রু
বাতাসে শুকিয়ে আছে,
এক সাগর রক্তের বিনিময়
তোমারে পেয়েছি কাছে।
হে স্বাধীনতা, তুমি আসবে বলে।
হে স্বাধীনতা, তুমি আসবে বলে
আমি কত শত মেয়েকে রাইফেল ট্রেনিং দিয়েছি।
তাদের আত্মত্মরক্ষার তরে,
এরপর কত মুক্তিযোদ্ধা মেয়ে জন্ম নিল,
বাংলার ঘরে ঘরে হে স্বাধীনতা, তুমি আসবে বলে।
হে স্বাধীনতা, তুমি আসবে বলে
কত মনোরমা বীণা পানির
সিঁথির সিঁদুর মুছে গেল
কত ডাক্তার, মোক্তার, প্রফেসর, বুদ্ধিজীবীদের
বদ্ধভূমিতে নিয়ে চোখ বেঁধে হত্যা করল।
হে স্বাধীনতা, তুমি আসবে বলে।
হে স্বাধীনতা, তুমি আসবে বলে
আমি বনে জঙ্গলে
পালিয়ে থেকেছি।
থানায়, মহকুমায়, আর্মির ভয়ে
তুমি আসবে বলে।
হে স্বাধীনতা, তুমি আসবে বলে
আমি তোমার পথ পানে
চেয়ে থেকেছি
বাড়িঘর ছেড়ে, ছেলেমেয়ে ফেলে
আমি মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ দিয়েছি হে স্বাধীনতা, তুমি আসবে বলে।
কবিতাটি শুনে বঙ্গবন্ধু আবেগ প্রবণ হয়ে কেঁদে ফেললেন। পরম শ্রদ্ধায় ভালবাসায় আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, তুই ঠিকই লিখেছিস বোন, ঠিক লিখেছিস। এর মাঝে আমার কাছে আবারও অর্ডার আসল বঙ্গবন্ধুকে গার্ড অব অনার দিতে হবে। এবার ন্যাশনাল ফ্ল্যাগ, ব্যান্ড বিউগল, স্যালুটিং ব্যাজ, সবকিছুই থাকবে। আমি অগ্রণী গার্লস স্কুল, ধানমন্ডি গার্লস স্কুল, আজিমপুর গার্লস স্কুল, এই তিন স্কুলের মেয়েদের নিয়ে আজিমপুর, স্কুলে ড্রাম বিউগল ও রাইফেল দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে গার্ড অব অনার জানাই। তার দুইদিন পর বঙ্গবন্ধুর বাসায় গেলে তিনি আমাকে “কমান্ডার ইন চীফ অব বাংলাদেশ” উপাধি দেন। আমি খুব হাসতে লাগলাম। বঙ্গবন্ধু হাসতে হাসতে বললেন, আজকের অবজারভারে দেখুন আপনার আর মেয়েদের বিরাট আকারে ছবি বেরিয়েছে। সেই দিনটির কথা আজও আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল।
আজ বঙ্গবন্ধু নেই, কিন্তু তাঁর স্মৃতি অহরহ আমাকে ধ্বংস করে। তাঁর স্বপ্ন ছিল সোনার বাংলাদেশ গড়ার। সাত কোটি বাঙ্গালীর জন্য কতই না স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। এ দেশকে নিজের সন্তানের মত ভালবাসতেন। আমাদের সুযোগও ছিল এই মহান নেতাকে সঙ্গে নিয়ে দেশকে গড়ে তোলার। কিন্তু এক কুচক্রী মহল বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেলার জন্য ষড়যন্ত্র করেছিল। তাঁর কানে এ কথা আসলেও তিনি বিশ্বাস করেন নি। তাঁর বিশ্বাস ছিল বাঙ্গালী তাকে মারতে পারে না। কিন্তু হায়! বিশ্বাসের এই পরিণতি! শেষ পর্যন্ত কিনা আর্মিদের হাতেই এই মহান নেতার সপরিবারে প্রাণ দিতে হয়েছে দেশ যেন দেশের প্রাণই ঝরে পড়ল।
(চলবে——–)
